Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬, ১৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে প্রস্তুতি

প্রকাশের সময় : ১৯ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সায়ীদ আবদুল মালিক : ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেই সঠিক ও পর্যাপ্ত কোন প্রস্তুতি। শুধু রাজধানীতেই রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৪ শতাধিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এছাড়ও ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভবন এখানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও নানান সমীক্ষায় দেখা গেছে। আর এ অবস্থায় শুধু রাজধানীতেই আড়াই লাখ লোক হতাহত হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতির আশংকার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তারই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালের জুলাই থেকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরবান রেসিলেন্স প্রজেক্ট (ইউআরপি) নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
১৭৩ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে পরিকল্পনা কমিশন, ঢাকার উত্তর, দক্ষিণ ও সিলেটের তিন সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। এছাড়া বিভিন্ন সেবা সংস্থাও কর্মসূচী বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক সাম্প্রতিক রাজধানীর গুলশান স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে এক কর্মশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেছেন, ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদের সঠিক প্রস্তুতি নেই। ভূমিকম্পে ঢাকা শহরের কতগুলো ভবন ঝুঁকিতে রয়েছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান কারো কাছেই নেই।
তিনি বলেন, নানাবিধ দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্যদেশের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধশীল। কিন্তু ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমাদের সঠিক প্রস্তুতি নেই। বলা হয়, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের ৭০ থেকে ৮০ হাজার ভবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এর সঠিক পরিসংখ্যান কত হবে সেটা জানা নেই। এজন্য ভূমিকম্প হলে আমাদের কি করণীয় সেসব বিষয় বেশি করে জানতে হবে। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঢাকার প্রতিটি এলাকার সড়কের নীচ দিয়ে গ্যাস ও পানির দীর্ঘ লাইন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এছাড়া ঢাকা শহরের সর্বত্রই উপরদিয়ে বিদ্যুতের তার ঝুলছে। এ অবস্থায় রাজধানীতে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এক হাজার ৮৩৪ কিলোমিটার গ্যাস লাইন ফেটে সর্বত্র আগুন ধরে যেতে পারে। পাশাপাশি তিন হাজার ৩৬ কিলোমিটার পানির লাইন ও ৩৭০ কিলোমিটার স্যুয়ারেজ লাইন ফেটে গেলে ওয়াসার দৈনিক উৎপাদিত আড়াইশ’ কোটি লিটার পানি ও স্যুয়ারেজের ময়লা পানি ছড়িয়ে পড়লে ছোটখাটো বন্যার আশংকাও থেকে যায়। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেলে আগুন ধরে যাওয়ার পাশাপাশি পুরো রাজধানী অন্ধকার হয়ে যেতে পারে। শত শত বাড়ি ভেঙ্গে পড়লে বন্ধ হয়ে যাবে সব রাস্তাঘাট। মোবাইল টাওয়ার বন্ধ হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ঘটবে চরম বিপর্যয়। রাজধানী থেকে সংযোগকারী মহাসড়কের ব্রিজগুলো ভেঙ্গে গেলে ঢাকার সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে যাবে। এসব কারণে ব্যাপক প্রাণহানিরও আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে ভূমিকম্পের পর যদি ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে সতর্কতা জারি করা যায় তাহলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে। কমানো সম্ভব হবে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি। কেন্দ্রীয়ভাবে সতর্ক সঙ্কেত দিলে জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধ করে এ ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান আনসারী বলেন, ভূমিকম্প হওয়ার পর ১৫ সেকেন্ড পর্যন্ত এর ধাক্কা থাকে। এ সময়ের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির জাতীয় গ্রিড বন্ধ করে দিতে পারলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। এজন্য ভূমিকম্প হওয়ার সাথে সাথে সতর্কতা জারির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বছর দুয়েক আগে আমাদের একটি গবেষণা শেষ হয়েছে। সেখানে আমরা দেখেছি রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রায় বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে শুধু রাজধানীতেই আড়াই লাখ লোক মারা যেতে পারে। ৪ শতাধিক ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে আরবান রেসিলেন্স প্রজেক্ট (ইউআরপি) পরিচালক ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ সার্কেল) ড. তারেক বিন ইউসুফ ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্প এর মধ্যে অন্যতম। বন্যা, সাইক্লোন ও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষায় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিলেও ভূমিকম্প নিয়ে তেমন প্রস্তুতি নেই। বিশেষ করে সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হওয়ার পর আমাদেরকে এর ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
এ কারণে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি রোধে সক্ষমতা অর্জনে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা ও সিলেটকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে প্রাথমিকভাবে এ দু’টি শহরের দুর্যোগ মোকাবেলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, এ প্রকল্পের অধীনে তিন সিটির প্রতিটি জোন ও ওয়ার্ডে একটি করে অফিস থাকবে। এছাড়া পরিকল্পনা কমিশন, রাজউক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স দফতরেও থাকবে একটি করে অফিস। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নগর ভবনে স্থাপিত হবে কেন্দ্রীয় অফিস। এখান থেকে ভূমিকম্প হওয়ার পর দেয়া হবে সতর্ক সঙ্কেত। দুর্যোগ মোকাবেলার সামগ্রিক কার্যক্রম সমন্বয় করবেন সিটি মেয়ররা।
ড. তারেক বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ভলান্টিয়ার গঠন করা হবে। প্রতি এলাকায় ২০০ যুবককে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিভিন্ন এনজিও এ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি জোনে একটি করে এম্বুলেন্স থাকবে। এগুলো হবে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। ভূমিকম্প হলে ভবন ভেঙ্গে রাস্তায় পড়লে তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য স্থানীয়ভাবে যাতে মোকাবেলা করা যায় সেজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
প্রকল্প পরিচালক আরো জানান, রাজধানীর অনেক এলাকায় ভবন বানাতে নিয়ম-কানুন মানা হয়নি। অনেক এলাকায় বালি দিয়ে গর্ত ভরাট করে ভবন তৈরি করা হয়েছে। ভূমিকম্প হলে তখন এসব ভবন মাটিতে দেবে যাবে। এছাড়া রাজধানীতে শত শত ভবন ভেঙ্গে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এগুলো যাতে সঠিক নিয়মে আনা যায় এবং নতুন করে আর যাতে কোন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মিত না হয় সে বিষয়টি দেখবে রাজউক।
ড. তারেক বলেন, ভূমিকম্প হলে মানুষ সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামার চেষ্টা করেন। এটি মানুষের ভুল ধারণা। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ আহত এমন কি নিহত হয়ে থাকে। রাজধানীতে যে রকম ঘনবসতি তাতে রাস্তায় নামলে ভবন ভেঙ্গে আহত-নিহত হওয়ার আশঙ্কা আরো বেশি। এক্ষেত্রে ফাঁকা মাঠ থাকলে সেখানে গেলে ভালো হয়। ভূমিকম্প হলে ঘরে থেকেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। আগে দ্রুত শক্ত টেবিল অথবা খাটের নীচে যেতে হবে। বর্তমানে অনেকে বাড়িতে কাঁচের টেবিল তৈরি করেন, এ ধরনের টেবিলের নীচে যাওয়া যাবে না। এসব বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের আশঙ্কা এবং এর প্রস্তুতি প্রসঙ্গে ভয়েস অফ আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইমামুল হক বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আতঙ্কগ্রস্ত হবার কোন কারণ নেই, কিন্তু যেটা একান্ত দরকার সেটা হলো এ ধরনের দুর্যোগের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ। অধ্যাপক ইমামুল হক বলেন. পুরোনো ঢাকার অনেক ঘরবাড়িই চূন আর সুরকির তৈরি। সেগুলো যেমন ঝুঁকিবহুল, তেমনি নতুন ঢাকা থেকেও যারা ভবন নির্মাণের নিয়ম মেনে চলছেন না, তারা তাদের ঘরবাড়িকে ভূমিকম্পের ঝুঁকির সম্মুখীন করছেন। বিসিএসআইআর-এর চেয়ারম্যান আরও বলেন, সবাইকে সঠিক ভাবে মৃত্তিকা পরীক্ষা করে এবং ভবন নির্মাণের নীতিমালাগুলো মান্য করে চলা প্রয়োজন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ