Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ৩০ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

আর্জেন্টিনার আশু নায়ক

ইমামুল হাবীব বাপ্পি | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইউরোপিয়ান ফুটবলে বরাবরই জুভেন্টাস হল এক পরাশক্তির নাম। একের পর এক অর্জনগুলোই তাদের হয়ে কথা বলে। ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ লিগ ইতিালিয়ান সিরি আ’র বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটির নামও জুভেন্টাস। গেল মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালিস্ট তারা। চলতি মৌসুমেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নক-আউট পর্বে পা রেখেছে বুফনের দলটি। অথচ ঘরোয়া লিগে মৌসুমের শুরুটা কি বাজে ভাবেই না হয়েছিল ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নদের। প্রথম তিন ম্যাচে কোন জয় নেই, হার দু’টিতেই। ১০ ম্যাচ শেষে সেই হিসাবটা তো আরো নাজুক। আগের মৌসুমে পুরো ৩৮ ম্যাচে যে দলের নামের পাশে হার মাত্র তিনটি, সেই দলকে ৪ বার পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয়েছে মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচেই। জয় মাত্র তিনটি! অথচ ঠিক এর পরের ১০ ম্যাচের গল্পটা আবার সম্পূর্ণ উল্টো। জয় সব ক’টিতেই! দলের এমন ব্যর্থতা আর তা থেকে এমনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর রহস্যটাই বা কি? দলের এমন বদলে যাওয়ার পিছনে আছে এক তরুণের গল্প, এক আর্জেন্টাইনের উত্থান- পাওলো দিবালা।
জুভদের হঠাৎ ঐ ছন্দ পতনের উল্লেখযোগ্য কারনও ছিল। জুভেন্টাসে দুর্দান্ত দুই মৌসুম কাটানোর পর নিজের দেশের ক্লাব বোকা জুনিয়ার্সে ফিরে যান আর্জেন্টাইন কার্লোস তেভেজ, হঠাৎ করেই। তেভেজের মত এমন একজন তারকা ফরোয়ার্ডের শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। সেই সাথে গেল মৌসুমে শেষে জার্সি খুলে রাখেন দলের প্রাণভোমরা আন্দ্রেয়া পিরলো। দলের সমস্যা আরো জটিল হয় দলের আরেক খুঁটি আরতুরো ভিদালের শূন্যতায়। ইতালি ছেড়ে এখন জার্মানির দল বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন এই চিলিয়ান মিডফিল্ডার। কিন্তু জুভেন্টাসের মত দলের এই বিশাল শূন্যতা পূরণের দায়িত্ব নেবেন কে? আরো ভালো করে বললে কে কে নেবে?
ঠিক এমন পরিস্থিতিতে পিরলোর ২১ নম্বর জার্সিটা পরানো হয় ২২ বছর বয়সি এক তরুণ খেলোয়াড়ের গায়ে। পালের্মো থেকে চলতি মৌসুমেই ৩২ মিলিয়ন ইউরোতে দলে ভেড়ানো হয় এই তরুণকে। এমন পরিস্থিতিতে দলের সেরা একাদশে থেকে প্রত্যাশার চাপ সামাল দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ সেই প্রত্যাশার চাপকে কি নিঁপুণভাবেই না সামাল দিলেন এই তরুণ স্ট্রাইকার। গতি, বলের দখল, ডাইভিং, ড্রিবলিং কি নেই তার মধ্যে। অসাধারণ ফ্রি-কিকের দরুণ দলের সেই দায়িত্বও এখন বর্তেছে তার কাঁধে। নিশ্চয় সক্ষমতার দরুণই দল তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। দলের ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলেন দিবালা।
মিডফিল্ডেও খেলেন বটে কিন্তু পুরোদস্তুর মিডফিল্ডার তিনি নন। আবার গোলমুখে দ্রুত বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলের সুযোগ তৈরী করতে বেশ পটু ছেলেটি। সেই হিসাবে স্ট্রাইকারই বলা চলে। যার প্রমাণ দলের জার্সি গায়ে চাপানোর পরেই দিয়ে চলেছেন তিনি। যার বদৌলতে ১০ ম্যাচ শেষে পয়েন্ট তালিকায় ১২ নম্বরে থাকা দলটি এখন পয়েন্ট তালিকার ২য় অবস্থানে। টানা ১০ জয়ে পূর্ণ ৩০ পয়েন্ট আদায় করে নেয়ার পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তার নাম পাওলো দিবালা। সিরি আ লিগে দলের হয়ে সর্বোচ্চ (১১) গোলের পাশাপাশি ৭টি গোলে আছে তার সহায়তা। চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১৩ গোলও দিবালার। গত ১৭ জানুয়ারি লিগে উদিনেসিকে ৪-০ গোলে হারায় জুভেন্টাস। সেই ম্যাচে দুই গোলের পাশাপাশি বাকি দুই গোলেও ছিল দিবালার সহায়তা। জুভদের হয়ে এমন জোড়া গোলের পাশাপাশি জোড়া গোলে সহায়তার নজির ১০ বছর আগের পুরোনো।
দলের হয়ে এমন আলো ছড়ানোয় স্বতীর্থদের কাছ থেকে সাহায্য তো পাচ্ছেনই, পাচ্ছেন প্রশংসাও। এমনকি ভবিষ্যতে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার প্রতিভাও তার ভিতর আছে বলে মনে করেন দলের অনেকে। তাদের ভিড়ে একজন ঘানাইয়ান মিডফিল্ডার কাওয়াদো আসামোয়াহ। স্কাই স্পোর্টসকে তিনি বলেনÑ ‘পাওলো প্রমাণ করছে কি প্রতিভা তার ভিতর আছে। সেরা খেলোয়াড় হওয়ার সব সক্ষমতা তার মধ্যে আছে।’
‘লা জয়া’ অর্থাৎ ‘দ্যা জুয়েল’ বা ‘রতœ’ উপাধী তো আর এমনি-এমনি পাননি দিবালা। তার উদ্ভোবনী ক্ষমতা, গতি, টেকনিক এবং বলের প্রতিনজর এই দিকগুলো বিবেচনায় তার মধ্যে সার্জিও আগুয়েরো, হাভিয়ের পাস্তোরে, কার্রোস তেভেজ, ওমর সিভোরি ও লিওনেল মেসির মিশেল দেখতে পান সাবেক দুই ইতালিয়ান ফরেয়ার্ড ভিনসেনজো মোনতেলা ও রবার্তো বেজিও। দেশের গ-ি পেরিয়ে যখন ইতালিয়ান ক্লাব পালের্মোতে যোগ দেন সেসময় ক্লাবের প্রেসিডেন্ট মাউরিজিও জাম্পারিনি ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ ‘আমরা পাওলো দিবালাকে পেয়েছি- যে আমাদের নতুন সার্জিও আগুয়েরো।’
দৈত নাগরিকত্ব থাকার সুবাদে পোল্যান্ড ও ইতালির হয়েও খেলার যোগ্যতা আছে বিদালার। কিন্তু তার স্বপ্নে শুধুই আর্জেন্টিনা। ‘পারিবারিক সূত্রে গায়ে আর্জেন্টিনার রক্ত’ থাকায় আর্জেন্টিনার জার্সিই গায়ে চড়াতে চান তিনি। ইতোমধ্যে সেই স্বপ্ন পূরণও হয়েছে ২২ বছর বয়সি এই ফুটবল কারিগরের। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচকে সামনে রেখে গত ২২ সেপ্টেম্বর কোচ জেরার্ডো মাটিনোর দলে ডাক পান দিবালা। ১৩ অক্টোবর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৭৫তম মিনিটে কার্লোস তেভেজের বদলি হয়ে প্রথম দেশের হয়ে মাঠে নামেন দিবালা।
১৯৭৭ সালে মাত্র ১৭ বছরে বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ওঠে ম্যারাডোনার। তারপরের ইতিহাসটা সকলেরই জানা।
টানা ১৭টি বছর দলের গর্বের সাথে জড়িয়ে ছিলো তার নাম, দলের সাথে বিশ্বসেরার তকমা, তার নামের পাশে বিশ্বকাপ শিরোপার ঔজ্জ্বল্য। ম্যারাডোনার বিদায় নেয়ার পর মাঝে কেটে যায়
১১টি বছর।
এরপরই আবির্ভাব হয় আরেক আর্জেন্টাইন জাদুকরের। সেই তিনি লিওনেল মেসি ছাড়া আর কে? অনেকের মতে বিশ্বের সর্বকালের সেরারও যোগ্য তিনি।
গ্রহের ফুটবলের এমন কোন ট্রফি নেই যা তার শোকেসে স্থান পায়নি। শুধু বিশ্বকাপ ট্রফিটা বাদে। এত এত পাওয়ার মাঝেও যা মেসির মনের গোপন কোঠরে লুকিয়ে থাকা এক অব্যক্ত যন্ত্রণা।
সামনে এখনো বিস্তর সময়। দিবালা কি পারবেন আকাশী-নীল জার্সি গায়ে চড়িয়ে মেসি-আগুয়েরো-ডি মারিয়াদের সাথে জুটি বেঁধে মাঠ কাঁপাতে? মেসির স্বপ্নের সারথী হয়ে বিশ্বকাপের সেই অধরা ট্রফিতে চুমু এঁকে দিতে?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।