Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ‘এখনো গেল না আঁধার’

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ৮ নভেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

বিনা ভোটের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারী ঢাকায় রাজনৈতিক সমাবেশ করা থেকে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটকে নিবৃত্ত রাখতে খালেদা জিয়ার গুলশানের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ইট-সিমেন্ট, বালুভর্তি ১১টি ট্রাক রেখে খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাঁচ জানুয়ারীর ২দিন আগে ৩রা জানুয়ারী খালেদা জিয়াকে ভিতরে রেখে গুলশান কার্যালয়ের বাইরের ফটকে তালা লাগিয়ে দেয় পুলিশ। এরপরও সব বাঁধা অতিক্রম করে ৫ জানুয়ারী জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নামতে গেলে পিপার স্প্রে ব্যবহার করে পুলিশ। খালেদা জিয়াকে এভাবে অবরুদ্ধ করে রাখার খবর দেশ বিদেশে প্রায় সব মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারিত হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ব্যাপক জনসমর্থনপুষ্ট বিরোধিদলসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে নিজেদের অধীনে একটি একপাক্ষিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার তৎপরতাকে পশ্চিমাবিশ্ব সমর্থন করেনি। সরকারের পক্ষ থেকে সেই নির্বাচনকে একটি সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আখ্যায়িত করার পাশাপাশি শীঘ্রই আলাপ আলোচনার মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে অনির্বাচিত সদস্য নিয়ে গঠিত সংসদ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈধতার সংকটে পড়তে বাধ্য। তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্র নিয়ে পশ্চিমাদের কমিটমেন্ট সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন থাকলেও বাহ্যত নির্বাচনের পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিনিধিরা বার বার সরকারকে সেই মোরাল লিগ্যাসির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নতুন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এভাবেই কেটে গেছে চার বছর। আগামী বছরের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে একধরনের নির্বাচনী আবহ বা আলামত দেখা যাচ্ছে। তবে সেই নির্বাচন কেমন নির্বাচন হবে তা এই মুহুর্তে বলা সম্ভব না। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যা’ই বলুক, সরকারের মনোভঙ্গির কোন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছেনা। সংবিধানের দোহাই দিয়ে তারা সংসদ বহাল রেখে নিজেদের দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের ধর্ণুভঙ্গ পণ নিয়ে বসে আছে। ইতিমধ্যে নানা বিতর্ক ও নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচন কমিশনও গঠিত হয়েছে। বিশেষত: প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অতীত ইতিহাস এবং পেশাগত জীবনে একটি রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট হয়ে পড়ার কারণে দলীয় সরকারের অধীনে তাকে দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব কিনা এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন গঠন পর্যন্ত বিরোধি দলের পক্ষ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের রাজনৈতিক পক্ষপাত ও নির্বাচনে নিরপক্ষেতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছে বিএনপি ও জোটের বাইরেও আরো অনেক দল। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়নের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া থেকে কেউই আশ্বস্ত হতে পারছেনা। যে কোন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে যাবে, বিএনপি’র কোন কোন সিনিয়র নেতার এমন মতামত থেকে সরকারদলীয় লোকজন ধরেই নিয়েছে বিএনপি তাদের অধীনেই নির্বাচনে যাবে, অতএব সংলাপ, সমঝোতা বা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থার কোন প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে তারা যে কোন মূল্যে আরেকবার ক্ষমতায় এসে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি পালন করতে চায়।
যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় আসা এবং টিকে থাকার কসরত ইতিমধ্যেই সফলভাবেই রপ্ত করেছে আওমীলীগ। জাতীয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে একপাশে সরিয়ে রেখে সব পক্ষকে ম্যানেজ করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চর্চার এক নতুন ধারার গণতন্ত্রের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। এসব করতে করতে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিনিয়োগ বৈদেশিক বাণিজ্য, কর্মসংস্থানের মত ইস্যুগুলো চরমভাবে মার খাচ্ছে। অপরাজনীতি ও বেপরোয়া দলবাজি ও সন্ত্রাস দেশে একটি বিচারহীনতার সংস্কৃতি জন্মদিয়েছে। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও নিরাপত্তা না থাকায় লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তৈরী পোশাক রফতানী, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মত অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ক্রমশ: দুর্বল হয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত হলেও সরকার উন্নয়নের রেকর্ড বাজিয়েই চলেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশ্নে পশ্চিমাদের সুপারিশ অগ্রাহ্য করার কারণে সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের শক্ত অবস্থান না নিলেও তাদের পরোক্ষ ভ‚মিকার কারণে বাংলাদেশের বিনিয়োগ, রফতানী ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে নেতিবাচক প্রভাব দেশকে ক্রমে একটি সংকটজনক অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এহেন বাস্তবতায় আগামী নির্বাচনের ভাল-মন্দের উপর দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যত অনেকাংশে নির্ভর করছে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের রোডম্যাপ ও আইনগত সংস্কারের প্রশ্নে নবগঠিত নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই সব নিবন্ধিত রাজনৈতিকদল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় করেছে। সব পক্ষ থেকেই নির্বাচনের জন্য নিজেদের পক্ষ থেকে সুপারিশমালা জমা ও দিয়েছে। তবে এই মুহুর্তে দেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে বিষয়টি বেশী গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ঝুঁলে আছে, তা হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার এবং প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের মধ্যকার সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগ। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের কিছু করণীয় নেই বলে ইতিমধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যস্থার প্রশ্নে দেশীয় রাজনৈতিক স্টেকল্ডোরদের পাশাপাশি পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগিরা আবারো সোচ্চার হতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইইউভুক্ত দেশগুলোকে আলাদা আলাদাভাবে তাদের প্রতিক্রিয়া ও মতামত দিতে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে চলতি সপ্তাহে সুইডিস পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। সুইডেনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবং সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এন্ডার্স অস্টারবার্গ বাংলাদেশে বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গণতান্ত্রিকব্যবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগ জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্টর্ম-এর কাছে একটি চিঠি লিখেন অক্টোবরের ২৫ তারিখে, ২রা নভেম্বর এই ইস্যুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মারগর ওয়ালস্টর্ম বলেন, সংবিধান অনুসারে বাংলাদেশে ৫ বছর অন্তর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, কিন্তু আমরা দেখেছি বাংলাদেশের বিগত নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়নি এবং মিডিয়াগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেনা এবং বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনা। এ বিষয়ে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের পাশপাশি সুইডেনও উদ্বিঘœ। সুইডেনের এই উদ্বেগের কথা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সাথে সাক্ষাৎ করে জানিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও সুইডিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্টর্ম সংসদে দেয়া বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।
সংবিধান অনুসারে দেশের মালিক জনগন। জনগনের স্বাধীন ইচ্ছা ও ত্যাগে রাষ্ট্র গঠিত ও পরিচালিত হয়। দেশের সংবিধান জনগনের আশাআকাঙ্খা প্রতিফলন মাত্র। নিজেদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংবিধান প্রণীত হয়। সব রাষ্ট্রেই সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশ ও জনগনের স্বার্থ ও আকাঙ্খার পরিবর্তনের সাথে সাথে সংবিধানেও পরিবর্তন, সংযোজন বিয়োজন হয়ে আসছে। যে প্রেক্ষাপটে আমাদের সংবিধানে নির্বাচনকালীণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন সংযোজিত হয়েছিল আমাদের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতাই বলে দেয়, আমরা এখনো সেই সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারিনি। এই ব্যর্থতার জন্য আমাদের সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা সরকার এবং সব রাজনৈতিক পক্ষেরই দায় রয়েছে। বিদেশের পার্লামেন্ট বা মানবাধিকার কমিশন আমাদের গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানাতে পারে, কোন কোন ক্ষেত্রে কূটনৈতিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে, আরো বেশী হলে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে। তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে হস্তক্ষেপ করতে পারেনা। এ দেশের সরকার, যে কোন রাজনৈতিকদল বা জনগণের কাছে এটা কাম্য নয়। আমাদের কাঙ্খিত গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক সাম্যের লক্ষ্য দেশের জনগণ এবং সকল রাজনৈতিক পক্ষের সম্মিলিত প্রয়াসেই অর্জিত হতে হবে। মূলত এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্যই একাত্তুরে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। লাখো প্রাণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সেই সুমহান লক্ষ্য কোন রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতালিপ্সা বা গোয়ার্তুমির কারণে ব্যর্থ হতে পারেনা। আমাদের সরকার এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও গোয়াতুর্মির ফল ভোগ করতে হচ্ছে দেশের ১৬ কোটি মানুষকে। গত একদশকেও দেশে কাঙ্খিত বিনিয়োগ না হওয়া, দেশ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে দেউলিয়া দশায় উপনীত হওয়া, দেশে-বিদেশে কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও সম্ভাবনা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে যাওয়ার জন্য দেশের অস্থির ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি দায়ী। এই মুহুর্তে খাদ্যসামগ্রীর অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে দেশের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। কোন মানুষই ঘরে বাইরে কোথাও এখন নিরাপদ নয়। জননিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি ইতিমধ্যে আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উপরও আঘাত হেনেছে। সামাজিক অপরাধ অবক্ষয়, যুব সমাজের অপরাধ প্রবণতা, মাদকাসক্তি, মাদক ও সোনা চোরাচালানের মত গণবিরোধি তৎপরতা দেশকে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিশ্বের মানবাধিকার ও দুর্নীতি বিরোধি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। সুইডিস পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশের সংসদে দাড়িয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের মান একদম নিচের দিকে নেমে গেছে। এহেন বাস্তবতার মধ্যে আমাদের সরকার জনগনকে উন্নয়নের ফিরিস্তি বয়ান করে চলেছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, জননিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে তথাকথিত উন্নয়নের কোন রোডম্যাপ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ক্রমবর্ধমান খেলাপীঋণের ভারে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে টালমাটাল অবস্থা, কারসাজি ও লুন্ঠনের ধাক্কা সামলে গত ৫ বছরেও ঘুরে দাড়াতে পারেনি দেশের পুঁজিবাজার। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সাথে জড়িতদের কোন বিচার হয়নি। উপরন্তু ব্যাংকিং আইনে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই সেক্টরকে একটি গোষ্ঠি ও কিছু পরিবারের কাছে জিম্মি করে ফেলা হয়েছে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বন্ধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড অথবা গুম-খুনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোন সমাজের উন্নয়নের সূচক নির্দেশ করেনা।
গত জানুয়ারীতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনকল্পে ৬ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকবার হতাশ হয়েছিল দেশের সাধারণ মানুষ। সে সার্চ কমিটি যে নতুন নির্বাচন কমিশন উপহার দিল তাও ততোধিক হতাশাপূর্ণ। গত প্রায় এক বছরে নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ডে ও বাহ্যিক তৎপরতায় এমন কিছুই দেখা যায়নি যাতে সব হতাশা ঝেরে ফেলে আগামী নির্বাচন নিয়ে আশাবাদি হতে পারে মানুষ। প্রথমত: একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও সব দলের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের সদিচ্ছার কোন প্রতিফলন দেখা যাচ্ছেনা, দ্বিতীয়ত: স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ, তৃতীয়ত: পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য যে তাগিদ দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিক পরাশক্তি চীন ও ভারতের পক্ষ থেকে অনুরূপ তাগিদ এখনো দেখা যাচ্ছেনা। নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভ‚-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারত ও চীন একই মেরুতে অবস্থানের ঘটনাও বিরল নয়। চলমান রোহিঙ্গা সংকটে দুই বৈরী আঞ্চলিক শক্তি চীন ও ভারতকে একই নীতি অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ জাতিগত নিধনের শিকার হওয়া আরাকান রোহিঙ্গা রিফিউজি সংকট ও মানবাধিকারের প্রশ্নে চীন-ভারতের অবস্থান বিশ্বসম্প্রদায়কে হতাশ করেছে। আর বাংলাদেশে একপাক্ষিক নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নস্যাৎ হওয়ার পেছনে ভারতীয়দের স্বার্থান্বেষী রাজনীতি ও আধিপত্যবাদি ক‚টনীতির ভ‚মিকা এখন ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ছোট দেশে দুর্বল ও বশংবদ সরকার কায়েম রেখে বড় প্রতিবেশীরা নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করলে বিষ্ময়ের কিছু নেই। বিশ্বের প্রতিটি সাম্রাজ্যবাদি ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ এভাবেই শক্তি সঞ্চয় করেছে। সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের প্রভাব কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার প্রথম পন্থা হচ্ছে- দেশে ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং বিশ্বপরিমন্ডলের ভূ-রাজনীতিতে অপর পক্ষের সাথে কৌশলগত নিরাপত্তার বোঝাপড়া নিশ্চিত করা। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে এখন কার্যত: বন্ধুহীন হয়ে পড়ার বাস্তবতা আমাদের গণতন্ত্রহীণতা, সামাজিক-রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অনাস্থা ও অসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশ তথা জাতীয় অনৈক্য দায়ী। গুম-খুন-অর্থনৈতিক লুন্ঠন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু রেখেও হয়তো দেশে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেখানো সম্ভব। এরপর গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নকে বড় করে দেখানোও অসম্ভব নয়। রাজনৈতিক হেজিমনির আশ্রয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এক সময় দেশটাই চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়তে বাধ্য হয়। আমাদের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সে পর্যায়ে এসে পৌছেছে। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাবিদ ও ইতিহাস গবেষক নৃ সিংহ ভাদুরীর লেখা একটি নিবন্ধের শিরোনাম, ‘নীচ থেকে উঠে আসা গণতন্ত্র’। নাতিদীর্ঘ নিবন্ধে তিনি পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের লৌকিক ও প্রায়োগিক দিকগুলোর বিশ্লেষন করতে গিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের বাম জমানার আদর্শগত ইতিহাস যা-ই থাকুক, যতই বলা হোক সেটা সাধারণ মানুষের মুক্তির ইতিহাস, আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় শুধু চুপ করে থাকতে হয়েছে বলেই সেই চাপিয়ে দেয়া ইতিহাসের ‘ইন্টারপ্রিটেশান’ এতদিনে মিথ্যে হয়ে গেছে।’ চাপিয়ে দেয়া ইতিহাস, চাপিয়ে দেয়া উন্নয়নের ফানুস একদিন মিথ্যা হতে বাধ্য। জনগণের ইচ্ছার কাছে সত্যিকার অর্থে আত্মসমপর্ণই গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল দাবী। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের সাংবিধানিক সঙ্কটের মুখোমুখি। রোহিঙ্গা সমস্যাসহ আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা করেছে। জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে এসব সংকট ও অনিশ্চয়তার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে আগামী দশকে এক নতুন সম্ভাবনাময়,শক্তিশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে মূল টার্গেট হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। নেতিবাচক রাজনীতি আমাদের পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে একটি ভীতিকর অন্ধকার গহŸরে ফেলে দিতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সুরঙ্গের শেষ প্রান্তে এখনো কোন আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে না। ক্ষুধা দারিদ্র্য ও আধিপত্যবাদের প্রভাবমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সব রাজনৈতিক শক্তির ঐক্য ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থান নিশ্চিত হওয়ার কোন বিকল্প নেই।
[email protected]



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রাজনীতি

২৩ নভেম্বর, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন