Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

রাজনীতিতে ওয়ান-ইলেভেনের ছায়া

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

চলমান সীমিত গণতন্ত্রের রাজনীতিতে মাঝে মাঝে মৃদুমন্দ বাতাস বয়। তখন মনে হয়, রাজনীতি বোধ হয় বদ্ধ ঘর থেকে উন্মুক্ত বাতাসে আসছে। বুঝি অচলায়তন ভাঙছে! এ ধারনা ভুল হতে খুব বেশি সময় লাগে না। কিছুদিন না যেতেই তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। স্বাভাবিক নিয়মে রাজনীতি হতে হয় উন্মুক্ত এবং উদার। আমাদের দেশে স্বাধীন রাজনীতির ক্ষেত্রটি বিগত এক দশক ধরে অনেকটা অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এর সূত্রপাত হয় ওয়ান-ইলেভেনের সময়। আর্মি ব্যাকড তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলোর উন্মুক্ত রাজনীতি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। কেবল অনুমতি সাপেক্ষে সীমিতভাবে ঘরের মধ্যে সভা-সেমিনারের অনুমতি দেয়া হয়। এর বাইরে রাজনৈতিক দলগুলো কোথাও সভা-সমাবেশ করতে পারত না। ওয়ান-ইলেভেনের দুই বছরের শাসনকালটি ছিল খুবই শ্বাসরুদ্ধকর। শুরুতে সাধারণ মানুষ এ সরকারকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বাগত জানালেও পরবর্তীতে অপশাসনের কারণে তাদের মোহ ভঙ হয়। এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য জনগণের করারও কিছু ছিল না। তারা তো আর স্বপ্রণোদিত হয়ে রাস্তায় নামতে পারে না। সমস্যা ও সংকট যৌক্তিকভাবে তুলে ধরে তাদের বুঝিয়ে সংগঠিত করতে হয়। সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশ করে জনমত তৈরির কোনো ধরনের সুযোগই দেয়া হয়নি। ফলে জনগণও সংগঠিত হয়ে তাদের পক্ষে দাঁড়াবার সুযোগ পায়নি। এমন এক অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে ওয়ান-ইলেভেন সরকার দেশকে ‘বিরাজনীতিকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রধান দুই দলের নেত্রীকে গৃহবন্দী করা হয়। অন্য রাজনীতিবিদরা দুর্নীতির অপবাদ নিয়ে পেরেশানির মধ্যে পড়ে। যতই দিন যেতে থাকে, জনগণও বুঝতে পারে, নির্বাচিত সরকারের কোনো বিকল্প হয় না। অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে মন্দ রাজনৈতিক সরকারও অনেক ভাল। কারণ এলাকায় অন্তত তাদের জনপ্রতিনিধি থাকে। তাদের কানে কোনো না কোনোভাবে সমস্যার কথা পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারে যারা ছিলেন, তারা রাজনীতিবিদ নন এবং তাদের কোনো জনপ্রতিনিধিত্ব ছিল না। তারা কখনো জনসাধারণের সাথে মিশেননি এবং মুখোমুখিও হননি। ফলে জনসাধারণ কী চায়, তা তাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল না। তারা মনে করেছিলেন, দেশের উন্নয়ন করতে রাজনীতির প্রয়োজন নেই। কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রশাসন দিয়ে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব। এ ধারনা থেকেই ওয়ান-ইলেভেন সরকার রাজনীতিকে প্রায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। এর প্রক্রিয়া হিসেবে রাজনৈতিক দল বিশেষ করে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে এন্তার দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা দেয়া হয়। দল দুইটির সুবিধাভোগী কিছু নেতাকে দিয়ে দল ভেঙ্গে নতুন দল করার প্ররোচনা ও সহায়তা দেয় হয়। এর উদ্দেশ ছিল, এতে দেশে গণতন্ত্র আছে এটা যেমন বোঝানো যাবে, তেমনি তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনকাজও চালিয়ে নেয়া যাবে। রাজনৈতিক দলের যেসব নেতা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, তারা পরিচিতি পান সংস্কারপন্থী হিসেবে। তারা ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পুতুলে পরিণত হয়ে নাচতে শুরু করেন। দুই নেত্রীকে মাইনাস করার ফর্মূলার সাথে যোগ দেয়। এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাঝে দেশের সার্বিক অর্থনীতি এবং জনসাধারণের অবস্থা করুণ হতে থাকে। জনসাধারণের নাড়ির স্পন্দন অনুধাবন করতে না পারায়, এক পর্যায়ে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যখন বুঝতে পারে দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন বাধ্য হয়ে দুই নেত্রীর সাথে পর্দার আড়ালে আপস-রফা করার প্রক্রিয়া শুরু করে। বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দেয়ার কথাও শোনা যায়। আপস-রফা কী হয়েছিল তা পুরোপুরি জানা না গেলেও, এক পর্যায়ে সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। তবে জনসাধারণ বুঝতে পারে, ওয়ান-ইলাভেনের কুশীলবদের ‘সেফটি এক্সিট’ বা নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর নির্বাচনটি দেয়া হয়। একটি দল প্রকাশ্যেই ঘোষণা দেয় তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে না। পরবর্তীতে ওয়ান-ইলেভেনের মূল কুশীলব মঈন উদ্দিন ও ফখরুদ্দিনসহ অন্যরা যখন বিদেশ চলে যান, তখন বোঝা যায়, তাদের নিরাপদেই যেতে দেয়া হয়েছিল।
দুই.
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমি ধ্বস বিজয় লাভ করে। বিএনপি একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এমনকি সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা নিয়েও শঙ্কা দেখা দেয়। কোনো রকমে বিরোধী দলের আসনে বসে। এ অবস্থার মধ্য দিয়েই দেশ রাজনীতির পথে চলতে শুরু করে এবং জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ওই বিশাল বিজয়। ক্ষমতাসীন দল এই বিজয়কে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করে যে বিরোধী দলের পক্ষে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তার উপরও ওয়ান-ইলেভেন সরকারের ছায়া পড়েছে। এবার শুধু একটি দলকে কোনঠাসা করার প্রক্রিয়া চলে। এভাবে চলতে চলতেই আরেকটি নির্বাচন এসে পড়ে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র জোট সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। বিরোধী দল বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিএনপি ও অন্যান্য দল থেকে প্রতিনিধি নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব দেয়া হয়। তাতে বিএনপি রাজী হয়নি। তার দাবী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন করতে হবে। এ নিয়ে চরম সংকট ও অচলাবস্থা দেখা দিলে দুই দলের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা তৎপর হয়ে উঠে। জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে তার সহকারি তারানকো ফার্নান্দেজকে মধ্যস্থতা করতে পাঠানো হয়। দুই দলের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেও ’৯৬ সালে কমনওয়েলথ মহাসচিব স্যার নিনিয়ানের সমঝোতা প্রয়াসের মতোই তার প্রয়াস ব্যর্থ হয়। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পরস্পর মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। আওয়ামী লীগ নিজেদের অধীনেই নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। বিএনপিও তাতে যাবে না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও নির্বাচনে যাবেন না বলে গোঁ ধরেন। এমনকি পিস্তল হাতে নিয়ে ঘরে বসে থাকেন। কেউ তাকে জোর করে নির্বাচনে নিতে এলে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করবেন বলে হুশিয়ারি দেন। এ অবস্থার মধ্যে হঠাৎ করেই ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এসে সবকিছু উলট-পালট করে দেন। ভোজভাজির মতো সব পাল্টে যায়। এরশাদ অসুস্থ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানেই মনোনয়নপত্রে সই করেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় প্রত্যাহার করতে চাইলেও তা পারেননি। মনোনয়নপত্রে নিজে সই করেননি বলে ঘোষণা দিলেও কেউ তা আমলে নেয়া হয়না। এ প্রেক্ষিতে, বিএনপি ও তার জোট নির্বাচন বর্জন এবং প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে তুমুল আন্দোলন শুরু করে। সরকারও থেমে থাকেনি। সে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে এগিয়ে যায়। নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগেই দেখা গেল প্রথমে ১৫৪ জন পরবর্তীতে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়ে যায়। নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্র খাঁ খাঁ করার মধ্য দিয়ে নির্বাচন শেষ হয়। আওয়ামী লীগ ও তার জোট একচেটিয়া জয়লাভ করে। সে সময় তাদের পক্ষ থেকে এমনও বলা হয়েছিল, এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। অচিরেই আরেকটি অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেয়া হবে। তা কী আর হয়! নদী পার হয়ে গেলে মাঝির যে কোনো মূল্য থাকে না-এটা প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করতে থাকে। বিএনপি ও তার জোট নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে এক পর্যায়ে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়। আর যায় কোথায়! ক্ষমতাসীন জোট সরকার বিএনপি ও তার জোটের উপর এমনভাবে চড়াও হয় যে তাদের নাভিশ্বাস উঠে। জ্বালাও-পোড়াও এবং প্রাণহানির অপবাদ দিয়ে এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে যে বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনেকে গুম-খুনের শিকার হওয়া থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘর ছাড়া হয়ে যায়। অনেকে মামলা-মোকদ্দমার বেড়াজালে আটকে ত্রাহি অবস্থার মধ্যে পড়ে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা সচল হয়। দুর্নীতির মামলার কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়। এখন তা শেষ পর্যায়ে। খুব তাড়াতাড়িই রায় হতে পারে। বিএনপির আশঙ্কা, খালেদা জিয়াকে সরকার শাস্তি দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করবে। সরকারি দলের অনেক নেতাও বলেছেন, খালেদা জিয়ার সাজা হবে। কেউ কেউ বলেছেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে হবে। এ যেন মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দিনের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের শাসনামলের পুনরাবৃত্তি। পার্থক্য শুধু মাইনাস টু ফর্মুলার পরিবর্তে মাইনাস ওয়ান ফর্মুলার প্রক্রিয়া শুরু করা। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় সকল রাজনৈতিক দলের উন্মুক্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে ঘরবন্দী হলেও, এখন শুধু বিএনপি ও তার জোটের রাজনীতি ঘরবন্দী এবং মাঝে মাঝে অসংখ্য শর্ত সাপেক্ষে উন্মুক্ত সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয়। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল ও তার মিত্রদের সব ধরনের রাজনীতি উন্মুক্ত ও অবারিত করে দিয়ে গণতন্ত্রের চর্চা দেখানো। সেই ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সংস্কারপন্থীদের নিয়ে গঠিত দলগুলোর মতো। তারপরও ভাল যে, দেশে সীমিত আকারে রাজনীতির কিঞ্চিত সুযোগ রয়েছে এবং একটি রাজনৈতিক দল ও জোট ক্ষমতায় রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের মতো একেবারে বধির নয়। জনসাধারণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলেও, তাদের কথা কিছুটা হলেও শুনতে পায় এবং নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দেয়।
তিন.
বাংলাদেশের মানুষ খুব অল্পতেই তুষ্ট এবং আনন্দে আত্মহারা হয়। সামান্য আলোক রশ্মি দেখে অতি আশাবাদী হয়ে উঠে। এই যেমন গত অক্টোবরে কোনঠাসা করে রাখা বিএনপিকে সরকার একটি জনসভা করতে দেয়ায় আমাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আনন্দের সীমা ছিল না। রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার দূরত্ব কমছে, সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, ইত্যকার নানা কথা বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। মাস খানেক না যেতেই তারাই আবার হতাশ হয়ে পড়েছেন। রাজনীতির আকাশে কালো মেঘ দেখছেন। অবশ্য যারা অতি আবেগে না ভুগে রাজনীতির বাস্তবতা সম্পর্কে সম্যক ধারনা রাখেন, তারা তখন বলেছিলেন, নানা সমস্যায় সরকার একটু বেকায়দায় রয়েছে। এ থেকে কিছুটা উপশম পাওয়ার জন্য বিএনপিকে রোড মার্চ, জনসভা করার মতো সুযোগ দিয়েছে। তবে সমস্যা কাটিয়ে উঠলেই আবার কঠোর হয়ে উঠবে। কেউ কেউ বললেন, সরকার বিএনপিকে নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমে কোনঠাসা করে কতটা সংকুচিত করতে পেরেছে, তা জানার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে এসব কর্মসূচি পালন করতে দিয়েছে। তাদের এ বিশ্লেষন অমূলক ছিল না। বিএনপির রোড মার্চ এবং জনসভায় ব্যাপক মানুষের অংশগ্রহণ দেখে সরকার টের পেয়ে যায়, বিএনপিকে কোনোভাবেই দমানো যায়নি। বরং বিএনপির কর্মসূচি অবারিত করে দিলে জনতার ঢল নামবে। এতে সরকারের জনপ্রিয়তার বিষয়টিও প্রকাশিত হবে। অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, সরকার বিএনপিকে মাঝে মাঝে লুজ দেবে আবার টাইটও দেবে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যাবে। অতি আশাবাদীরা সরকারের এ কৌশল বুঝতে না পেরে বলা শুরু করে, রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। দুই দলের দূরত্ব কমছে। দল দুটির মধ্যে সমঝোতার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। তাদের এ ধারনা যে পুরোপুরি ভুল, তা ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপির সাথে কোনো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ নাকচ করে দেন, তখন তাদের ভুল ভাঙে। এরপর থেকে আবারও বিশিষ্টজনদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, দুই দলই নিজ নিজ অবস্থানে অটল হয়ে রয়েছে। তাদের মুখোমুখি অবস্থান যেন আমাদের রাজনীতির একটা চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হচ্ছে, এভাবেই চলবে। কেউ বলছেন, রাজনীতি ফের আগের অবস্থানে চলে এসেছে। এ থেকে উত্তরণে কোনো লক্ষণ দেখছি না। এক দলকে ক্ষমতায় যেতে হবে, আরেক দলকে যেকোনো মূল্যে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে হবে। দুই দলের মুখোমুখি অবস্থানে রাজনীতি আবার সংঘাতময় হয়ে উঠবে। বলা বাহুল্য, তাদের এ হতাশার জন্ম নিয়েছে সমঝোতা ও আলাপ-আলোচনার প্রশ্নে সরকারি দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতিবাচক বক্তব্য। একটা বিষয় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ। এ লক্ষ্যে দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে টার্গেট করা হয়েছে। তাকেসহ তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বদনাম করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তারপর হয়তো অন্য কোনো বিষয় নিয়ে প্রচার চালানো হবে। সেই ওয়ান-ইলেভেন সরকারের মতো। এ সরকারের প্রথম লক্ষ্যই ছিল, প্রধান দুই দলের দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে জনগণের সামনে দুর্নীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করা। এজন্য সে সময় তাদের দলের কাউকে কাউকে বাধ্য করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে। এর মাধ্যমে মামলাও করা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হলে দেখা গেল একজনের মামলা নির্বাহী আদেশে প্রত্যাহার হয়েছে, আরেকজনেরটি থেকে গেছে এবং তার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। রাজনীতিতে ‘ভাগ্য’ বলে একটি কথা আছে। ভাগ্য সহায় হলে চুনোপুটিও ‘কেউকেটা’ হয়ে উঠে। এমন অসংখ্য নজির আমাদের রাজনীতিতে রয়েছে। তবে যারা রাজনীতির নেতৃত্ব পর্যায়ে থাকে তাদেরও কখনো কখনো ভাগ্য বিপর্যয়ে পড়তে হয়। সম্প্রতি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া বলেছেন, শেখ হাসিনা ভাগ্যবান। তার এ কথার অর্থ হচ্ছে, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তিনি এখন ভাগ্যবিড়ম্বিত। অবশ্য তিনি ভাগ্যবিড়ম্বিত না দুর্ভাগ্যারোপিত তা সময়ই নির্ধারণ করে দেবে।
চার.
আগামী জাতীয় নির্বাচন কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা রয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের কাছে এটি সহজ ও সরল সমীকরণের মতো যে, সংবিধান অনুযায়ী তাদের অধীনেই নির্বাচন হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটা এত সহজ নয়। কারণ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে হলে, বিএনপির মতো একটি বড় দলের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দলটিকে এড়িয়ে বা উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। এমন হতো দলটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব কোনো দল, যার গণভিত্তি নেই, তাহলে এ নিয়ে মাথা ঘামানোরা প্রয়োজন ছিল না। যেমনটি মাথা ঘামানো হয় না, এই দুই দলের বাইরে থাকা আরও অনেক দল নিয়ে। নির্বাচনে সেসব দলের অংশগ্রহণ করা না করা কোনো ম্যাটার করে না। যেহেতু দলটি বিএনপি এবং একাধিকবার দেশ পরিচালনা করেছে ও তৃণমূলভিত্তি রয়েছে, সেহেতু ক্ষমতাসীন দল যতই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করুক না কেন, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে তাকে লাগবেই। আর যদি মনে করে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতোই একতরফা নির্বাচন করবে, তবে তার পুনরাবৃত্তি যে সুখকর হবে না, তা এখন সবাই জানে। এ কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা দুই দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার উপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তারা ভাল করেই জানেন, তা নাহলে সংঘাত অনিবার্য। বিএনপি যদি আন্দোলনের ডাক দেয় এবং তার তেজ যতটুকুই হোক না কেন, তার ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব যে দেশের উপর পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। এ ধরনের আশঙ্কা যদি না-ই থাকত, তবে দুই দলের সমঝোতার কথা কেউই বলত না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও প্রয়োজন পড়তো না এ কথা বলার যে, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হবে। এই যে দেশের ভেতর এবং বাইরে সংলাপ-সমঝোতার আহ্বান, এ আহ্বান উপেক্ষা করে কি ক্ষমতাসীন দল থাকতে পারবে?
darpan.journalist@gmail.com



 

Show all comments
  • আরমান ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১:৪৬ এএম says : 0
    আশা করি সরকার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারবে
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন