Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২১ এপ্রিল ২০১৯, ৮ বৈশাখ ১৪২৬, ১৪ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

ইসলামী অর্থনীতির মেরুদন্ড যাকাত

প্রকাশের সময় : ২০ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মো. আবুল খায়ের স্বপন

‘নামাজ কায়েম কর। যাকাত প্রদান কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও’। আল কোরআন সূরা আন-নূর-৫৬। ইসলাম প্রধানত পাঁচটি খুঁটি বা রুকনের উপর প্রতিষ্ঠিত বা দ-ায়মান। তার মধ্যে ঈমান এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত নামাজ এবং রোজার পরই যাকাত গুরুত্বপূর্ণ একটি আর্থিক ইবাদত। যদিও ইসলামের প্রতিটি রুকনই প্রত্যেক মুসলমানের কাছে সমান গুরুত্ব বহন করে থাকে। কারণ ঈমান, নামাজ, রোজা, যাকাত এবং হজ্ব সমষ্টিগতভাবে এই বিষয়গুলোর উপরই ইসলাম নির্ভরশীল। যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও বৃদ্ধি হওয়া অর্থাৎ নিজের সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে দান করাই যাকাত। যাকাত সম্পদশালী নর-নারীদের উপর বছরে একবার করে ফরজ। যাকাত আদায় করার প্রতি নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল বাকারার ৪৩নং আয়াতে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেন “ তোমরা নামাজ আদায় কর, যাকাত প্রদান কর এবং বিনয়ীদের সাথে বিনয় প্রকাশ কর অথবা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর”।
সূরা আত তাওবার ১০৩নং আয়াতে একই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, “হে রাসূল (সা.) আপনি তাদের অর্থসম্পদ হতে যাকাত গ্রহণ করুন। যাকাত তাদের মালকে পবিত্র এবং বরকতময় করবে, আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করবে”। মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে বিরাশি বার নামাজের ব্যাপারে তাগিদ প্রদান করার পাশাপাশি আটাশবার যাকাতের কথা উল্লেখ করেন। আল্লাহপাক ঐ ব্যক্তির নামাজ কবুল করেন না যে সঠিক এবং ইসলাম নির্দেশিত পন্থায় যাকাত আদায় করে না। কেননা আল্লাহ তাআলা নামাজ এবং যাকাতকে একত্রিত করেছেন। সুতরাং উভয় ইবাদতের মধ্য পার্থক্যকরণ আল্লাহপাক পছন্দ করেন না। কেননা ফরজ আমল হিসেবে নামাজ এবং যাকাত একে অন্যের পরিপূরক। পরিপূর্ণভাবে যাকাত আদায় করার মধ্যদিয়েই সমাজ এবং রাষ্ট্র সংশোধিত হয়ে কালজয়ী এক ইসলামী অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। কল্যাণমুখী ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় সম্পদের সুষ্ঠুবণ্টন নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করা এবং পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বেষ্টনি গড়ে তোলার প্রধান এবং অন্যতম সফল হাতিয়ার হচ্ছে ইসলামী যাকাত ব্যবস্থা।
ইসলামের নির্দেশিত পন্থায় যাকাত প্রদান করার মধ্যদিয়ে সমাজ থেকে দারিদ্র্যতার বিষাক্ত ছোবল দূর হয়। কেননা সমাজ থেকে দারিদ্র্যদূরীকরণেই যাকাতের প্রধান লক্ষ ও উদ্দেশ্য। যাকাত অসহায়, দুস্থ লোকদের উপর ধনীদের করুণা নয় বরং ধনী ব্যক্তিদের যাকাতের মালের উপর তাদের (অসহায়, দুস্থ) লোকদের আল্লাহ প্রদত্ত ন্যায্যঅধিকার। এ প্রসঙ্গে সূরা আল জারিয়াতের ১৯ নং আয়াতে মহান আলাহপাক এরশাদ করেন, “তাদের (ধনীদের) সম্পদে ভিক্ষুক এবং বঞ্চিতদের হক রয়েছে”। আল্লাহপাক এ আয়াতের মাধ্যমে ধনীদের এমর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তোমাদের মালের একটা অংশ গরীব, দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দাও। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যাকাত শুধু নিছক দান-ই নয় বরং গরীব, অসহায়, দুস্থ লোকদের ন্যায্যদাবি পরিশোধ করার একটি উত্তম মাধ্যমও। ইসলামী অর্থনীতিতে যাকাতের ভূমিকা অপরিসীম। ইসলামী অর্থব্যবস্থার উৎসগুলোর মধ্যে যাকাত অন্যতম একটি প্রধান উৎস। যাকাতের উপর ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিকভিত্তি ও কল্যাণমুখী প্রকল্পসমূহের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।
ইসলাম চায় দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী, দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ। আর এ দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী, সমাজ গঠনে যাকাত অনবদ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদের প্রবাহ গতিশীল হয়। সম্পদের পরিশুদ্ধি অর্জিত হয়। রাষ্ট্রের অর্থনীত সচল হয়। উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। সমাজে এবং রাষ্ট্রে বেকারত্ব হ্রাস পায়। এ ব্যাপারে সূরা আল বাকারার ২৭৬নং আয়াতে আল্লাহপাক এরশাদ করেন, “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বাড়িয়ে দেন এবং আল্লাহ কোন অকৃতজ্ঞ পাপীকে ভালোবাসেন না”।
বিশ্ব নবী (সা.) সাহাবায়ে কেরামদের সর্বদা যাকাত, সদকা, খয়রাত করার জন্য নির্দেশমূলক উৎসাহ প্রদান করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হোরাইরা (রা.) থেকে মিশকাত শরীফের ১৬৪নং হাদিসে এভাবে বর্ণিত আছে নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, “যখননি বান্দাগণ সকালে উঠে তখন আকাশ হতে দু’জন ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। তাদের একজন বলেন “হে আল্লাহ! তুমি দাতাকে আরও প্রতিদান দাও! দ্বিতীয় জন বলে হে আল্লাহ! তুমি কৃপণকে তার প্রতিদান দাও”। হযরত আবু হোরাইরা (রা.) থেকে মিশকাত শরীফের আরও বর্ণিত আছে নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, “আল্লাহ বলেন হে আদম সন্তানগণ! তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো, আমি তোমাদেরকে দান করব”। যাকাত মানুষের মনে খোদাভীতি সৃষ্টি করে। পবিত্র ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। যাকাত সম্পদের অপচয় রোধ করতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে। সর্বোপরি যাকাত মানুষের আত্মিক প্রশান্তি, নৈতিক উন্নতি, সম্পদ বৃদ্ধি, পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে সমাজ থেকে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খলা দূর করে। পারস্পারিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতি স্থাপনে যাকাত যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। যাকাত সামাজিক নিরাপত্তা দানের পাশাপাশি সমাজের মানুষের মধ্যে সম্পদের বৈষম্য দূর করে। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নিয়মে যাকাত প্রদান করার ফলে সামাজিক সম্প্রীতি এবং শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে। তাই নবীজি (সা.) যাকাতকে ইসলামের সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন। যাকাতের ধর্মীয় ফজিলত অনেক। পাপ মোচনে যাকাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এ ব্যাপারে নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, “আর সদকা (যাকাত দান) গুনাহকে মিটিয়ে দেয়, যেমনিভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়”। যাকাতদাতাকে নবীজি (সা.) বেহেশত যাওয়ার সুসংবাদ প্রদান করেন। ইসলাম শুধু ধনী পুরুষ জাতির ওপরই যাকাত ফরজ আমল হিসেবে নির্ধারণ করেননি পাশাপাশি ধনী নারী জাতিকে যাকাত আদায় করার প্রতি উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। মিশকাত শরীফের ১৫৯নং হাদিসে প্রখ্যাত সাহাবী আবদুলাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর সহর্ধমিনী হযরত যয়নব (রা.) বলেন একদা হুজুর (সা.) আমাদেরকে উপদেশ দিয়ে বললেন, “হে নারী সমাজ! তোমরা সদকা কর (যাকাত দাও) যদিও তোমাদের গহনা, অলঙ্কার হয়। কেননা কেয়ামতের দিন তোমরাই জাহান্নামের অধিক অধিবাসী হবে”। যাকাত দাতা আল্লাহ এবং বেহেশতের অতি নিকটবর্তী তা উল্লেখ করে মিশকাত শরীফে সাহাবী হযরত আবু হোরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, “দাতা ব্যক্তি আল্লাহর নিকটে, বেহেশতের অতি নিকটে, মানুষের নিকটে, অথচ দোজখ থেকে দূরে আর কৃপণ আল্লাহ হতে দূরে, বেহেশত হতে দূরে, মানুষ হতে দূরে, অথচ দোজখের নিকটে”। তাছাড়া হাদিসে আরও উল্লেখ আছে “ নিশ্চয় মূর্খদাতা, কৃপণ সাধক অপেক্ষা আল্লাহর অতি প্রিয়”।
যাকাত আল্লাহপাক কর্র্তৃক নির্ধারিত একটি ফরজ আর্থিক ইবাদত। যাকাত আদায় না করিলে পরকালে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনের সুরা আত-তাওবার ৩৪নং আয়াতে এরশাদ করেন, “যারা সোনা রুপা জমা করে অথচ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না তাদেরকে কষ্টদায়ক আজাবের সংবাদ দিন। যে দিন গরম করা হবে সেগুলোকে দোজখের আগুনে। অতঃপর দাগ দেয়া হবে সেগুলো দ্বারা তাদের ললাটে, তাদের পার্শ্বদেশে, তাদের পৃষ্ঠদেশে এবং বলা হবে এখন স্বাদগ্রহণ কর উহার যাহা তোমরা দুনিয়াতে জমা করেছিলে”। যথাযথভাবে যাকাত আদায় না করলে সমাজে অর্থনৈতিক বির্পযয় ঘটে, আল্লাহর গজব নেমে আসে। এ প্রসঙ্গে নবীজি (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এরশাদ করেন, “যদি কোন সম্প্রদায়ের লোকরা যাকাত প্রদান না করে তাহলে তারা অনাবৃষ্টির শিকার হয়। যদি পশু-পাখি না থাকত তবে তারা বৃষ্টি থেকে একেবারেই বঞ্চিত থাকত”। মুসনাদে আহমদের ৮৪৬১নং হাদিসে মহানবী (সা.) আরও এরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ধন সম্পদ দান করেছেন সে যদি যাকাত আদায় না করে তবে কেয়ামতের দিন সে অর্থসম্পদ জঘন্য বিষধর সাপে রূপান্তরিত হবে, আর তা সম্পদের মালিকের গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে’। হাদিসে আরও উল্লেখ আছে পর্যাপ্ত পরিমাণ স্বর্ন রৌপ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যখন যাকাত আদায় করে না কেয়ামতের দিন সেই স্বর্ণ রৌপ্যের পাতকে দোজখের উত্তপ্ত আগুনে তাদের পৃষ্ঠদেশে ও মুখম-লে ছেঁক দেয়া হবে”। হাদিসে আরও বর্ণিত আছে, “যে জাতি যাকাত রুখে দিবে সে জাতিকে আল্লাহ দুর্ভিক্ষে পতিত করবেন”। কোন মুসলমান যাকাত না দিলে সে পরিপূর্ণ মুসলমান থাকতে পারে না।

 



 

Show all comments
  • Yusuf Anu ২০ মার্চ, ২০১৬, ১০:১৬ এএম says : 0
    Right
    Total Reply(0) Reply
  • Hafizur Rahman ২০ মার্চ, ২০১৬, ১০:১৭ এএম says : 0
    Must!must!!must!!!
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন