Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

স্বাস্থ্যসেবায় নয়, সভা সেমিনারে ব্যয়

স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের ব্যবহার

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : | প্রকাশের সময় : ২৭ নভেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ধূমপানের কারণে ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থ ব্যয়ের দাবি জানিয়ে আসলেও বিষয়টি উপেক্ষিতই থেকে গেলো। এই অর্থ চিকিৎসা সেবায় ব্যয় হচ্ছে না। শুধুমাত্র সচেতনতা, সভা ও সেমিনারেই বিপুল অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য উন্নয়নে সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতি-২০১৭ চূড়ান্ত গেজেটও হয়ে গেছে।
দেশের খ্যাতিমান বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. মুর্তুজা খায়ের বলেন, স্বাস্থ্য উন্নয়নে সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতির মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিৎ ছিলো অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও পুণর্বাসনে ব্যয়।
তামাক বিরোধী সংস্থাগুলো বলছে, তামাকের ভয়াবহ ক্ষতির শিকার যেসব রোগী মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্যই সারচার্জ আদায়ের আন্দোলন হয়। ২০১৪-১৫ অর্থ বছর থেকেই স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থ গ্রহন শুরু হয়। সে সময় বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘তামাকের উপর ১% হারে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ গ্রহন করা হবে। এই সারচার্জ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য তামাকের কারণে সৃষ্ট অসংক্রামক রোগ সমূহের প্রভাব থেকে রোগীদের চিকিৎসা ও পুণর্বাসন।’
গত তিন বছরে তামাক কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। বছর বছর এই অঙ্ক বাড়ছে। স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে আরোপিত এক ধরনের শুল্ক- যা সাধারণত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার হ্রাস ও ব্যবহারজনিত অসুখের চিকিৎসা খরচ মেটাতেই সারচার্জ আরোপের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ করা হয়। কিন্তু সারচার্জ ব্যবস্থাপনায় যে নীতি করা হয়েছে সেখানে এ বিষয়গুলো উপেক্ষিত।
সম্প্রতি প্রকাশিত গেজেটে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থ ব্যবহারের ১৪টি খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের কার্যক্রম পরিচালনা, তামাকের ব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ, প্রচার-প্রচারনা, টাস্কফোর্স গঠন, সভা-সেমিনার, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সারচার্জ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সাধারণত সংশ্লিষ্ট রোগের চিকিৎসা, গবেষণা, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যয় হয়ে থাকে। বিশ্বজুড়ে সারচার্জ আরোপ ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ১২টি দেশে তামাকপণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক হিসেবে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আদায় করা হয়। দেশগুলো হচ্ছে- ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, কাতার, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, আইসল্যান্ড ও এস্তেনিয়া অন্যতম। ভারতে এ অর্থ দিয়ে ‘বিড়ি ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে। এ ফান্ডের মাধ্যমে নিবন্ধিত বিড়ি শ্রমিকদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সন্তানদের স্কুল ড্রেস, বৃত্তি ইত্যাদি প্রদান করা হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডে এ অর্থ দিয়ে ‘থাই হেলথ ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়েছে। নেপালে এ সারচার্জের টাকায় গঠিত ‘হেলথ ট্যাক্স ফান্ড’ থেকে বিপি কৈরালা মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতাল, নেপাল ক্যান্সার রিলিফ সোসাইটিসহ অন্যান্য কমিউনিটি হাসপাতালে সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। অস্ট্রিয়া, কোরিয়া, ব্রুনাই, কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বেশ কিছু দেশ হেলথ প্রমোশন ফান্ড গঠনের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে থাকে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী স্বাস্থ্য উন্নয়ন তহবিলের মতো অন্যান্য যৌথ তহবিল কেবলমাত্র সংসদের নির্দেশক্রমে বা আইন পাশ করার মাধ্যমেই ব্যবহার করা যাবে। এ কারনে সরকার এই অর্থ ব্যয়ের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতি-২০১৬ গঠিত হয়। গত ৮ অক্টোবর সংসদের ‘সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিতি কমিটি’র বৈঠকের মতামত অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতকে উন্নত করাই হলো স্বাস্থ্য উন্নয়ন তহবিলের মূল লক্ষ্য এবং তামাক চাষীদের জন্য তুলনামূলক লাভজনক বিকল্প ফসল চাষের ব্যবস্থা করা।
২০১৬ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্পীকারদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও তামাক নিয়ন্ত্রণের উপর গুরুত্বারোপ করেন। এই সারচার্জ গ্রহনের প্রাক্কালে বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অর্থ্যাৎ তামাকের কারণে সৃষ্ট রোগ সমূহ যেমন, ডায়বেটিস, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ইত্যাদি নির্মূলে এই অর্থ ব্যবহারের কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীর গতি দেখে তামাক বিরোধী একটি সংগঠন হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করে। যার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট গত ফেব্রুয়ারীতে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ কেন অব্যবহৃত রয়েছে এবং কেন চিকিৎসা/স্বাস্থ্য উন্নয়নে ব্যয় হবেনা তা জানতে চান।
এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি খসড়া তামাক নীতিমালা প্রণয়ন করে। যেখানে স্বাস্থ্য সেবাকে গৌণ করে দেখা হয়। অথচ সেই খসড়া নীতিই মন্ত্রীসভা অনুমোদন দেয়। মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে খসড়া স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ২০১৭ এর উপর আবারো মতামত জানানোর জন্য স্বাস্থ্য সচিবের পক্ষ থেকে অনুরোধ করার কথা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে এ ব্যাপারে মতামত জানানোর সুযোগ দেয়া হয়নি। যেখানে রুল অব বিসনেস ১৯৯৬ এর বিধি অনুসরন করা হয়নি। এছাড়া কোন স্বারক নং ছাড়াই অর্র্থ্যাৎ কোন রকম এসআরও নম্বর ছাড়া গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সারচার্জের অর্থে বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণের দাবী উঠে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন-২০১৬’র তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর ৬৪ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে দরিদ্রতার শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য সেবা দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন দেশের ৬০ ভাগের বেশি মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭-২০১৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষই স্বাস্থ্যের জন্য নিজের পকেট থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে। দেশের স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ ব্যয় হয় তার মাত্র ২৩ ভাগ বহন করে সরকার আর ৬৭ ভাগ ব্যয় করে ব্যক্তি নিজে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬০শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। এসব রোগের চিকিৎসা সেবা দেশে খুবই অপ্রতুল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো করলেও পর্যাপ্ত গবেষনা ও প্রযু্িক্তর অভাবে চিকিৎসাখাত এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। আর তাই চিকিৎসা খাতে নজর দিলে তা বেশি ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন