Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ সফর ১৪৪১ হিজরী

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য

| প্রকাশের সময় : ২০ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

দেশে আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের বাতাস বইতে শুরু করেছে। যদিও রাজনীতি-অর্থনীতিতে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা, বন্ধাত্ব্য ও অচলাবস্থা দূর করার কোন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা। রোহিঙ্গা সংকট, বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগের দ্ব›দ্ব এবং প্রধান বিচারপতির দেশত্যাগসহ নানামুখী কর্মকান্ডের মধ্যেও দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে সুস্পষ্ট বিপরীত অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের ডাকা সংলাপেও দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ও জোটকে পরস্পরবিরোধি মতামত ও অবস্থান তুলে ধরতে দেখা গেছে। এহেন এক বৈপরীত্যের মধ্যেও তিনমাস লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকার পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তনের দিনে জাতি একটি ইতিবাচক নজির প্রত্যক্ষ করল। বেগম জিয়ার দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর সড়কে লাখো মানুষ সমবেত হয়। গত কয়েক বছর ধরে বিএনপি এবং ২০দলীয় জোটের শরিকরা রাজপথে মিছিল সমাবেশ দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও পুলিশি বাঁধার সম্মুখীন হয়েছে। বিএনপি সমাবেশের অনুমোদন নিতে গেলেই নাশকতা অথবা নিরাপত্তাহীনতার অজুহাত খাড়া করা হয়েছে। অথচ বেগম খালেদা জিয়াকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে লাখো মানুষের ঢল নামলেও সেখানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিমানবন্দরমুখী নেতাকর্মীরা কোথাও কোথাও পুলিশি বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন বলে বিএনপি’র পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে পুলিশ বা সরকারী দলের পক্ষ থেকে কোন পরিকল্পিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়নি। ইতিপূর্বে জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগাদানশেষে গত ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরও বিমান বন্দরে আওয়ামীলীগের লাখো নেতা-কর্মীর ঢল নেমেছিল। বিমানবন্দর সড়কে এমন গণজমায়েতে রাস্তায় যানজটসহ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও দু’টি সমাবেশই কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের চলমান রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের একটি ইতিবাচক নজির সৃষ্টি হয়েছে।
দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতি হাত ধরাধরি করে চলে। রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা থাকলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। একপাক্ষিক ভোটারবিহিন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে শুধুমাত্র সংলাপ ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই তার পরিবর্তন সম্ভব। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। পুলিশ বা আইন-আদালত দিয়ে রাজনৈতিক সমস্যাকে মোকাবেলা চেষ্টা সব সময়ই উল্টো ফল বয়ে আনে। বেগম জিয়া দেশে ফিরে আসার তারিখ ঘোষনার আগেই বেশ কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলে দেশে আবারো সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দেয়। বিশেষত সরকারের কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রীও বেগম জিয়া দেশে আসলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে প্রচ্ছন্নভাবে তাঁকে গ্রেফতারের হুমকি দেন। তবে আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পুলিশের আইজি’র ভিন্নমত ছিল রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক। পুলিশ ও সরকারীদলের কোন রকম উস্কানীমূলক তৎপরতা না থাকা এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের সহযোগিতার কারণে লাখো জনতার সমাবেশটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সদিচ্ছা থাকলে যে কোন রাজনৈতিক তৎপরতা শান্তিপূর্ণভাবে সফল করা সম্ভব। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে নির্বাচন কমিশনের সংলাপ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বিশেষত: বিরোধিদলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীর উপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে। দেশে গণতন্ত্রায়ণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব দলের সমান অংশগ্রহন জরুরী। বাংলাদেশে সে অবস্থা অনুপস্থিত রয়েছে এবং বিরোধিদলগুলোকে অব্যাহতভাবে চাপে রাখা হয়েছে বলে সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেনতেন প্রকারে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন নিশ্চিত করার নাম গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র একটি সামগ্রিক মূল্যবোধের বিষয়। সাংবিধানিকভাবে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, সহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতি অগ্রাহ্য হওয়ায় দেশ এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সংকটের মধ্যে রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোহিঙ্গা রিফিউজি সংকটের মত বিশাল সংকটের মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অগ্রাহ্য করছে সরকার। দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য এটা শুভ লক্ষণ নয়। একটি একপাক্ষিক নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দলগুলোর মধ্যে প্রত্যাশিত সংলাপ ও সমঝোতার পরিবেশ এখনো দেখা যাচ্ছেনা। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট আগামী নির্বাচনের সময় অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ আশঙ্কা অমূলক নয়। তাই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা এবং সবদলের অংশগ্রহন ভিত্তিক নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ এখনি নিতে হবে। অন্যথায় আরেকটি একতরফা নির্বাচনের পুনরাবৃত্তিতে রাজনৈতিকদলগুলোর লাভক্ষতি যাই হোক, সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনগন। দেশের বেশীরভাগ মানুষ এখনো আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র মত প্রধান রাজনৈতিকদলের প্রতি আস্থা রাখছে। এই দুই বড় দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ-সমঝোতা এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশা। সংবিধানের দোহাই দিয়ে এই প্রত্যাশা অগ্রাহ্য করা হলে অপুরনীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে দেশ। রাজনৈতিক সমঝোতা ও জাতীয় ঐক্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হবে, এই প্রত্যাশা দেশের সব শান্তিকামী মানুষের।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শান্তিপূর্ণ


আরও
আরও পড়ুন