Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
শিরোনাম

রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর পয়গামও শিক্ষার বিশিষ্ট ফল

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্শী | প্রকাশের সময় : ৯ নভেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

বক্ষমান নিবন্ধে আমরা এমন একটি সন্দেহের অপনোদন করতে প্রয়াস পাব, যা কোন কোন লোক রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর সিফাতে তাবলীগ বা প্রচারের স্বরূপ সম্বন্ধে পোষণ করে থাকে। আল-কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এই অর্থপূর্ণ বাণী রয়েছে যে, ‘রাসূলগণের কাজ হচ্ছে শুধু কেবল পয়গাম পৌঁছে দেয়া’ এর দ্বারা কতিপয় ক্ষীণদৃষ্টিধারীদের এই ধোকা হতে পারে যে, রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু কেবল অহীয়ে ইলাহীর তাবলীগ করা। অর্থাৎ কুরআনুল কারীমের শব্দগুলোকে মানুষের কাছে হুবুহু পৌঁছে দেয়াই তাঁর দায়িত্ব। এগুলোর তাত্তি¡ক বিশ্লেষণ, উদ্দেশ্যাবলীর সঞ্চালন তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়। এমনকি এই অধিকারও তাঁকে দেয়া হয়নি। তাদের দৃষ্টিতে মুবাল্লেগ রাসূলের পদমর্যাদা হচ্ছে একজন কাসেদ বা সংবাদবাহক তুল্য। যে একস্থান হতে অন্য স্থানে চিঠি পৌঁছে দেন। কিন্তু এই চিঠির ভাষার অর্থ, মর্ম বিশ্লেষণ করার দায়িত্ব তার নয়। এমনকি সে একথাও জানে না যে, আবদ্ধ খামে কি আছে।
হয়ত তাদের মাঝে এই ধোকা এই আয়াত ছাড়া ‘রাসূল’ শব্দটি সম্পর্কেও হয়ে থাকতে পারে। এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে-কাসেদ বা বার্তাবাহক। কিন্তুু তাদের মাঝে এই খেয়াল নেই যে, যেখানে তাঁকে রাসূল বলা হয়েছে, ঠিক একইভাবে নবীও (খবর প্রাপক) বলা হয়েছে। তাছাড়া মুবাশশির (খোশ-খবরদাতা) নাজীর (ভীতি প্রদর্শনকারী), সিরাজুম মুনীর (আলোকোজ্জ্বলকারী বাতি) সুবিজ্ঞ মহৎ চরিত্রের অধিকারী, প্রশংসিত স্থানের অধিকারী, মুজতাবা (মাকবুল) মুজতাবা (মর্যাদাশীল), মুবিন (বয়ান ও বিশ্লেষণকারী), মুয়াল্লিম (শিক্ষাদাতা), মুযাক্কি (পবিত্রকারী), আল্লাহর দিকে আহŸানকারী, হাকেম (ফায়সালাকারী), মুতায়িন ও (আনুগত্যপ্রাপ্ত), নির্দেশদাতা, নিষেধাজ্ঞাকারীও বলা হয়েছে। তবে কি এসকল গুণাবলী কেবলমাত্র একথাই প্রকাশ করে যে, তিনি শুধু কাসেদ ও পয়গাম দানকারী ছিলেন? না এমনটি নয়। এ সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর সাথে একজন মামুলী কাসেদ ও পত্রবাহকের কোন তুলনাই চলতে পারে না।
রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর পয়গামের তফসীর ও বিশ্লেষণ বহু আরবী ভাষাবিদ করেছেন। এর মূলমর্ম উদঘাটনের দাবীও অনেকে করেছেন। কিন্তুু যিনি পয়গামের অধিকারী ছিলেন, তিনি নিজের পয়গাম্বরীর সময় এর অর্থ ও মর্ম সম্পর্কে জানতেন না এবং এর বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ সম্বন্ধে অনবহিত ছিলেন-এটা তো এক আশ্চর্য কথা। এটা তো মোটেই সম্ভব নয়। সুতরাং আমরা ইতিপূর্বে যা উল্লেখ করেছি, এতেই তাদের এ জাতীয় ধারণা বাতিল হয়ে যায়।
বিরুদ্ধবাদীদের সন্দেহ করার একটি কারণ এও হতে পারে যে, ইসলামের আইন প্রবর্তন ও বিধান জারির অধিকার কেবলমাত্র আল্লাহ পাকের জন্যই স্বীকার করা হয়েছে এবং তিনিই হচ্ছেন আসল বিধানদাতা। সুতরাং রাসূলের জন্যও অহীয়ে কিতাবের দ্বারা পৃথক বিধান তৈরীর অধিকার যদি স্বীকার করা হয়, তাহলে আল্লাহ ছাড়া অপর এক বিধানবার্তার কথাও স্বীকার করা হয়।
এই অভিযোগ ও সন্দেহের প্রথম উত্তর হচ্ছে এই যে, আমরা রাসূলকে বিধানদাতা নয় বরং বিধান প্রবর্তনকারী বা বিশ্লেষণকারী মনে করি। তবে কি আদালতে জজ বা বিচারক যখন স্বীয় আসনে বসে রাষ্ট্রীয় কানুনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেন, তিনি কি স্বীয় এই কাজের মাধ্যমে তখনকার সুলতান হয়ে আইন প্রবর্তকের পদমর্যাদা লাভ করেন অথবা শুধু আইনের বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করেন? এই অবস্থা ঐশী আদালতের কাজীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যাকে আমরা নবী এবং রাসূল, মুয়াল্লিম এবং মুবীন বলে থাকি।
আর দ্বিতীয় উত্তর হচ্ছে এই যে, আল্লাহপাক স্বীয় প্রত্যেক পয়গাম এবং উদ্দেশ্য ও উপলক্ষ এবং এর ফায়সালার দ্বারা শুধু কেবল অহীর সেই নির্দিষ্ট তরীকার মাধ্যমে স্বীয় পয়গাম্বরকে অবহিত করেন না, যে নির্দিষ্ট তরীকার দ্বারা কুরআন নাজিল হয়েছ; বরং তিনি তিনটি শ্রেণীর দ্বারা আপন উদ্দেশ্য সেই রাসূলের উপর তুলে ধরেন এবং এর মাঝে প্রত্যেক শ্রেণীর অহীর আনুগত্যকে উম্মতের উপর ফরজ করেছেন। চাই তা সরাসরি অহী হোক যা আল্লাহর শব্দের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যাকে কোরআন বলা হয়, অথবা রাব্বানী অর্থ ও মর্ম রাসূলের মুখ নি:সৃত শব্দে প্রকাশ হোক যাকে হাদীস ও সুন্নাত বলা হয়। মোট কথা, তা কিতাবে ইলাহীর দ্বারাই হোক অথবা হেকমতে রাব্বানীর ফায়সালা দ্বারাই হোক উম্মতকে তা মানতেই হবে।
কুরআনুল কারীমের ঐ সকল আয়াত যার অর্থ হচ্ছে এই যে, “আমাদের রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু পয়গাম পৌঁছানো”-এর উদ্দেশ্য শুধু এই নয় যে, তিনি কেবলমাত্র পয়গাম পৌঁছানেওয়ালা। শুভ সংবাদ শোনানেওয়ালা নয়, হুঁশিয়ার ও সতর্ককারী নয়, পয়গামে ইলাহীর শব্দাবলী শ্রবণ করার পর এগুলোর শিক্ষাদাতা নয়, আয়াতে ইলাহীর বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যাকারী নয়, হাদী ও পথ প্রদর্শক নয় এমনকি পবিত্রকারীও নয়। সুতরাং এমন কথা বলা কুরআনের বিপরীত এবং জ্ঞান ও সমীক্ষার খেলাপ। আল-কুরআনের কয়েক স্থানে ঘোষণা করা হয়েছে, “অবশ্যই আপনি ভীতি প্রদর্শনকারী।” (সূরা সোয়াদ, রা’য়াদ, নাযিয়াত) অপর এক স্থানে আছে, “আমি অবশ্যই ভীতি প্রদর্শনকারীমাত্র। (সূরা সোয়াদ) তবে কি এই সকল আয়াতের অর্থ এই যে, ভীতিপ্রদর্শন ছাড়া রাসূলের দায়িত্ব ও কর্তব্য রিসালত ও খোশ-খবরী শোনানো নয়? তিনি শুধুমাত্র ভয় প্রদর্শনকারী, শুভ সংবাদ দানকারী নন? আসল কথা হচ্ছে এই যে, এই শ্রেণীর আয়াতসমূহ এবং “আমাদের রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু পয়গাম পৌঁছে দেয়া” (সূরা মায়িদাহ : রুকু-১২) এর অর্থ এই নয় যে, তিনি শুধু কেবল পয়গাম পৌঁছানেওয়ালা ও কাসেদ। সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাকারী নন।
মূলত : রাসূলের দায়িত্ব আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দেয়া। জবরদস্তীর দ্বারা মানুষের মনে এই পয়গামকে বসিয়ে দেয়া নয়, বড় বড় লোকদেরকে মুসলমান বানানো নয়, জবরদস্তী অর্থ-কড়ি আদায় করা নয়। তাছাড়া পয়গাম পৌঁছে দেয়ার পর কুফুর ও অস্বীকৃতি এবং ঈমান না আনার জিম্মাদারীও তাঁর উপর বর্তায় না। সুতরাং আল-কুরআনের যে সকল স্থানে এই আয়াতসমূহ সংস্থাপিত হয়েছে, এগুলোর উদ্দেশ্য ও মর্ম একই। কুরআনুল কারীমের তেরটি আয়াতে এই অর্থবোধক নির্দেশ এসছে। এবং এগুলোর অর্থও তা-ই। ইরশাদ হচ্ছে, “আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে ও নিরক্ষরদেরকে বল, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য হচ্ছে শুধু প্রচার করা। আল্লাহই বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা আলে ইমরান : রুকু-২) এতে স্পষ্ট : বুঝা যায় যে, ইসলামের হেদায়েত কবুল করার মাঝে কোন জবরদস্তী নেই। যদি মানুষ তা কবুল করে, তাহলে তারা সুপথ লাভ করবে। আর যদি অস্বীকার করে তাহলে রাসূলের কাজ হচ্ছে শুধু পয়গাম পৌঁছে দেয়া। যেহেতু তিনি তা পৌঁছে দিয়েছেন, তাই তার দায়িত্ব আদায় হয়ে গেছে। এখন আল্লাহই জানেন, অবিশ্বাসীদের পরিণাম কি হবে।
অপর এক আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, সুতরাং তোমার দায়িত্ব হচ্ছে শুধু পয়গাম পৌঁছে দেয়া এবং আমার কর্তব্য হচ্ছে তার হিসাব গ্রহণ করা।” (সূরা রা’য়াদ : রুকু-৬) এর বিস্তৃত বিশ্লেষণ সূরা গাশিয়াতে ও এসেছে। ইরশাদ হচ্ছে, “সুতরাং তুমি উপদেশ দাও, তুমি তো একজন উপদেশদাতা মাত্র। তুমি তাদের কর্ম নিয়ন্ত্রক নও। তবে কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে এবং কুফুরী করলে আল্লাহ পাক তাকে মহাশাস্তি দিবেন। তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই নিকট। তারপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই কাজ।” (সূরা গাশিয়া : রুকু-১১)
একই অর্থ সূরা শু’য়ারা-তেও তুলে ধরা হয়েছে যে, রাসূলের কাজ হচ্ছে শুধু বুঝানো, প্রচার করা। তাঁকে ফরমানদাতা, সুলতান, দারোগা বানিয়ে প্রেরণ করা হয়নি যে জবরদস্তি মানুষের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করবে। ইরশাদ হচ্ছে, “তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমাকে তো আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। তোমার কাজ শুধু প্রচার করে যাওয়া।” (সূরা শু’য়ারা : রুকু-৫)
কাফেররা যখনই রাসূলদের মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে, তখন রাসূলগণ একথাই বলেছেন যে, আমাদের কাজ হচ্ছে পয়গাম পৌঁছে দেয়া। মানা না মানা তোমাদের এখতিয়ার। ইরশাদ হচ্ছে, “তারা বললো, তোমরা তো আমাদের মত মানুষ; দয়াময় আল্লাহ পাক কিছুই অবতীর্ণ করেননি। তোমরা কেবল মিথ্যাই বলছ। তাঁরা বলল, আমাদের প্রতিপালক জানেন, আমরা তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি। আর স্পষ্টভাবে প্রচার করাই আমাদের দায়িত্ব।” (সূরা ইয়াসীন : রুকু-২)
স্বয়ং আল্লাহ পাক ও রাসূলদেরকে সান্তÍনা দিয়েছেন যে, অবিশ্বাসীদের অস্বীকৃতির দ্বারা অন্তর মুষড়ে ফেলো না। পূর্বতন পয়গাম্বরগণ এমনই করেছিল। পয়গাম্বরদের কাজ মানুষকে মানানো নয়, বরং তাদের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছে দেয়া। ইরশাদ হচ্ছে, “অংশীবাদীরা বলবে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমাদের পিতৃপুরুষেরা ও আমরা তাঁকে ছাড়া অপর কিছুর ইবাদতও করতাম না এবং তাঁর অনুজ্ঞা ছাড়া আমরা কোন কিছু নিষিদ্ধ করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এরূপই করত। রাসূলদের কর্তব্য শুধু সুষ্পষ্ট বাণী প্রচার করা।” (সূরা নহল : রুকু-৫) অপর এক আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, “যদি তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে (এতে কি হবে?) তাহলে তোমার পূর্ববর্তী কাওমের লোকেরাও মিথ্যা সাব্যস্ত করেছিল। আল্লাহর রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।” (সূরা আনকাবুত: রুকু-২)
বস্তুুত: রাসূলের কাজ পৌঁছে দেয়া। বাকী আলিমুল গায়েব আল্লাহপাক যা চান তা-ই করবেন। আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু পৌঁছে দেয়া এবং আল্লাহপাক জানেন, যা তোমরা প্রকাশ কর এবং গোপন কর।” (সূরা মায়িদাহ : রুকু-১২) একই অর্থবোধক আল-কুরআনের অন্যান্য আয়াতগুলো হচ্ছে এই : “তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং সতর্ক হও। যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে জেনে রেখ যে, সুস্পষ্ট প্রচারই আমার রাসূলের কর্তব্য।” (সূরা মায়িদাহ : রুকু-১২)
অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, “আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর তারপর তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তিনি দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী এবং তোমরা তাঁর আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে; রাসূলের কাজ হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।” (সূরা নূর : রুকু-৭) সূরা নহলে ঘোষণা করা হয়েছে, “এভাবেই তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর। তারপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমার কর্তব্য হচ্ছে কেবল স্পষ্টভাবে বাণী পৌঁছে দেয়া।” (সূরা নহল : রুকু-১১) সূরা তাগাবুনে ঘোষণা করা হয়েছে, “আর আল্লাহর আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমার রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দেয়া।” (সূরা তাগাবুন : রুকু-২) আর পয়গাম্বরদের কথা হচ্ছে এই যে, “সুতরাং যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমাকে যে পয়গামসহ তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল আমি তা তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।” (সূরা হুদ : রুকু-৫)
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহের সম্পর্ক হচ্ছে, নবুওত অস্বীকারকারীদের সাথে। এক্ষেত্রে একথাও লক্ষণীয় যে, যারা শুধু কেবল নবুওতের অস্বীকারকারী, তাদের প্রতি রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে শুধু তাবলীগ, নসীহত, সতর্কীকরণ ও বুঝানো। কিন্তু যে সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি নবুওতের স্বীকৃতি প্রদান করেছে, তাদের সাথে রাসূলের অনুসরণ ও আনুগত্যসুলভ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এরপর রাসূল তাদেরকে শুধু তাবলীগই করেন না, বরং আদেশ-নিষেধও করেন। কোন প্রশাসন ভিন্ন রাজ্যের বাসিন্দাদের জবরদস্তী প্রজা বানায় না। কিন্তুু কোন লোক যদি স্বেচ্ছায় প্রশাসনের প্রজা বনে যায়, তাহলে তাকে এর আইন-কানুন পালনে বাধ্য করা হয়। সুতরাং প্রজা হওয়ার অর্থই হচ্ছে সেই প্রশাসনের বিধি-বিধান মেনে নেয়া। এই পৃথিবীতে যতজন পয়গাম্বর আগমন করেছেন, তাঁরা একই দ্বীন এবং একই আকীদা-বিশ্বাস নিয়ে আগমন করেছেন, তাওহীদ, একই নবুওত, একই ইবাদত, একই আখলাক, একই শাস্তি ও পুরষ্কার এবং একই আমলী জিন্দেগী ছিল তাঁদের জীবন-দর্শন। একারণে আম্বিয়াদের শিক্ষার মাঝে কোন প্রভেদ ছিল না। এ জন্য আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “আল্লাহ পাক তোমাদের জন্য সেই দ্বীনকে বিধিবদ্ধ করেছেন, যা নূহ (আ:) এবং অন্যান্য পয়গাম্বরকে প্রদান করেছিলেন। এরই নাম হচ্ছে ইসলাম।” কিন্তুু আম্বিয়াদের নীতিমালার প্রধান ও প্রয়োজনীয় দিক ছিল, তাওহীদ। আর এটাই হচ্ছে নবুওতের মূল কাঠামো অবিনশ্বর প্রবাহ। সম্ভবত : ইসলামের পরিপূর্ণতার পূর্বে বহু ভালো মানুষ অতিবাহিত হয়েছেন। তাদের আহŸানও হয়ত উপকারী ছিল। তাঁদের চারিত্রিক নসীহত হয়ত হৃদয়গ্রাহী ছিল। চাই তারা গ্রীক-দার্শনিকই হোক অথবা হিন্দুস্থানের অবতারই হোক। কিন্তু তাদের দাওয়াত ও আহŸানের সাথে যদি তাওহীদ শামেলে হাল না হয়ে থাকে, তাহলে তারা নুবওতের মর্যাদায় কখনো অধিষ্ঠিত ছিলেন না। পয়গাম্বর-সুলভ শিক্ষার একমাত্র পরিচয়ই হচ্ছে তাওহীদের আহŸান। যদি তা না থাকে তাহলে নবুওত মোটেই থাকতে পারে না। আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “এবং আমি তোমার পূর্বে আর কোনও রাসূল প্রেরণ করেনি, কিন্তুু তাঁকে এই অহী করেছিলাম যে, ‘আমি ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত-বন্দেগী কর।” (সূরা আম্বিয়া : রুকু-২) অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে-“এবং আমি প্রত্যেক কাওমের মাঝেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছি, (এবং এ নির্দেশও তাদেরকে দিয়েছি যে)। আল্লাহর ইবাদত কর এবং শয়তান ও মূর্তিপূজাকে বর্জন কর।” (সূরা নহল : রুকু-৫) সুতরাং এর দ্বারা বুঝা যায় যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে নবুওতের পরিচয় তাওহীদের দ্বারাই লাভ করা যায়। তাই ইসলাম পরিপূর্ণতার পূর্বেকার যে সকল নবুওতের দাবীদারদের শিক্ষার প্রধান অংশ বা ভিত্তি তাওহীদ নয়, তাদের নবুওতের দাবীদার হওয়ার কোনই অধিকার নেই।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।