Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৯ আশ্বিন ১৪২৫, ১৩ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নারী

প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

 আলম শামস

১৯৭১ সাল। পৃথিবীর ইতিহাসে রচিত হয় নতুন এক স্বাধীন ভূখ-। লাল-সবুজ পতাকা। লাখ লাখ জীবনের বিনিময় অর্জিত হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সংগ্রাম মানে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার সশস্ত্র সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়লে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু হয়। পঁচিশ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ঢাকায় অজগ্র সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ হত্যা করে। গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
শুরু হলো স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাংলার কিশোর তরুণ যুবক সকল বয়সের নর-নারী প্রিয় দেশকে শুত্রুমুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর শুত্রুমুক্ত হয় বাংলাদেশ।
এই স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকাও কম নয়। আমরা জানি যুদ্ধ মানে গোলাগুলি-আগুন, যুদ্ধ মানে নিজ দেশ থেকে অন্য দেশে পলায়ন, যুদ্ধ মানে ঘরবাড়ি প্রিয়জনের বিচ্ছেদ-শত্রুর নির্যাতন-অত্যাচার। আর যুদ্ধে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী। মা, স্ত্রী বা বোন হিসেবে প্রিয়জনকে হারানো এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ নিজের সম্ভ্রম হারানো বাংলাদেশের নারীরা যুগে যুগে জাতির যে কোন ক্রান্তিলগ্নে যেমন এগিয়ে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধেও এগিয়ে এসেছেন একইভাবে, যুদ্ধ প্রস্তুতিকাল থেকে যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নারীর জীবনে সবচাইতে বেশি নেমে এসেছে দুর্যোগ। মুক্তিযুদ্ধে নারী যেমন অস্ত্র হাতে সম্মুখ যুদ্ধে লড়েছেন- তেমনি যুদ্ধাহতদের সেবা দিয়েছেন মুক্তি যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, গোপনে অস্ত্র ও তথ্য সরবরাহ করেছেন জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে।
বরিশালের মেয়ে ১৯ বছরের করুণা বেগম। তার স্বামী মুক্তিযোদ্ধা জাহিদুল হাসানসহ আরো তিনজনকে পাকসেনারা গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করে নদীতে ফেলে দিয়েছিল তাদের মৃতদেহ। প্রতিশোধের দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় করুণা বেগম তার একমাত্র ছোট ছেলেকে শাশুড়ির কাছে রেখে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা যোদ্ধার ট্রেনিং নিলেন- চুল কেটে পুরুষের ছদ্মবেশে- “গোপন জায়গা থেকে আঘাত কর এবং পালাও”- এই রণকৌশলে বরিশালের ‘নলছিড়া’ ক্যাম্পের একজন যোদ্ধা হিসাবে বিভিন্ন অপারেশনে অংশও নিলেন সফলতার সাথে। অতঃপর একটা সময়ে এমনি এক অপারেশনে গুরুতরভাবে আহত হয়ে হারালেন একটি পা। আর আহত হওয়ার পরেই সহযোদ্ধারা জেনেছিল উনি একজন নারী। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। করুণা বেগমের মত আরো অনেক নারী হালিমা, ফাতেমা রোকেয়াসহ অনেকে এরা যুদ্ধ করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন অত্যাচারিত হয়েছেন। শত্রু ক্যাম্পে আর যুদ্ধ শেষে পরিবার বা সমাজ তাদের গ্রহণ করেনি। কয়জন নারী মুক্তিযোদ্ধার কথা আমরা জানি- দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি কয়জনকে দিয়েছে জাতি? এতটা বছর হয়ে গেল! আর ‘বীর প্রতীক’ স্বীকৃতি পেলেন দু’জন নারী একজন ক্যাপ্টেন (অবসরপ্রাপ্ত) সিতারা বেগম এবং অন্যজন তারামনবিবি।
১৫ বছরের ‘গীতা কর’ পাকসেনাদের হাতে পিতার মৃত্যুর পরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে যুদ্ধক্যাম্পে ট্রেনিং নিতে গেলেন সেখানে আরো ২০০ জনের মতো মেয়েরা এসেছিল ট্রেনিং নিতে। এদের সবাইকে যুদ্ধের ট্রেনিং শেষে পরবর্তীতে আগরতলায় প্রতিষ্ঠিত ৪৮০ আসনবিশিষ্ট হাসপাতালে যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাদান কাজে নিয়োগ দেয়া হল। যেখানে এরা তাদের ক্ষমতা ও সেবায় নিরলস শ্রম দিয়ে যুদ্ধে আহত যোদ্ধাদের আবারো যুদ্ধে যাবার উপযোগী করার মহৎ কাজে নিজেদের উৎসর্গ করেছেন।
এ যুদ্ধের শুরুতে সীমিত আকারে প্রস্তুতি পালা নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্রী। যে বীর নারী রোশেনারা সূচনা পর্বে শত্রু পক্ষের একটি প্ল্যাটুন ট্যাংক ধ্বংস করার জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দেন সরকারিভাবে সংগৃহীত দলিলপত্রে সে বিবরণ এসেছে একেবারে সংক্ষিপ্তভাবে তাকে বীর বলা হলেও শহীদ বলা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে খ-িত দলিল হয়েছে সেখানেও নারী মুক্তিযোদ্ধার চিত্র অস্পষ্ট। তৎকালীন পত্রপত্রিকা থেকে জানা যায় ঢাকার একটি গেরিলা স্কোয়াডের প্রধান ছিলেন ফোরকান বেগম যিনি ভারতে পরে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। করুণা বেগমের মতো আরও একজন পুরুষের পোশাকধারী গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন শিরিন বানু মিলিত, স্টেটম্যান পত্রিকায় তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে। “পরবর্তীকালে এক সময় আমি মেজর জলিলকে বলেছিলাম কলকাতা থেকে আসার পরে আমার সাথে বিভা সরকার, যুঁথিকা মণিকা ব্যানার্জী, গীতা, ইরাসহ অনেক মেয়ে ছিল যাদের পরে খুঁজেছি কিন্তু পাইনি।’
সিরাজগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা মনিকা মতিনের ভাষায় “যুদ্ধের সময় নারীরা যেন জীবন্ত রাডারের ভূমিকা পালন করেন। আমি যদিও বন্দুক ভালভাবে চালাতে পারতাম না তবুও রাত্রিতে পাহারা দিবার জন্য দাঁড়াতাম।” বস্তুতপক্ষে সশস্ত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা প্রসঙ্গে সবচাইতে বেদনাদায়ক যে তাদের অনেকের নাম প্রকাশ হতে থাকে স্বাধীনতার প্রায় আটাশ বছর পর থেকে। কাঁকনবিবি ও বরিশালের শাহানা পারভীনকে ১৯৯৯ সালে যথাক্রমে জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৯৯ সালের ২৯ এপ্রিল গ্রামবাংলার দুই সাহসী মুক্তিযোদ্ধা মীরা ও হালিমা খাতুনকে পুরস্কৃত করে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এদের মধ্যে মীরার জীবিকা ছিল কাঠ কুড়িয়ে বিক্রি করা এবং হালিমা ছিলেন দিনমজুর। যাদের দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী দেশে এরকম সাধারণ পরিবারের আরো নারী মুক্তিযোদ্ধা আছেন যাদের কেউ কোন খোঁজ নেয় না এবং এভাবে তারা হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে এসব নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল গোবরা। ক্যাম্প, কোলকাতার পদ্মপুকুর ও পার্ক সার্কাসের মাঝামাঝি তিনজলায়। যাদের সিভিল ডিফেন্স, নার্সিং ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যেসব নারী পাকবাহিনী ও বাঙালি সহযোগী শক্তির হাতে মারা গেছেন সার্বিক বিবেচনায় তারা সকলেই শহীদ কেউ শক্রপক্ষের গুলিতে কেউ নির্যাতনে কেউ অপহৃত হয়ে নিখোঁজ বা কেউ বরণ করেছেন স্বেচ্ছামৃত্যু তারা সবাই শহীদ যদিও ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এদের কোন তালিকা প্রণীত হয়নি। শুধু বিচ্ছিন্নভাবে লিখিত হয়েছে কিছু কিছু মৃত্যুর ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনা ও তাদের বাঙালি সহযোগীদের দ্বারা ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ছিল আনুমানিক দুই লাখ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহীম এবং অধ্যাপক নওশেভা শরাফীর নেতৃত্বে একটি দল ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা ক্যান্টেনমেন্ট যেখানে পাক বন্দীদের সাথে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করছিলেন প্রায় শ’খানেক নির্যাতিত বাঙালি নারী। ওখান থেকে উদ্ধার করা গেল মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ জন নারীকে আর অন্যান্যদের মধ্যে একজনের বক্তব্য ছিল “অচেনা দেশে হয় পতিতালয়ে যাবো নতুবা রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করবো এর পরেও পরিচয় গোপন তো থাকবে আর আমাদের জন্য পিতা, সন্তান পুত্র সন্তানরা অসম্মানের হাত থেকে রেহাই পাবে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে সম্মানীত করে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সার্বিক সহযোগিতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গঠিত হল জাতীয় পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন এবং নারী পুনর্বাসন বোর্ড, নির্যাতিতা নারীদের আশ্রয় দেওয়া ছাড়াও শিক্ষা ও দক্ষতা অনুসারে নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল। এছাড়া অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ আর, দায়মুক্ত হতে চাচ্ছিলেন সে লক্ষ্যে জানুয়ারি ’৭২ থেকে অক্টোবর ’৭২ পর্যন্ত গর্ভপাত আইন বৈধ করা হল। একই সাথে এদের সন্তান সংগ্রহ, লালন-পালন এবং বিদেশে দত্তক দেয়ার উদ্দেশ্যে গঠন করা হল আন্তর্জাতিক শিশুকল্যাণ ইউনিয়ন, মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা এসময়ে এসব দুঃস্থ নারীদের সহায়তায় এগিয়ে এলেন-আর তাঁর সংগ্রহকৃত প্রায় ৩০০ জন দুঃস্থ শিশুকে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের অনেক পরিবার দত্তক নিলেও বাংলাদেশের কোন পরিবার এগিয়ে আসেনি। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এসব নারীদের বিয়ে করার জন্য তরুণদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানালেও সাড়া পাওয়া গেল খুবই কম।
আর আশির দশকে এক ধরনের লক্ষহীন মনোবল অবস্থায় সব কর্মসূচির বিলোপ ঘটে এবং শত শত দুস্থ ও নির্যাতিত নারী, যারা আশ্রয় ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছিলেন তারা আবারো আশ্রয়হীন হয়ে যায়। বস্তুত পক্ষে ‘বীরাঙ্গনা’ দের প্রতি কোন প্রকার মানবিক মূল্য পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ও ধর্মোম্মদনা জনিত মনোভাবের কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং এই উপাধির কারণে অনেকের পক্ষে সমাজের গ্রোত ধারায় মিশে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর অনেক ক্ষেত্রে হয়ে পড়ল বিতর্কিত বা আড়ালে অমীমাংসিত। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের পুনর্মিলিত করে কোন সংস্থা সংগঠনের প্রস্তাব নেয়া হয়নি। যদিও যুদ্ধের পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছিল একাধিক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কল্যাণ সমিতি ইত্যাদি, যেখানে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কোন তালিকা তখনো পর্যন্ত ছিলনা। এভাবে ইতিহাসে নারী বারে বারে উপেক্ষিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অঙ্গনে নারীর অবদান-বলা যায় সর্বক্ষেত্রে, এরপরেও অনেকের নাম রয়ে গেছে বিস্মৃতির অন্তরালে-যদিও ত্যাগের মহোৎসবে নারী সমাজে অনেকে নিজেদের নানাভাবে উৎসর্গ করেছেন, প্রাপ্তি ছিল শুধুই স্বাধীনতা, তবে দেশের সকল নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সত্যিকার অর্থে মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন-নতুবা দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যাবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।