Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

মতিঝিলে রাস্তায় হাট-বাজার

রাজধানীবাসীর বিড়ম্বনা-৮

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রাস্তা দখল করে গাড়ির অবৈধ পার্কিং, দোকানপাটে ফুটপাথ একাকার, হাঁটার পথ বেদখল, নির্বিকার ট্রাফিক পুলিশ, প্রতিদিন যানজটে নাকাল নগরবাসী


রাজধানীর ফুটপাতের পর এবার রাস্তাও বেদখল হচ্ছে। রাজধানীর অফিসপাড়া ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত মতিঝিল ও দিলকুশার ব্যস্ত এলাকায়ও প্রতিদিন বসছে হাট-বাজার। নগরীর দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, আরামবাগ, শাপলা চত্ত¡র এলাকার অধিকাংশ রাস্তায় দেখা যায় শত শত ভাসমান দোকানপাট, আছে গাড়ীর অবৈধ পার্কিংও। মাছ, তরিতরকারি, ফলমূল, নিত্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালামাল, শাবসব্জি, শীতের কম্বল, শার্ট প্যান্ট, গেঞ্জি ও জুতাসহ সব ধরনের পণ্যের দোকান সাজিয়ে রাস্তার ওপরেই বসছে দোকানিরা। আছে রেস্টুরেন্ট, গাড়ির গ্যারেজ, আর চা দোকান। এসব দোকানের পাশাপাশি গাড়ি পার্কিংও রয়েছে। ফলে শুধু ফুটপাত নয়, প্রধান সড়ক দিয়ে চলাচল করতেও বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এসব ভাসমান দোকানপাট আর অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মিলে ওই এলাকা প্রায় ৬ শতাধিক দোকান বসিয়েছে। বিনিময়ে প্রতি দোকান থেকে দৈনিক ৬০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়, ট্রাফিক পুলিশ ও মতিঝিল জোনের অপরাধ বিভাগের নামে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ট্রাফিকের পূর্ব জোনের ডিসি মাইনুল হাসান গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে রাস্তায় গাড়ির অবৈধ পার্কিং থাকলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, দোকানপাটের বিষয়টি দেখে ক্রাইম ডিভিশন। ট্রাফিকের নামে কেউ চাঁদা নিলে এবং সঠিক অভিযোগের তথ্য প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় এবং আলিকো ভবনের পেছনে প্রতিদিন রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাড়ি পার্কিং করে রাখার পরেও কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না জানতে চাইলে ট্রাফিকের ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এটি আমার নজরে আসেনি। এখন যেহেতু জানতে পারলাম অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মতিঝিল জোনের পুলিশের অপরাধ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাস্তার ওপরে দোকানপাট বা গাড়ি পার্কিং করে ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তা দখল করে রাখা কারণে নগরবাসীর যে দূর্ভোগ পোহাতে হয়। শুধু সাধারন মানুষ নয় পুলিশের লোকও যখন সাধারণ পোষাকে তাদের পরিবার পরিজন সাথে নিয়ে কিংবা জরুরী প্রয়োজনে রাস্তায় যান তখন ভোগান্তির শিকার হন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, রাস্তায় যানবাহন চলাচলে শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাস্তা যাতে কেউ অবৈধ পার্কিং করতে না পারে তা দেখার দায়িত্ব ট্রাফিক পুলিশের।
মতিঝিল, দিলকুশা, ফকিরাপুল ও আরামবাগের অধিকাংশ সড়ক এবং ফুটপাত দখল করে রাখা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে। ঘন্টার পর ঘন্টা এসব গাড়ি রাস্তা দখল করে অবৈধ পার্কিং করে রাখলেও ট্রাফিক পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করেনি। এসব অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও শাপলা চত্বর, দিলকুশা,বঙ্গভবন এবং দৈনিক বাংলা এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধভাবে কমপক্ষে ৬ শতাধিক দোকান বসানো হয়েছে। এছাড়া আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পূর্ব মাথা থেকে পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে রয়েছে তিন শতাধিক অবৈধ দোকানপাট। এর মধ্যে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের ফুটপাতেই রয়েছে হরেক রকমের শতাধিক দোকান। দরদাম করে কেনাকাটা করছেন ক্রেতারা। এতে পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রধান সড়ক ধরে চলাচল করছেন। এছাড়া সড়কের দুপাশে রয়েছে অবেধ গাড়ি পার্কিং। প্রাইভেট কার, পিকআপ, ভ্যান ও রিকশা পার্কিং করে রাখা হয়েছে। স্কুল ছুটির পর সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।
এই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও হকারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে দোকান বসিয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দৈনিক চাঁদা তোলে প্রভাবশালীরা। এরা সরকার দলীয় রাজনৈতৈক ছত্রছায়া থেকে প্রভাব কাটায়, এবং দোকান বসিয়ে টাকা তোলে।
গতকাল বুধবার এসব এলাকা ঘুরে ও স্থানীয় বাসিন্দা এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র দেখা যায়। বঙ্গভবন, কমিশনার গলি ও বাজার রোড, পানির ট্যাংক গলি, মগার গলি, ডালাস গলি, কিউট গলি, কোমর গলি, সরদার গলি, গরম পানি গলি, পেপসি গলি, ফকিরাপুল ১ নম্বর গলি, ঝিলপাড়, সাফায়াত উল্লাহ লেন, শুক্কুর পাগলা লেন, মধুমিতা গলি ও কালভার্ট রোড এলাকার ফুটপাতসহ রাস্তার অর্ধেক অংশ দখল করে বসানো হয়েছে দোকানপাট।
আরামবাগে একটি ভ্যান থেকে শাকসবজি কিনছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, দোকানপাটের জন্য রাস্তায় হাঁটা যায় না। ফুটপাততো আরো আগেই বেদখল হয়েছে। এখন রাস্তা জুড়ে বাজার বসিয়ে সরকার দলীয় কিছু স্থানীয় নেতা কর্মী নিয়মিত চাঁদা তুলছে। ট্রাফিক পুলিশ এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ ও আশপাশের সরকারি কলোনিগুলোর চারপাশের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ৪ শতাধিক দোকানপাট। একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযানের পরও সড়ক ও ফুটপাতের ওপর বহাল রয়েছে মতিঝিল এজিবি কলোনির সেই অবৈধ কাঁচাবাজার। এ ছাড়া প্রতিটি সড়কের প্রায় অর্ধেক দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। ফলে ওই এলাকায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিদিন।
দেখা যায়, টিঅ্যান্ডটি কলোনি, পোস্টাল কলোনি ও বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির চারপাশের ফুটপাতে রয়েছে আরও দেড় শতাধিক অবৈধ ভ্রাম্যমাণ দোকান। এর মধ্যে টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকা থেকে চাঁদা তোলেন আওয়ামী লীগ কর্মী বলে পরিচিত আনিস নামের এক লোক। তবে গতকাল তাঁকে এলাকায় পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানি বলেন, একেক দিন একেক সময় চাঁদা তোলেন আনিস। এর মধ্যে ফুটপাতের চায়ের দোকান ও রিকশার গ্যারেজ থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে তোলা হয়। কেউ টাকা না দিলে ফুটপাতে বসতে দেয়া হয় না।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর