Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

রেডি ফর টুমরো

আগামী প্রজন্মের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

তথ্য-প্রযুক্তি খাতের বিকাশের ফলে সামনে নতুন শিল্প বিপ্লবের সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে তরুণ প্রজন্মকে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে- রেডি ফর টুমরো।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) শুরু হওয়া আইসিটি সেক্টরের মেগা ইভেন্ট চারদিন ব্যাপী ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-২০১৭’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। এই প্রদর্শনীতে এবার চমক হিসেবে এসেছে মানবীর আদলে হংকংয়ে তৈরি সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাওয়া রোবট ‘সোফিয়া’। ‘রেডি ফর টুমরো’ শ্লোগান নিয়ে আয়োজিত এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে দেশী-বিদেশী প্রায় ৪শ’ আইসিটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের তরুণরা নিজেদের মেধা-যোগ্যতায় বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় শামিল হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আগামীর জন্য বাংলাদেশকে তৈরি করে যেতে চাই। একবার যেহেতু উন্নয়নের চাকা গতিশীল হয়েছে, সেটা আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। মানুষকে যে কথা দিয়েছি নির্বাচনী ইশতেহারে, তা আমরা রেখেছি।
প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের মেধাবী তরুণ প্রজন্মই আইসিটি সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে সামিল করার স্বপ্ন সার্থক করবে। তিনি বলেন, আমরা তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষায় দক্ষ করে গড়ে তুলছি। কাজেই সমগ্র বিশ্ব এখন তাদের হাতের মুঠোয় এবং আমি আশা করি এই তরুণরাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে জাতির জনকের উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে সার্থক করবে।
আইসিটি খাত ২০২১ সাল নাগাদ দেশের দেশের উন্নয়নের সবথেকে বড় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং আমরা আমাদের জিডিপিকে ৭ দশমিক ২৮ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানিও আমাদের বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, আইসিটি সেক্টরটাকে যদি আমরা আরও সুযোগ দেই তাহলে এখান থেকেই আমাদের রপ্তানী আরও ব্যাপক হারে আসবে। আমাদের আর অন্য কোনদিকে তাকাতে হবে না এবং আমাদের ছেলে-মেয়েরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট মেধাবী।
এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য এই বছর থেকে রপ্তানিতে ৫ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, চলতি অর্থবছরে সফ্টওয়্যার রপ্তানি থেকে আয় ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে এবং জিডিপিতে সফ্টওয়্যার ও আইসিটি সেবাখাতের অবদান ৫ শতাংশে উন্নীত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জেলায় হাইটেক বা সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। সেইসঙ্গে ১শ’ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তরা বিনিয়োগ করতে এলে এসব জায়গাতেও প্লট বরাদ্দ করা হবে।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ছেলে-মেয়ে আমাদের শ্রমবাজারে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি নিজেরাও যেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা হতে পারে সে ব্যাপারেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, দেশজুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ২৮টি হাইটেক ও সফ্টওয়্যার টেকনোলজী পার্ক। এর মধ্যে ঢাকার কারওয়ান বাজার ও যশোরে সফ্টওয়্যার পার্কের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি বেসরকারি সফ্টওয়্যার পার্কও গড়ে উঠেছে। এসব পার্কে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য ১০ বছরের আয়কর মওকুফ ও শতভাগ রিপেট্রিয়েশনসহ বিবিধ সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ছেলে-মেয়েকে ঘরে বসে ট্রেনিং দেয়া এবং বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা দেয়ার জন্য ইতোমধ্যে ১০টি ভাষায় অ্যাপ তৈরী এবং তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, লার্নিং এন্ড আর্নিং’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পোস্ট অফিস ডিজিটাল করে দেয়া হয়েছে। ইউনিয়নে ইউনিয়নে রয়েছে ডিজিটাল সেন্টার। গ্রামে নিজের ঘরে বসে ছেলে-মেয়েরা এখন বিদেশ থেকে টাকা উপার্জন করতে পারছে। আমরা আশা করছি, ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের ২০ লাখ তরুণ-তরুণী তথ্য প্রযুক্তির পেশার সঙ্গে যুক্ত হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আমাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন বানানো শুরু করেছি। এই খাতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে চলতি বছর থেকে আমরা ৯৪টি উপকরণের ওপর শুল্ক প্রতীকী ১ শতাংশ করে দিয়েছি। ফলে কেবল দেশীয় উদ্যোক্তারা নয়, বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতারাও এখানে কারখানা তৈরিতে আগ্রহী হবে। ইতোমধ্যে স্যামসংয়ের মত কোম্পানি ঢাকার অদূরে কারখানা স্থাপন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগকারীকে আমরা সর্বোতভাবে সহায়তা দেয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সংযোগ ও বেসরকারি খাতে ৬টি ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেবলের সুবিধা দিয়েছি। যার ফলে দেশব্যাপী ১০ গুণেরও বেশি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ রপ্তানিও হচ্ছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে ফোর জি (৪এ) প্রযুক্তি চালু কর করা হচ্ছে। এছাড়া ‘ইনোভেশন ডিজাইন এন্ড এন্টারপ্রেনারশীপ একাডেমী’ স্থাপন এবং গড়ে তোলা হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ’।
আমাদের তরুণদের সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে নজর কাড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের মত উন্নত দেশের ১০ হাজার এপার্টমেন্টকে স্মার্ট করার কাজটা তারা আমাদের তরুণদের হাতে তুলে দিয়েছে। তারা এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে ইনশাল্লাহ। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন, যে লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে চাই। অর্থাৎ বাংলাদেশ আর কারও কাছে হাত পেতে চলবে না, ভিক্ষা করে চলবে না, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মাথা উঁচু করে চলবে।
’৭৫ এর পর স্বৈরশাসনে দেশের পিছিয়ে পড়ার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরের মধ্যে ৩০টি বছর আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। আর কালক্ষেপণ যেন না হয় সেজন্য আমরা লক্ষ্য স্থির করেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভিশন-২০২১’। অর্থাৎ ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো। সে সময়ে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, সমৃদ্ধ দেশ। আর ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হিসেবে আমরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হব। ইনশাল্লাহ আমরা সেটা অর্জন করতে পারবো, সে বিশ্বাস আমার আছে।
ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের প্রতিপাদ্য ‘রেডি ফর টুমরো’র সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নট টুডে ফর টুমরো, আমরা বাংলাদেশকে তৈরী করতে চাই। তিনি বলেন, হয়তো আমরা দেখেও যেতে পারবো না কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস-একবার যখন উন্নয়নের চাকা গতিশীল হয়েছে এটা ভবিষতে আর কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না। এটা আমার বিশ্বাস।
মেলায় বক্তব্য পর্ব শেষে বর্ণাঢ্য লেজার শো অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মেলায় আগত হংকংয়ের হ্যানসেন রোবটিক্সের বানানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত সোশ্যাল রোবট ‘সোফিয়া’র সঙ্গেও কথপোকথনে অংশ নেন। পরে মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন তিনি।
আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং আইসিটি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ইমরান আহমেদ এবং বাংলাদেশ সফটওয়্যার ইনফর্মেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সভাপতি মোস্তফা জব্বার। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী স্বাগত বক্তব্য দেন। মন্ত্রী পরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনিতিক, মেলায় অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং কম্পিউটার খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর