Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

রাকেশ আস্তানাকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রহস্যময়তা

প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : রাজকোষ হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা চুরির পর ভারতীয় আইটি ব্যবসায়ী রাকেশ আস্তানার নিয়োগ নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, অর্থমন্ত্রী তার কাজের পরিধি কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তখন সেই রাকেশ আস্তানাকে নিয়ে স্বয়ং বাংলাদেশ ব্যাংক রহস্যজনক ভূমিকায় নেমেছে। কে এই রাকেশ আস্তানা? ভারতীয় এই নাগরিককে কার সুপারিশে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি সেক্টরে বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো? এ নিয়ে যখন গণমাধ্যমে তোলপাড় চলছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করে অন্য সুর তুলেছে। তাদের দাবি, রাকেশ আস্তানা শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি বিভাগের পরামর্শক। অথচ রাকেশ আস্তানার সরবরাহকৃত নতুন সফটওয়্যার ইনস্টলের আদেশ এবং একই সঙ্গে তাকেই পরামর্শক নিয়োগের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিক্ষুব্ধ হন বলে জানা গেছে। তারা রাকেশের সফটওয়্যারের কারণে নিরাপত্তার পরিবর্তে দেশের আর্থিক খাত নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন।
আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ পাওয়া রাকেশ আস্থানাকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একেক সময়ে একেক রকম বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। নতুন করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় আইটির বিষয়টি তদন্ত করছেন না রাকেশ আস্থানা। আইটি দলের সহযোগিতায় তাকে এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করেন ফজলে কবির। যোগদানপত্রে স্বাক্ষরের পরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন গভর্নরের পক্ষে নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভংকর সাহা এ কথা জানান।
রিজার্ভ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দলে রাকেশ আস্থানা থাকছেন কিনা বা তার ক্ষমতা কমানো হচ্ছে কিনা নতুন গভর্নরের কাছে জানতে চাইলে তার পক্ষে মুখপাত্র শুভংকর সাহা বলেন, রাকেশ আস্থানাকে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান একটি প্রকল্পের আওতায় আইটি গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি। তার সঙ্গে ব্যাংকের দুই বছরের চুক্তি আছে। আমাদের চলমান প্রকল্পের পরামর্শক হওয়ায় তার অনেক কাজের সঙ্গে এ ঘটনার পরামর্শক হিসেবে তাকে আমরা ব্যবহার করছি। কাজেই ওনার যে বিষয়টা, তা ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন। ওটা তদন্ত দল না। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি তদন্ত টিম তার সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের যে প্রকল্প আছে, তা অব্যাহত আছে।
অথচ রিজার্ভ চুরি যাওয়ার পর গত ৯ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক সাংবাদিকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল, সাইবার বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি গভর্ন্যান্স কনসালট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাংকের আইটি ডিরেক্টর হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা চুরির ঘটনার আইটি ও সাইবার বিষয়ের তদন্ত তিনিই করছেন। তার নেতৃত্বে একটি ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন টিম এ বিষয়ে কাজ করছে, যাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি দল সহযোগিতা করছে। একই সঙ্গে রিজার্ভের টাকা চুরির বিষয়ে সাংবাদিকদের দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ব্রিফিংয়েও উপস্থিত থেকে বিশ্বব্যাংকের সাবেক আইটি বিশেষজ্ঞ রাকেশ আস্থানা জানান, আমরা এখনো তদন্তের মধ্যে আছি। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত বলা যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতটুকু দেখেছি মনে হয়েছে এটা আনঅথোরাইজড ট্রানজেকশন। বাইরে থেকেই এ হ্যাকিং করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কারও যোগসাজশ আছে কিনা তা বলা যাচ্ছে না। এর আগে গত ৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, অর্থ ফেরত আনতে বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক ও তার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন টিম এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিমের সাথে কাজ করছে।
এদিকে রিজার্ভ থেকে টাকা চুরি হওয়ার পর রাকেশ আস্থানাকে নিয়োগ দিয়ে ‘নিরাপত্তার অজুহাতে’ সব পিসিতে নতুন সফটওয়্যার সংযোজন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কম্পিউটার ও ল্যাপটপে ইনস্টল করা হয় বিশেষ একটি সফটওয়্যার। সে সময়ে দায়িত্বে থাকা গভর্নর ড. আতিউর রহমান স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, রাকেশ আস্থানার মৌখিক পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সব বিভাগ, ইউনিট ও সার্ভারসমূহে তার সরবরাহকৃত সফটওয়্যার (সিকিউরিটি প্যাচ) ইনস্টল করা হোক।
তবে, রাকেশ আস্থানার পরামর্শে এবং তারই সরবরাহকৃত নতুন সফটওয়্যার ইনস্টলের আদেশে ওই সময়ই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা নিরাপত্তার পরিবর্তে দেশের আর্থিক খাতে নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বলেন, এখন ওনার (রাকেশ আস্থানা) মৌখিক পরামর্শে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সকল পিসিতে ও সার্ভারে সফটওয়্যার বসানো হচ্ছে। ভিনদেশী একজন নাগরিকের কাছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দেশের আর্থিক খাতের সকল নিরাপত্তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এটা দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে আইটি পরামর্শক হিসেবে রাকেশ আস্থানার নিয়োগের পর ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম নামের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সিনিয়র সায়েনটিস্ট তার এক লেখায় বলেছেন, রাকেশ আস্থানা বিশ্বব্যাংকে তার ৩০ বছরের চাকরিজীবনে কখনোই সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন না, বা সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করেননি। প্রশ্ন হলো, কে রাকেশ আস্থানাকে সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট হিসেবে পরিচয় করিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকে এবং কেই বা তাকে নিয়োগ দিয়েছিল?
ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম বলেন, রাকেশ আমেরিকার ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী, ভারতীয় খুব ছোট অনভিজ্ঞ সাইবার কনসালটেন্সি ফার্মের মালিক।
ভারতের ব্যাঙ্গালোর থেকে মাস্টার অব বিজন্সেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) করে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংকে চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি জানান, আস্থানা তার বায়োডাটাতে লিখেছেন তিনি হার্ভাড বিজনেস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এই তথ্য সত্য নয়। রাকেশ এক বছর বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন প্রোগ্রামের অধীনে হার্ভাড বিজনেস স্কুলে কাজ করেন (১৯৯৮-৯৯)। এটি তার কাজের যোগ্যতা, এটি কোনো শিক্ষাগত ডিগ্রি নয়।
ড. জাহিদ দেওয়ান শামীম বলেন, ৩০ বছর চাকরি করার পর বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে অবসর গ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাংকে ৩০ বছর চাকরিজীবনে কখনোই রাকেশ সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করেননি। বর্তমান তিনি একটি ছোট সাইবার কনসালটেন্সি ফার্মের মালিক।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সিনিয়র এই সায়েনটিস্ট বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ রিজার্ভ অর্থ হ্যাক বা চুরির ঘটনায় প্রথম রাকেশ আস্থানা ইনভেস্টিগেশনের দায়িত্ব দেন নিজ মালিকানাধীন কোম্পানিকে। পরে জানাজানির পর অন্য কোম্পানিকে ইনভেস্টিগেশনের জন্য নিয়োগ দেন। এ ক্ষেত্রে সহজেই ধারণা করা সম্ভব যে, রাকেশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী মহল এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থ হ্যাক বা চুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির এক মাসেরও বেশি সময় পরও খোদ অর্থমন্ত্রীকেও তারা ঘটনা অবহিত করেনি।



 

Show all comments
  • Achintya Das ২২ মার্চ, ২০১৬, ১০:২৭ এএম says : 0
    এই খবরের শেষ অংশে বলা হয়েছেঃ" সহজেই ধারণা করা সম্ভব যে, রাকেশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী মহল এবং একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থ হ্যাক বা চুরির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির এক মাসেরও বেশি সময় পরও খোদ অর্থমন্ত্রীকেও তারা ঘটনা অবহিত করেনি। "খবর যখন নৈর্ব্যক্তিক না হয়ে মতামত সহ প্রকাশিত হয়, সেটি মতামত পাতায় প্রকাশিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় সংবাদের মাধ্যমটির পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইনকিলাবের মত একটি প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার কাছে এটি প্রত্যাশিত নয়।
    Total Reply(1) Reply
    • Mizamur Rahman ১৮ জুলাই, ২০১৮, ১২:৩৫ পিএম says : 0
      অচিন্তবাবু হঠাত চিন্তায় পইড়া গেলেন কেম..?চোরের দলে আপনেও আছে মনে হইতাছে। নয়ত আপনি চোরের দালাল।।
  • Shah Faroque ২২ মার্চ, ২০১৬, ১০:৫৬ এএম says : 0
    Why Rakesh in our Bank there is no any Bangladeshi I T?
    Total Reply(0) Reply
  • Liton Haque ২২ মার্চ, ২০১৬, ১০:৫৭ এএম says : 0
    নাটের গুরু যে কে এবং কারা তা মনে হয় সবাই জানে।
    Total Reply(0) Reply
  • Khorshed Ali ২২ মার্চ, ২০১৬, ১০:৫৭ এএম says : 0
    কথা বলে, জেলে যেতে চাই না।
    Total Reply(0) Reply
  • Khokon Khan ২২ মার্চ, ২০১৬, ১০:৫৮ এএম says : 0
    কি বলব আর।এইসব অনিয়ম বন্ধ করার কি কেউ নেই
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ