Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১১ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

চবি ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

চট্টগ্রাম ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২৮ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

এবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। জালিয়াতির অভিযোগে ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার ইসতিয়াক আহমেদ সৌরভ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন তিনি। তার সাথে গ্রেফতার করা হয় এক ভর্তি পরীক্ষার্থীকেও। গাজী রাফিউজ্জামান নামে ওই ভর্তি পরীক্ষার্থী নিজে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ওই চক্রের সাথে পরীক্ষার হলে ডিজিট্যাল পদ্ধতিতে উত্তর সরবরাহ করার চুক্তি করেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে হলের বাহিরে থেকে উত্তর বলে দেওয়ার মাধ্যমে পাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এ চক্রটি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে লাখ লাখ হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতি পরীক্ষার্থীর সাথে তাদের ৩ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। এমন ৬০ জন পরীক্ষার্থীর একটি তালিকাও পাওয়া গেছে ওই ছাত্রলীগ নেতার কাছে। পুলিশ জানায় এই জালিয়াত চক্রে আরও ৬ থেকে ৭ জন রয়েছে। তারা শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয় দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির সাথেও জড়িত। গত বছরও চবির ভর্তি পরীক্ষায় এই চক্রটি এই ডিজিট্যাল জালিয়াতির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এ ব্যাপারে তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
নগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াত চক্রের কয়েকজন সদস্য গ্রেফতার হওয়ার পর চট্টগ্রামেও এ ধরনের চক্র থাকতে পারে সন্দেহে নজরদারি শুরু করে পুলিশ। এ ধারাবাহিকতায় বুধবার নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় নাজমুল নামে চবির এক শিক্ষার্থীকে। তার কাছ থেকে বেশকিছু ডিভাইসসহ পরীক্ষার হলে ডিজিট্যাল জালিয়াতির বেশকিছু সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চট্টগ্রামে সক্রিয় জালিয়াত চক্রের সম্পর্কে একটি ধারণা পায়।
নাজমুলের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর পাঁচলাইশ থানার বাদুরতলা বড় গ্যারেজ এলাকা থেকে সৌরভকে পাকড়াও করে পুলিশ। পরে গাজী রাফিউজ্জামান নামে তার এক সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। তাদের দুই জনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ইলেকট্রনিক হিয়ারিং ডিভাইস, ব্লটুথ, ব্যাটারিসহ ডিজিট্যাল জালিয়াতির বেশকিছু সামগ্রী। যে ডিভাইসগুলো ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে। তাদের সঙ্গে ঢাবির ওই চক্রের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানায় পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (পাঁচলাইশ জোন) এসএম মোবাশ্বের হোসেন জানান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শুক্রবার অনুষ্ঠিত ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্র্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল তারা। বুধবার আটক জালিয়াত চক্রের সদস্য নাজমুল কবিরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সৌরভকে গ্রেফতার করা হয়। তার কাছেও দুটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাওয়া গেছে। এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এ চক্রের আরও সদস্য রয়েছে। তারা শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ওই চক্রের সাথে জড়িতদের আরও কয়েকজনকে ধরতে অভিযান চালানো হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। সৌরভের গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বাকিরা পালিয়ে যায়। গ্রেফতারের পর তাদের দু’জনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল তাদের দু’জনকে আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯৮০ সালে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের ১৩ ধারায় মামলা করে পুলিশ। মামলাটি তদন্ত করছেন বায়েজিদ বোস্তামি থানার উপ-পরিদর্শক আবছার উদ্দিন রুবেল। তিনি ইনকিলাবকে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জালিয়াতি চক্রের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার্থী রাফিউজ্জামান নিজে তিন লাখ টাকায় চুক্তি করার কথা স্বীকার করেন। তার মাধ্যমে আরও কয়েকজন পরীক্ষার্থী এই চক্রের সাথে চু্িক্ত করে। এ জন্য তাকেও জালিয়াত চক্রের সহযোগী হিসাবে আসামী করা হয়েছে। সৌরভের কাছে ৬০ জনের একটি তালিকা পাওয়া গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ তালিকা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে ঢাবির বড় জালিয়াতি চক্রের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদের পর বিস্তারিত জানা যাবে। তবে তারা শুধু এবার নয় গত বছরও এইভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে গ্রেফতার নাজমুল জানিয়েছে, চক্রটি জালিয়াতের মাধ্যমে উত্তর বলে দেওয়ার কথা বলে যাদের সাথে চুক্তি করে তাদের কাছ থেকে প্রথমে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়। বাকি টাকা ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে ‘জামানত’ হিসেবে পরীক্ষার্থীদের মূলসনদ ও মার্কসিট জালিয়াত চক্রের কাছে জমা রাখা হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাকি টাকা দিলে ফেরত দেওয়া হয় সনদ ও মার্কসিট।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার আগের রাতে ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন রানাসহ দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর চট্টগ্রামে জালিয়াতির ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা ধরা পড়ার ঘটনায় তোলপাড় চলছে। গ্রেফতার সৌরভ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। নিজ দলের নেতাকর্মী হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পর এবার ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতিতেও জড়ালো চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার
চবিতে ভর্তি জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগের এক নেতাসহ দুই শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোঃ আলী আজগর চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির নিজস্ব ক্ষমতাবলে এই দুজনকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসতিয়াক আহমেদ সৌরভ ও ইংরেজি বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের শরিফুল ইসলাম নাজমুল। নাজমুলকে গত বুধবার গ্রেফতার করে পুলিশ। আলী আজগর চৌধুরী জানান, দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ভর্তি জালিয়াতিতে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদেরকে কেন স্থায়ী বহিষ্কার করা হবে না তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।



 

Show all comments

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ছাত্রলীগ


আরও
আরও পড়ুন