Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ সফর ১৪৪১ হিজরী

ওয়ারিশ

গ ল্প

| প্রকাশের সময় : ২৪ নভেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রোকেয়া ইসলাম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সোনালী গাড়িতে এলেন লিডার। চেহারা আপেল রাজপুত্রের মতই। যৌবনে তিনি ছিলেন সুদর্শণ। রোদে জলে নানা অত্যাচারের ছাপটা ভাল ভাবেই বসেছে বয়সের ছুঁতোয়। ক্ষমতাবান ও টাকাওয়ালাদের অনিয়মের ছাপটা চেহারায় বসে অভিজ্যাত্যের স্বাক্ষর হয়ে।
উনি আসার সাথে সাথেই সিগনেচারের পালা শুরু হয়। এই যে জমি বিক্রি নিয়ে ওদের এতো সংগ্রাম এতো প্রতীক্ষা তা শেষ হচ্ছে এই ছোট্ট একটা সিগনেচারের মধ্যে দিয়েই। একসেট করে কাগজ বের করে লিডারের সামনে মেলে ধরছে সুরাইয়ার মেঝভাই। সে উকিল, আইনের মারপ্যাচ ভালই রপ্ত করেছেন সে। তার দীর্ঘ প্রচেষ্টায়ই আজকের এই সফলতা।
একসেট কাগজ বলতে জাতীয়তা সনদের সত্যায়িত কপি বর্তমান সময়ের দুইকপি ছবি, যাদের পাসপোর্ট আছে, সেটার ফটোকপি, আর “না দাবীর” সনদের কপি । সিগনেচার শেষে ভাগের টাকা গুনে বিগলিত হাসি দিয়ে সরে আরেকজনকে জায়গা করে দিয়ে আসে।

মামা খালাদের সিগনেচারের পর ওদের প্রজন্মের ডাক পড়ে। প্রথমেই সুরাইয়ার পালা। সুরাইয়া মা ছিল ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড়। সুরাইয়াও মায়ের পথ ধরেই পৃথিবীতে আগমন করেছে।
সব কাজ শেষ করে যানযট পেরিয়ে বাসায় পৌছতে পৌছতে দিন প্রায় রাতকে ধরে ফেলতে চায়। অবশ্য দিন কোন দিনও রাতকে ধরতে পারেনা। সূর্য অস্ত যেতেই সময়ের নাম হয় ভিন্ন । পরিচয়ও ভিন্ন।
ক্ষুধা ক্লান্তিতে শরীরটা নুয়ে পড়তে চায়! ব্যাগটা বিছানায় ছুঁয়ে দিয়েই, দৌড়ে বাথরুমে ঢোকে, সারাদিনের ভার শরীর থেকে নামাতে।
মধ্য বসন্তের এইসময়টা বেশ তাতানো। ঘামে জবজবে নিজেকে অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ারে ভেজায়।
গোসল সেরে বেরুতেই খেয়াল করে এতোক্ষনের সমদূত ক্ষুধাটা মিইয়ে গোবচোরা হয়ে গেছে। এক কাপ লাল চা হলে ভাল হতো। শরীরটা ঝরঝরে হলেও যথেষ্ট ক্লান্তি আছে। চা পানের ধকলটাও সইতে ইচ্ছে করছে না।
ভেজা কাপড় চীপে দড়িয়ে টান টান করে মেলে দেবার মত করেই শবাসনে নিজেকে ছেড়ে দেয় বিছানায়। হাতটা সোজা করার জন্য নাড়তে গিয়ে খাটের মাঝখানে টাকা ভর্তি ব্যাগটার সাথে ষ্পর্শ লেগে যায়।
সুরাইয়া কখনও টাকার অবমাননা করে না। এটা নানাীজানের কাছ থেকে পাওয়া স্বভাব। নানীজানের অনেক দোষ ও গুন সুরাইয়ার অবচেতনে ওর মাঝে বিরাজ করে।
আনমনেই ব্যাগটা টেনে কাছে আনে। এই ব্যাগে যে পরিমান টাকা আছে তা দিয়েইতো নানীজান মামারা ঘোরাতে চেয়েছিল জীবন রথের চাকা। উল্টো রথে ঘোরেনি সেদিন। বুক কাঁপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোয।

ওর নানীজান ছিলেন ধনী বনেদী-ঘরের কালো কুচকচে এক কন্যা। পুত্রদের সবাইকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন নানীজানের বাবা। দুই কন্যার বেলায় দরিদ্র ঘরের সুদর্শণ ছেলে খুঁজে বিয়ে দিয়েছিলেন। বেকার অলস জামাতাদের ঘরেই রাখলেন তার জীবদ্দশায়। বাবার মৃত্যুর পর বোনদের আর জায়গা হল না ভাইদের বাড়িতে। তবে ক্ষুদ্র ঋণের মত ঋণ দিয়ে আরো ক্ষুদ্রই করে রেখেছিলো। না সম্মান, না অর্থ, কোনটাতেই জোরালো দাবী করতে পারতো না বোনরা।
মামারা বড় হবার পর মাকে খুব ঠেলতো বাবার বাড়ীর অংশ দাবী করতে।
ভাইদের কাছে তিনি ছিল অতি ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র আর অপদার্থ। বাবার সম্পতি তখনও বড়ভাই তার ব্যাক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাস্ততায় বাটোয়ারা করার সময় বার করতে পারছে না।
নানীজানের হত দরিদ্র সংসারের সাথে শৈশব থেকেই পরিচীত ছিল সুরাইয়া। ছোটবেলায় নানীজান আদর করে ওকে কাছে রাখতো। সুরাইয়ার বাবা খুবই বুদ্ধিমান ছিলেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের দরিদ্র শাশুড়ীকে সরাসরি হাত দিয়ে সংসার খরচের টাকা সেঁধে লজ্জায় ফেলতেন না। দিতেন তার কন্যার খরচের বহনের মোটা টাকা।
অপরিসর দুই রুমে ভাড়া বাড়ীতে থাকতেন নানীজান তার পরিবার নিয়ে।
সুরাইয়ার দুই মামা তখন পুরোপুরি বেকার একজন ছাত্র, দুই খালা অবিবাহিতা এক খালা সদ্য তালাকপ্রাপ্তা। বুড়ো নানা ভাই অনেক দ্বার ঘুরে শেষ বয়সে বেসরকারী জাহাজ কোম্পানীতে ছোট একটা চাকুরী করে।
নানীজান নিয়মিত ভাবে দুহাতে সংসারের অভাব সরিয়ে রাতকে দিন করার চেষ্টায় রত থাকতেন। বাড়ী ভাড়া একমাস দিতে পারলেও জমে যেত বেশ কয়েক মাস।
বাড়ীওয়ালা সাদা রাজহংসের মত গাড়ীতে।

চার মাসে একবার ভাড়া আদায় করতে আসতো। বেশ কয়েকটা ছোট ছোট ঘর মিলে তার একটা বাড়ী।
আজকের মত সেদিন এতো গাড়ীর আধিক্য ছিলনা। গাড়ীর আওয়াজেই সুরাইয়া জানালার মলিন পর্দা উঁচীয়েই ভয়ে চীৎকার করে উঠতো। ওর চীৎকারেই মামারা পেছনের দরজা দিয়ে বাড়ী ছাড়তো। বিবর্ণ ভয়ে শুকিয়ে যাওয়া মুখটায় জোর করে হাসি ফুটিয়ে দরজা খুলে দিতে নানীজান।
বাড়ীওয়ালা বিরস মুখে বারান্দায় দাঁড়াতো, নানীজান গামছা দিয়ে পরিস্কার চেয়ারটাকে আরো পরিস্কার করে এগিয়ে দিতো। বাড়ীওয়ালা চেয়ারে বসেই শুরু করতেন অগ্নিবর্ষণ। ছোট সুরাইয়া তাকিয়ে দেখতো অনবরত অগ্নি গোলক নিক্ষেপের মুখেও স্থির দাড়িঁয়ে থাকতো নানীজান। বড় হবার পর অনেক সমস্যায় নানীজানের স্থির মুখচ্ছবি সাহস জোগাতো অনেক খানি।
এমনি একদিন রাজহংস বাহন বাড়ীওয়ালা এলো। যেটা ষাট দশকের শেষ দিককার কথা।
অবাক কান্ড আজ অগ্নিবর্ষণ হচ্ছেনা। মধু বর্ষণও নয় সহনীয় ভাষায় নানীজানকে আরেকটা চেয়ার পাশে টেনে বসতে বলে। খালারা লাফ দিয়ে উঠে উঁকি ঝুকি দিতে থাকে। ছোট্ট সুরাইয়াও অচেনা পরিস্থিতিতে হক চকিয়ে যায়।
খুব সহজ একটা বিষয় নানীজানের সাথে আলোচনা করে বাড়ীওয়ালা। বিষয়টা হল বাড়ীওয়ালার এখন নগদ টাকার খুব দরকার, তাই অকেজো এই বাড়ীটা বিক্রি করে দিতে চাইছে। নানীজান যদি রাজী থাকে তবে অন্য গ্রাহকদের চেয়ে বেশ কমইে ছেড়ে দেবে। সময়ও বেধেঁ দিল। সাথে পথও বাতলে দিল, পথটা পুরোনো, ভাইদের কাছ থেকে নিজের অংশ নিয়ে এই বাড়ীটা কেনা।
এই প্রথম বাড়ীওয়ালা নানীজানের কাছে এক গøাস পানি চাইলো। কি যে যতেœ নানীজান হীরে চমকানো কাচেঁর গøাস ভর্তি স্বচ্ছ পানি এনে দিল। যেন গøাসে পানি নয় “সরাবান তহুরা”।

ঢক ঢক করে নি:শেষে পানিটুকু পান করে চলে গেল। খারাপ খবর যেমন বাতাসের আগে ছোটে, তেমনি বাড়ীওয়ালার গাড়ীর শব্দ হাওয়ায় মিলিয়ে যাবার আগেই মামাদের কাছে পৌছলো এই আশা জাগানিয়া সংবাদটা।
ছোট মামা দুহাত তুলে নাচতে লাগলো এই বাড়ী নিজেদের হবার আনন্দে। খালারও খুশি মনে নানীজানকে জড়িয়ে ধরে। (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ