Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

আবার যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে সউদী আরব

নিউ আরব | প্রকাশের সময় : ১০ নভেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

তরুণ সউদী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এক ভয়ঙ্কর খেলা খেলছেন। তিনি তার ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং ইরানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হতে ও এ অঞ্চলে আরেকটি লড়াই শুরু করতে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস ও রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের সমর্থনের সুযোগ নিতে চান। বিশ্লেষকরা বলছেন, সউদী আরব আবার যুদ্ধের দামামা বাজাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিনিয়র উপদেষ্টা ও জামাতা জেয়ার্ড কুশনারের এর আগে অঘোষিত সউদী সফরের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায় মার্কিন প্রশাসন মোহাম্মদ বিন সালমানের ইরানের প্রতি ক্রমবর্ধমান কঠোর মনোভাব সমর্থন করছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে সিরিয়া ও ইরাকে ইরানি প্রভাব অব্যাহত ভাবে টিকে আছে এবং ইয়েমেনে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। ইরানের সাথে সংঘাত এখন লেবাননে বিস্তৃত হতে চলেছে। সউদী সাধারণ প্রথা হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমে যুদ্ধের পক্ষে যৌক্তিকতা প্রদর্শন শুরু হয়। সউদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল বিন আহমেদ আল জুবায়ের বলেছেন যে ইয়েমেন থেকে সউদী আরবে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ছিল একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র যা হেজবুল্লাহ কর্তৃক নিক্ষিপ্ত হয়েছে । এটা হচ্ছে যুদ্ধের কাজ এবং সউদী আরব এর জবাব দেবে।
সউদী আরব একা লেবাননে হেজবুল্লাহর সাথে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত হবে বলে মনে হয় না। তবে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে রিয়াদে তলব করা এবং ইসরাইলের সাথে এমবিএসের সাম্প্রতিক সৌহার্দ প্রতিষ্ঠার চেষ্টার মধ্যে ধাঁধার জবাব আছে বলে মনে হয়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু যে হেজবুল্লাহ ও ইরানের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত তা কোনো গোপন বিষয় নয়। আর সউদী আরব এবং বিশেষ করে ইসাইলের মিত্রদের সঠিক চাপের প্রেক্ষিতে এ ধরনের চেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসে অনুক‚ল অবস্থা বিরাজ করছে।
এটা দেখার বিষয় যে ইয়েমেনে সউদী নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে মানবিক বিপর্যয় ও জলকাদায় গড়াগড়ি খাওয়ার প্রেক্ষাপটে অব্যাহত মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সউদী ও ইসরাইলি উচ্চাভিলাষ পূরণে সমর্থন করতে কতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়।
এদিকে সউদী আরবে গত শনিবার গ্রেফতার অভিযানের আগে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি জেদ্দায় বসে পদত্যাগ করেন। হারিরি অভিযোগ করেন যে লেবাননের রাজনীতিতে হেজবুল্লাহর প্রাধান্য ও তার জীবনের প্রতি হুমকির কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
অনেকের বিশ^াস যে সউদী আরবের চাপেই হারিরি পদত্যাগ করেছেন। সউদী আরবে লেবাননের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুন্নী নেতা হারিরির বিরাট ব্যবসা রয়েছে এবং লেবাননের উপর রয়েছে সউদী আরবের বিপুল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব। তারা হারিরির পদত্যাগকে ইরান সমর্থিত হেজবুল্লাহকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা এবং তাদের সাথে লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে হেজবুল্লাহর সাথে তাদের লেবাননের সুন্নী মিত্রদের সহযোগিতা বন্ধ করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
সউদী গ্রেফতার অভিযান ও রিয়াদে ইয়েমেনের শিয়া হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাসহ অন্যান্য ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে হারিরির পদত্যাগ আঞ্চলিক ব্যবস্থায় এক বিপজ্জনক মোড় নেয়ার ইঙ্গিত।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের জুন মাসে সউদী বাদশাহ সালমান যুবরাজ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অপসারণ করেন। তার জায়গায় তিনি তার পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) যুবরাজ নিয়োগ করেন।
সউদী রাজপরিবারের অন্য শাখাগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখার এবং বাদশাহ সালমান ও তার পুত্র তরুণ নতুন যুবরাজের ক্ষমতা সংহত করার এটাই ছিল প্রথম প্রকাশ্য পদক্ষেপ।
যুবরাজ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগেই বিন সালমান আগ্রাসী অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা গ্রহণ ও কঠোর পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়ন শুরু করেন। তিনি কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার, হাজার হাজার চরম রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতাকে বরখাস্ত করেন, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করেন, জিসিসি সংকটের সূচনা ও কাতার অবরোধ করেন এবং ইরানের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন।
গত শনিবার সউদী শাহজাদা ও মন্ত্রীদের গ্রেফতার এবং সোমবার আরো গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে যুবরাজের এ অভিযান আরো জোরদার হয়। খবরে বলা হয়, সউদী আরবে ১২শ’রও বেশি ব্যাংক এক্উান্ট আটক করা হয়েছে।
একদিকে দেশে সংস্কার, অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং আধুনিক ইসলামীকরণ অন্যদিকে এমবিএস তার বিরোধী ও প্রভাবশালী সউদী নাগরিকদের গণ গ্রেফতারের এক নতুন অভিযান শুরু করেছেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ও সংস্কারের অগ্রনায়কের ব্যানারের নিচে তিনি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তার সর্বময় ক্ষমতা সংহত করার ব্যাপক মাত্রার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বৃহত্তর প্রভাব বিস্তার করেছেন। কিন্তু এ ধরনের আবেগপ্রবণ শত্রæতা সৃষ্টিকারী পদক্ষেপের জন্য মূল্য দিতে হয় যা ভবিষ্যত বাদশাহ হিসেবে তার টিকে থাকা অথবা এ অঞ্চলে বিপর্যয়কর যুদ্ধের ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই না প্রতিদ্ব›দ্বীদের নিকেশ করা?
১১ জন শাহজাদা, ৪ জন মন্ত্রী এবং সাবেক মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বের গ্রেফতারকে (রাজপরিবারের অন্যান্য প্রতিদ্ব›দ্বী শাখার সদস্যরাসহ যেমন ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রী মিতেব বিন আবদুল্লাহ) সউদী এটর্নি জেনারেল প্রথম পর্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন আরো গ্রেফতার হবে।
এ পদক্ষেপকে যদিও দুর্নীতি বিরোধী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে কিন্তু সন্দেহ নেই যে আসলে এর লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিদ্ব›দ্বীদের নির্মূল ও যুবরাজের শক্তিকে সংহত করা।
তাত্তি¡কভাবে যদিও দুর্নীতি বিরোধী লড়াই অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ কিন্তু এটা দেখা কঠিন যে পিতা কর্তৃক নিযুক্ত একজন নেতার দ্বারা বিচার বহির্ভ‚ত গ্রেফতারের মাধ্যমে তা কীভাবে অর্জিত হতে পারে।
যুবরাজ যখন সংস্কার অভিযানে নেতৃত্ব দেয়ার দাবি করছেন তার মধ্য দিয়ে তিনি সউদী রাজনীতির স্পর্শকাতর ভারসাম্যে ঝাঁকুনি দিচ্ছেন।
একদিকে সউদী আরবের ক্ষমতার ভারসাম্য আবদুল আজিজ বিন সউদের পুত্রদের শাখা কর্তৃক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রক্ষা করা হচ্ছে। যেমন শাহী পরিববারের নায়েফ শাখা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আবদুল্লাহ শাখা ন্যাশনাল গার্ড এবং সুলতান শাখা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দেখে।
যুবরাজের ধাক্কা এই ভারসাম্যের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং সম্ভবত হাউস অব সউদের হাজার হাজার সদস্যকে ক্রুদ্ধ করেছে।
অন্যদিকে ওয়াহাবি ইমামদের প্রান্তিকীকরণ করে যুবরাজ বিন সালমান সউদী শাহী পরিবারের প্রতি তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের ঐতিহাসিক ধর্মীয় বৈধতা প্রদানের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে যে দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে ওয়াহাবি ঐতিহ্য বলবত সে দেশে এটা তার আশংকার চেয়েও বড় ঝুঁকি বলে প্রমাণিত হতে পারে।
যুবরাজ যখন পরিবর্তন প্রত্যাশী সউদী যুব সমাজ, পাশাপাশি বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিশ^াসী বয়স্ক প্রজন্মেরও ক্রমবর্ধমান সমর্থন লাভ করছেন সে সময় তিনি যদি দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে অসন্তুষ্ট করে তোলেন তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের পর তার কর্তৃত্ব আর নাও টিকতে পারে।
যাহোক, নেতারা প্রায়ই জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পেতে যুদ্ধের আশ্রয় নিয়ে থাকেন্। প্রকৃতপক্ষে সউদী আরবকে আঞ্চলিক যুদ্ধগুলোতে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে দেশের মধ্যে জনসমর্থন লাভ ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য যুবরাজ বিন সালমানের একটি পন্থা।

 


Show all comments
  • আমিনুল ইসলাম ১০ নভেম্বর, ২০১৭, ৩:৪২ এএম says : 0
    হে আল্লাহ এই পূর্ণভুমিকে তুমি রক্ষা করো।
    Total Reply(0) Reply
  • ismail ১৩ নভেম্বর, ২০১৭, ৭:২২ পিএম says : 0
    বিন সালমানের এ বিপজ্জনক খেলাই সৌদিআরবের রাজতন্ত্রের পতন তরান্বিত করবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ