Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চট্টগ্রামে উদ্ধার হচ্ছে না হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

চট্টগ্রামে খুন ও আধিপত্য বিস্তারে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও এসব অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে না। এতে করে অস্ত্রধারীদের দাপট বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। মাঝে মধ্যে র‌্যাব পুলিশের অভিযানে পরিত্যক্ত কিংবা পরিবহনকালে কিছু অস্ত্র ধরা পড়ছে। তবে ভয়ঙ্কর খুনী ও অস্ত্রধারীদের গোপন ভান্ডারে র‌্যাব পুলিশের হাত পড়ছে না। খুনের ঘটনায় জড়িতরা ধরা পড়লেও উদ্ধার হচ্ছে না খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র। ফলে হত্যা মামলার সঠিক তদন্ত হচ্ছে না। আবার খুনিরাও পার পেয়ে যাচ্ছে। সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ছাড়া স¤প্রতি সংগঠিত বেশিরভাগ খুনের ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি।
গত ৩ ডিসেম্বর নগরীর কদমতলী শুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খুন হন পরিবহন ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ চৌধুরী। কয়েকজন অস্ত্রধারী তার প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সরকার দলীয় তিন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের আয়োজনে আনন্দ শোভাযাত্রার পেছন থেকে একদল অস্ত্রধারী গলিতে ঢুকে হারুনকে গুলি করে। পুলিশের সামনেই তারা তাকে খুন করে ফের ওই শোভাযাত্রায় মিশে যায়।
নিহত হারুনের বোন রাহেলা বানু অভিযোগ করেন, তিনি পুলিশকে বার বার অনুরোধ করলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। অথচ পুলিশ দৌড়েও বন্দুকধারীদের ধরে ফেলতে পারত। যদিও পুলিশ এমন অভিযোগ অস্বীকার করছে। এদিকে গতকাল পর্যন্ত ওই খুনের ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। উদ্ধার হয়নি হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র। এই ঘটনায় সদরঘাট থানায় দায়েরকৃত মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। হারুনের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন তারা সবাই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং অস্ত্রধারী। অথচ খুনের ১১দিন পরও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, খুনিরা সরকারি দলের ক্যাডার হওয়ায় পুলিশ তাদের ধরতে পারছে না। অস্ত্রধারী খুনিরা ধরা না পড়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। সদরঘাট থানার ওসি তদন্ত রুহুল আমীন জানান, খুনীদের গ্রেফতার এবং হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। এ ঘটনায় এখনও কেউ ধরা না পড়লেও তিনি আশাবাদী শিগগির খুনীরা ধরা পড়বে।
নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালা পাড়ায় গত ৬ অক্টোবর খুন হন নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস রুবেল। তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসময় খুনিরা আকাশে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। একজন আসামী আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, সুদীপ্তকে পিটিয়ে হত্যার সময় স্থানীয়রা এগিয়ে আসতে চাইলে তারা আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি করেছে। আবার খুনের পর লালখান বাজারে ফেরা পথে সিটি কলেজ এলাকায়ও আরেক দফা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করা হয়। তদন্তে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে ওই খুনের ঘটনায় অংশ নিয়েছে ৩০ জন। তাদের অনেকের হাতে ও কোমরে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র। এই ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও কোন অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
সিআরবিতে রেলের টেন্ডারবাজির ঘটনায় আলোচিত জোড়া খুনে ব্যবহৃত হয়েছে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র। বিগত ২০১৩ সালের ২৪ জুন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই গ্রæপের এই বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় হেফজখানার ছাত্র শিশু আরমান হোসেন ও যুবলীগ কর্মী সাজু পালিত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, যুবলীগের হেলাল আকবর বাবর ও সাইফুল আলম লিমনের ক্যাডারদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে অনেক ভারী অস্ত্র দেখা গেছে। শিশু আরমান তখন ওই এলাকায় খেলছিল। প্রতিপক্ষের একটি বুলেট আসতেই এক ক্যাডার তাকে দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। ওই ক্যাডার রক্ষা পেলেও গুলিতে প্রাণ হারায় এই শিশু। অন্যদিকে সাজু পালিতকেও মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। আলোচিত এই মামলার অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম বলছেন এই ঘটনায় কোন অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এই মামলায় খুনের পর গ্রেফতার হওয়া ৬২ আসামির সবাই এখন জামিনে।
গত ১২ জুলাই চট্টগ্রাম কলেজে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষ প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দেয়। ওই ছবি মিডিয়ায় প্রকাশিত হলেও অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় যুবলীগ নেতা মেহেদীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি। জানাযায়, এসব অস্ত্রধারীরা সরকারি দলের হওয়ায় পুলিশ তাদের ধরতে সাহস পায়না। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি কফিল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার না হলে একদিকে মামলার সঠিক তদন্ত হবে না অন্যদিকে খুনিরাও তাতে সুবিধা পাবে। এতে করে অপরাধীদের যথাযথ সাজা নিশ্চিত করা যাবে না। ফলে অপরাধও কমবে না।
এদিকে র‌্যাব ও পুলিশের নিয়মিত অভিযানে অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার হচ্ছে। তবে অস্ত্র উদ্ধারে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ কোন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে না। র‌্যাব জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম দিন থেকে গতকাল পযন্ত র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অভিযানে ২৮৯টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এই সময়ে ৪৫টি ম্যাগাজিন, ৩ হাজার ৪৪৮ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ উদ্ধার হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ