Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৫ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার অনিশ্চয়তা

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ২০ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা আপাতত নেই বলেই ধরে নেয়া যায়। এখনই একটি আগাম নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি রয়েছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছিল তাকে একটি আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা হিসেবে মনে করেছিল কেউ কেউ। যদিও নির্বাচন কমিশনের এই বক্তব্যের সাথে বেশীরভাগ সচেতন নাগরিক একমত হবেননা বলেই আমাদের মনে হয়েছে। কারণ নির্বাচনের ভোটারলিস্ট হালনাগাদকরণ, একটি তফসিল ঘোষনা এবং কিছু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কোন রাজনৈতিক দল বা জোটের ক্ষমতার মেয়াদবৃদ্ধি বা ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করার নাম গণতন্ত্র নয়। একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিকদলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যেমন সরকার এবং রাজনৈতিকদলগুলোর, সেই সাথে নির্বাচন কমিশনেরও। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব রকম আয়োজন বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি নির্বাচনে সব রাজনৈতিকদল অংশগ্রহন নিশ্চিত হয়েছে কিনা, সব রাজনৈতিক দলের সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে কিনা, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ ভ‚মিকা পালন করছে কিনা ইত্যাকার ইস্যুগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য বিষয়। বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যন্ধস্থার উপর একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। দেশের বেশীরভাগ মানুষ, বেশীরভাগ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহন ছাড়া এবং বেশীরভাগ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কারণে শুরু থেকেই দশম জাতীয় সংসদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এ ধরনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কোন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিকদল ক্ষমতায় থাকলে তা তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হওয়া স্বাভাবিক। সম্ভবত: এ কারণেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আওয়ামীলীগ নেতারা একে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন এবং স্বল্পতম সময়ে আলোচনার মাধ্যমে আরেকটি নির্বাচন দেয়ার কথা বলেছিলেন। তবে সেই দশম জাতীয়র সংসদের মেয়াদ শেষের দিকে চলে এলেও সরকারের পক্ষ থেকে আজো কথিত সেই আলোচনা বা সংলাপের কোন আহ্বান শোনা যায়নি। এমনকি অনেক বিতর্কের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে যে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করেছিল, সে সংলাপে দেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রতিনিধিসহ সমাজের প্রায় সব অংশেরই অংশগ্রহণ ছিল। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে,একটি অবাধ নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিকদল এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে যে সব সুপারিশ ও দাবী দাওয়া পেশ করা হয়েছিল সে সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও তা’ এখনো হয়নি। যদিও নির্বাচন কমিশনের করণীয় বিষয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যুনতম রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় সংলাপের আয়োজন করতে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও ক‚টনৈতিক উদ্যোগগুলো কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে একটি মধ্যবর্তি নির্বাচন অথবা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন সম্পর্কে প্রকাশিত মন্তব্য থেকে এটা অনুমান করা যাচ্ছিল যে, মধ্যবর্তি বা আগাম নির্বাচন না হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেথে দেশে একটি রাজনৈতিক সংলাপ ও সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
সরকার তার পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকলে ২০১৮ সালের শেষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে যে ধরনের নির্বাচন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ প্রশ্নবিদ্ধ, সরকারের প্রতি জনগনের আস্থার সংকট এবং আন্তর্জাতিক মহলে ভাব-মর্যাদার সংকট তৈরী হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে কোন রাজনৈতিক তৎপরতা নেই। বিশেষত ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের অবস্থান যেন ২০১৪ সালের চেয়েও পশ্চাৎগামি। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারী দলের শীর্ষ নেতারা এখনো বিএনপি’র সাথে একটি রাজনৈতিক সংলাপ বা সমঝোতায় অনাগ্রহ প্রকাশ করে চলেছেন। সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এতদিন খালেদা জিয়াকে শুধু নির্বাচন থেকেই নয় রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় করে দেয়ার কথা বলে এসেছেন। ইদানিং তিনি বিএনপিকেই রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় করে দেয়ার কথা বলছেন। যেখানে দেশের মানুষ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রত্যাশা করছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কালিমা থেকে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রকে মুক্ত করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহনমূলক জাতীয় নির্বাচনের রূপরেখা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে, তখনো ক্ষমতাসীনদের কণ্ঠে ধ্বনিত বিভক্তি ও প্রতিহিংসার সুর জাতিকে হতাশ করছে। ওমুককে নির্বাচন করতে দেয়া হবে না, ওমুক দলকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হবেনা ইত্যাদি বক্তব্য গণতন্ত্রের ভাষা নয়। বিশেষত: একটি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতা পাওয়া যাচ্ছেনা। এ ধরনের বাস্তবতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উন্নয়ন সহযোগিরা আগামী বছরটিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আগে ভাগেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র অবস্থান লক্ষ্য করে ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আরেকটি সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগি ইউরোপীয় ইউনিয়নও আগামী বছরটিতে বাংলাদেশে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশ ককাস বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করতে গিয়ে ২০১৮ সালকে বাংলাদেশে ২০১৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করেছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ না থাকায় তারা এই আশঙ্কা করছে। গত ১৪ অক্টোবর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশ ককাসের সভায় উপস্থাপিত রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করা হলে বিএনপি আগের চেয়েও বেশী বেপরোয়া হয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী সহিংসতার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছিল। বিএনপিকে সহিংসতা পথ পরিহার করার সুপারিশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। সেই সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগকে সমঝোতা ও সংলাপের পথ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ককাস কমিটি। সহিংসতা এড়ানোর একটাই পথ, আর তা হচ্ছে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌছানো। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই রিপোর্ট, আশঙ্কা এবং সমঝোতার আহ্বান দুইমাস আগের। এরপর গত দুই মাসে পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়িয়েছে, পদ্মার উপর নির্মিয়মান সেতুর পিলার ক্রমে দৃশ্যমান হলেও দেশে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রত্যাশার বাস্তবতা ক্রমে অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। দেশের রাজনীতিকে আবারো সহিংস ও অস্থিতিশীল করে তোলতে যে ধরনের বাক্যাস্ত্র ব্যবহার করা প্রয়োজন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারী দলের পক্ষ থেকে তা ব্যবহার করা হচ্ছে। আবারো সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার ধনুর্ভঙ্গ পণ। এবার কেউ কেউ বিএনপি নেতা খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রাখার প্রচেষ্টাকেই যথেষ্ট মনে করছেনা, তারা বিএনপিকেই নির্বাচন ও রাজনীতির বাইরে ঠেলে দিতে চায়।
প্যারিসের গেøাবাল সামিটে যোগ দিতে গিয়ে সেখানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে জনগনের ভোটে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের নিশ্চিত দৃঢ়তা প্রকাশ করেছেন। এর আগে কম্বোডিয়া সফর শেষে দেশে ফেরার পর গত ৭ ডিসেম্বর তিনি গণভবনে যে সংবাদ সম্মেলন করেন সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্বশীল ভ‚মিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ জোরালো ও রসালো সমালোচনা উঠলেও সে সম্মেলনেও আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান অনেকটা পরিস্কার হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি’র সাথে সাংলাপ বা কোন ধরণের রাজনৈতিক সমঝোতার হাত বাড়াতে আগ্রহী নন। তিনি নিজের পরিবর্তিত সংবিধান অনুসারে নির্বাচনের আয়োজন করবেন এবং যে কোন বিরোধিতা পুলিশ দিয়ে কঠোর হাতে দমন করবেন। এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ৪ বছরে বিএনপি জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের শত শত নেতাকর্মীকে গুম করা হয়েছে। গুম-খুন, হামলা মামলায় জজর্রিত বিএনপি ও তার জোট হয়তো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ার নির্বাচনের আগের মত শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবেনা। আর সরকারও শেষ সময়ে কিছুটা নমনীয় হয়ে, বিএনপির জোটের শরিক ও নতুন গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোটকে প্রলুৃব্ধ করে আগের চেয়ে বেশী সংখ্যক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহন করানোর মাধ্যমে নির্বাচনটিকে বাহ্যত: দশম সংসদ নির্বাচনের চেয়ে বেশী সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য হতে পারে বলে কোন কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা। সরকারী দলের কেউ কেউ আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনুরুপ ফলাফলের একটি নির্বাচন হিসেবে দেখতে চাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক স্মরণ করিয়ে দেন, বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এবং আওয়ামীলীগের কাউন্সিলের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি ৫ জানুয়ারীর মত নির্বাচন আর দেখতে চাননা, আগামীতে সব দলের অংশগ্রহনে একটি ভাল নির্বাচন চান, সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল তিনি বিএনপির সাথে আলোচনায় বসবেন কিনা। প্রতিত্তোরে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হতাশাজনক। তিনি একটি জাতীয় রাজনৈতিক সংকট নিরসনে জনপ্রত্যাশার প্রতিকুলে অবস্থান নিয়ে পুরনো কাসুন্দি ঘেটেছেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামীলীগের মত এক একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার ঘটনা, জেলহত্যা বা একুশ আগস্ট গ্রেনেড বিস্ফোরণের মত ঘটনা বিস্মৃত হওয়ার মত নয়। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দায়ও রাষ্ট্র ও রাষ্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর। প্রতিটি রাষ্ট্রে সব বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হওয়াই ঐতিহাসিক বাস্তবতা। কোন ঘটনার জন্য কারা দোষি, কারা দায়ী, এসব বিচারের ভার একদিকে আদালতের অন্যদিকে দেশের জনগনের। আদালত সাক্ষ্যপ্রমানের ভিত্তিতে দোষি ব্যক্তিদের বিচারের সম্মুখীন করবে আর জনগন ইতিহাসের খলনায়কদের ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করবে। দলীয় ও ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসার দ্বারা জাতীয় রাজনীতিকে আক্রান্ত করলে এবং দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারা ব্যহত করে কাউকে ঘায়েল করার চেষ্টা সব সময়ই বিপরীত ফল বয়ে আনে।
দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হলে বর্তমান সরকারের ক্ষমতার ধারাবাহিকতার এক দশক পূর্ণ হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার দেশি-বিদেশি বহুপাক্ষিক উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশে একটি সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। দেশব্যাপী সড়ক-মহাসড়ক অবরোধে প্রায় তিনমাস এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরী হওয়ার ঘটনা বাদ দিলে ১০ বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই ছিল রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল। ইতিপূর্বে চারদলীয় জোট সরকারের সময় যেভাবে বছরব্যাপী প্রতিমাসেই হরতাল-অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে মগহাজোট সরকারের সময় তেমনটা ঘটেনি। পক্ষান্তরে বিরোধিদল বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে দাঁড়াতেই দেয়নি সরকার। এমনকি ঘরোয়া অনুষ্ঠানাদিও পুলিশি নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস। অতীতে অতি রাজনীতি এবং বল্গাহীন রাজনৈতিক কর্মসূচি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চরমভাবে ব্যহত করেছে। গত ১০ বছর সে ধারার রাজনীতি অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দেশে যে ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠার কথা তা হয়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যেমন চরম রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা দেয়ার পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত সংসদ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগিরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চায়। এ জন্যই তারা নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ক‚টনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল। তাদের সেই প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ার কারণেই একপাক্ষিক ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দল নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রফতানী বাজার এবং উন্নয়ন অংশিদার। বাংলাদেশে তামাশার নির্বাচনে তাদের হতাশা ও ক্ষব্ধতার বহি:প্রকাশ তারা বিভিন্নভাবে ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে, গার্মেন্টস রফতানীতে নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে, তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তাদের অপরিবর্তিত অবস্থানের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরেকটি অংশগ্রহনমূলক ও অবাধ সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের জন্য তাগাদা দিয়ে তারা তাদের অবস্থান পরিস্কার করেছে। এ কারণেই গত ১০ বছরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সত্বেও দেশে যে ধরনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হওয়ার কথা তা হয়নি। সরকারের তরফ থেকে অনবরত দেশকে এগিয়ে নেয়ার দাবী করা হলেও মানুষের কাছে তা’ গ্রহনযোগ্যতা পায়নি। গত সোমবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। রুশ বিপ্লবের শকবর্ষ উপলক্ষ্যে নাগরিক উদ্যোগ নামের একটি সংগঠনের অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা যে সমাজের কথা ভেবেছিলাম, বলা বাহুল্য সেই সমাজ আমাদের জীবদ্দশায় আর দেখতে পারলামনা। খুব শিগগির যে পারব তাও মনে হয়না।’ দেশের সাধারণ মানুষ থেকে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানদের মত বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে যে হতাশা দেখা দিয়েছে তা সরকারের উন্নয়নের দাবীর সাথে মোটেও মিলছেনা। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে, শিক্ষার মানোন্নয়নে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে, রফতানী বাণিজ্যে, বিনিয়োগ আকর্ষণে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে এবং জাতীয় সংকট সমাধানে পিছিয়ে থাকার বাস্তবতায় সরকারের তথাকথিত উন্নয়নের গল্প গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছেনা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক হতাশা কাটিয়ে দেশকে নতুন সম্ভাবনার দিগন্তে নিয়ে যেতে পারে।
bair_zamal@yahoo.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: নির্বাচন

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ