Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
শিরোনাম

প্রথমবারের মতো মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে পারে জাতিসংঘ

ইনকিলাব ডেস্ক: | প্রকাশের সময় : ২২ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রোহিঙ্গা শিশুদের অবস্থা ভয়াবহ : ইউনিসেফ
রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে পারে মিয়ানমার। এই জবাবদিহিতার পর্যায়ের পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিষয়টি পাঠানো হতে পারে। এ লক্ষ্যে তিন সদস্যের একটি জাতিসংঘ প্যানেল আগামী সপ্তাহে তদন্ত শুরু করবে। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে জাতিসংঘ একাধিক বৈঠক করলেও এটিই প্রথম কোনও কার্যকর পদক্ষেপ।
জাতিসংঘের এই প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসম্যান। প্যানেল সদস্য হিসেবে রয়েছেন অস্ট্রেলীয় মানবাধিকার কমিশনার ক্রিস সিদোতি এবং শ্রীলঙ্কান আইনজীবী রাধিকা কুমারাস্বামী।
প্যানেল চেয়ারম্যান জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। এতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে অগ্নিসংযোগ, হত্যাকান্ড ও ধর্ষণের অভিযোগের বিস্তারিত থাকবে। সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের ঘটনায় এসব অভিযোগ উঠেছে।
মারজুকি দারুসম্যান এর আগে জাতিসংঘের দুটি তদন্তে কাজ করেছেন। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো হত্যা মামলা ও শ্রীলঙ্কার যুদ্ধাপরাধ। তিনি জানান, তার দল ২০১২ সাল থেকে রাখাইনের বৌদ্ধ ও মুসলিমদের দাঙ্গার সময় থেকে ঘটনা বিশ্লেষণ করবে। প্রধানত রাখাইনে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করলেও মিয়ানমারে অন্যান্য বাস্তুচ্যূত জাতিগোষ্ঠী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলেছে তাও খতিয়ে দেখা হবে।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর পদক্ষেপের বিষয়ে মারজুকি জানান, জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল তখন অ্যাকাউন্টিবিলিটি ধাপের দিকে এগুবে। মিয়ানমার গত ২০ বছরে এ ধাপের মুখোমুখি হয়নি। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের পক্ষে অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়া যেতে পারে, নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদনটি হবে নতুন পদক্ষেপের ভিত্তি।
মারজুকি জানান, আগামী সপ্তাহে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসবে প্যানেল সদস্যরা। তারা রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে। বাংলাদেশ ছাড়াও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সাক্ষ্য নেবে। প্যানেল সদস্যরা মিয়ানমারও সফর করবে। তিনি মিয়ানমারের প্রতি হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলেন, সহিংসতা কবলিত রাখাইনে প্যানেল সদস্যদের গমনে যেন কোনো বাধা দেওয়া না হয়।
মারজুকি জানান, মিয়ানমার যদি রাখাইনে পৌঁছাতে বাধা দেয় তাহলে ২০ বছর ধরে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিবেদন জমা পড়ে আছে। সেগুলো তখন কাজে লাগানো হবে। তিনি বলেন, সরকারের এটা জানা উচিত। সব ধরনের তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করলেই দেশটির লাভ। আর সে জন্য ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ইয়াঙ্গি লি ও মানবাধিকার কমিশনারের কাজের প্রশংসা করেন মারজুকি। তিনি জানান, তারা তথ্য-প্রমাণে জোর দিবেন, মতামতের উপর নয়।
১৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি বলেছিলেন, ৫ সেপ্টেম্বর রাখাইনে সেনা অভিযান বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসা অব্যাহত থাকে। ২৫ আগস্ট থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। মারজুকি মনে করেন, রাখাইনে সামরিক অভিযানের বিষয়ে হয়তো সু চিকে অন্ধকারে রেখেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সূত্র : দ্য অস্ট্রেলিয়ান
রোহিঙ্গা শিশুদের অবস্থা ‘ভয়াবহ’
প্রাণভয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় আছে শিশুরা। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এ কথা উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। এই প্রতিবেদনে এসব শিশুদের আঁকা কিছু ছবিও প্রকাশ করা হয়।
যে চোখে অপার বিস্ময়ে পৃথিবীর রূপ-রস অবলোকন করার কথা, সে চোখ সময়ের অনেক আগে দেখে ফেলেছে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার চরমতম নির্দশন। রং তুলি পেয়ে এই অভিজ্ঞতা কাগজে ফুটিয়ে তুলেছে ১১ বছরের মুনজুর আলী। সে একাই নয়, কক্সবাজারের বালুখালি ক্যাম্পে বসে ইউনিসেফ সদস্যদের কাছে এরকম অনেক ছবিই এঁকে দেখিয়েছে মিয়ানমার থেকে আসা অসংখ্য শিশু। মুনজুর আলী জানায়, পালিয়ে এসে বেঁচে গেছে সে, নয়তো নিশ্চিতভাবেই প্রাণটা খোয়াতে হত। বাকিরাও জানিয়েছে নৃশংসতার নানা বর্ণনা। এসব ছবি উঠে এসেছে রোহিঙ্গা শিশুদের নিয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে। এতে উদ্বাস্তু শিবিরে শিশুদের বর্তমান অবস্থাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে, পৃথিবীর নরক হিসেবে। জরিপে বের হয়ে এসেছে, প্রতি ৫টি রোহিঙ্গা শিশুর মধ্যে ১ জন চরম অপুষ্টির শিকার।
প্রতিবেদনটির লেখক ও ইউনিসেফের যোগাযোগ উপদেষ্টা সিমন ইনগ্রাম বলেন, ‘প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা এই শিশুদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ছিলো আশঙ্কাজনক। ক্ষুধার্ত, দুর্বল এবং রুগ্ন অবস্থায় এসে পৌঁছায় তাদের অধিকাংশই। এদের অনেকেই আগে থেকেই ছিল পুষ্টিহীনতার শিকার।’
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ৫৮ শতাংশই শিশু। এক বৈঠকে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি এই শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণের আহ্বানও জানান ইউনিসেফ কর্তৃপক্ষ। অতিরিক্ত ত্রাণ ছাড়া এ অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয় বলেও জানান তারা। এছাড়া, তারা আরো জানান, এ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাত্র সাত শতাংশ তারা পেয়েছেন।
নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেয়া হচ্ছে : ইউএনএইচসিআর
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, নতুন করে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার সংলগ্ন সীমান্তে চারদিন ধরে আটকে থাকার পর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ১৯ অক্টোবর রাতে দেয়া বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র দুনিয়া আসলাম খান গত শুক্রবার জেনেভায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, কক্সবাজার জেলার সীমান্তবর্তী আঞ্জুমানপাড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে ছয় হাজার ৮শ’রও বেশি রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে।’
নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্থদের সীমান্ত থেকে বাসে করে কুতুপালং শিবিরের কাছের একটি ট্রানজিট কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। কেন্দ্রটিতে ইউএনএইচসিআর ও এর অঙ্কীদাররা খাবার, পানি, চিকিৎসা সেবা ও অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করছে। নতুন আসা অন্যান্য রোহিঙ্গারা পায়ে হেঁটেই কুতুপালং ক্যাম্পে পৌঁছে। তারা সেখানকার অবকাঠামো ও ভবনগুলোতেই রাত কাটায়। আসলাম খান বলেন, ‘ইউএনএইচসিআর ও এর অঙ্কীদাররা বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কুতুপালংয়ের আশ্রয় শিবির সম্প্রসারণে কাজ অব্যাহত রাখবে। আরো অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। এছাড়া নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের জন্য গভীর নলকূপ ও শৌচাগার নির্মাণ করা হচ্ছে।’ এ পর্যন্ত দুই লাখ ৪৬ হাজার ৬শ’ ছয় জনের বেশি রোহিঙ্গা কুতুপালং আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে। আরো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য শিবিরটির সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মিয়ানমারের এই নাগরিকদের দেশটির সেনাবাহিনী জোরপূর্বক তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করেছে। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আশা করছি জেনেভায় ২৩ অক্টোবর রোহিঙ্গা সঙ্কটের ওপর অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে সময়মত ও যথেষ্ট পরিমাণ সহায়তা পাওয়া যাবে। রোহিঙ্গাদের জন্য যৌথভাবে যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে ৪৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এই অর্থদিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হবে। ইউএনএইচসিআর-এর পরিকল্পনার একটি অংশের মধ্যে রয়েছে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ অতিরিক্ত ৮ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার সংগহ করা।’ সূত্র : ওয়েবসাইট।

 


Show all comments
  • আজিজ ২২ অক্টোবর, ২০১৭, ১:৪৭ এএম says : 0
    জাতিসংঘ কিছুই করবে না করার হলে অনেক আগেই করতো।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর