Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

লক্ষাধিক কর্মী ট্রাভেল পাস বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা

মালয়েশিয়ায় ৩১ ডিসেম্বর রি-হিয়্যারিং কর্মসূচি শেষ হচ্ছে

শামসুল ইসলাম | প্রকাশের সময় : ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:০২ পিএম, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৭

মালয়েশিয়ায় কর্মরত লক্ষাধিক অবৈধ বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফেরার ট্রাভেল পাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যেসব অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীর ডিজিটাল পাসপোর্টের ফটোকপি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে, তাদেরকেও হাই কমিশন থেকে ট্রাভেল পাস দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীদের ট্রাভেল পাস যথাসময়ে না পাওয়ায় হাজার হাজার কর্মী দেশে ফিরতে পারছেন না। মালয়েশিয়া থেকে ট্রাভেল পাস নিয়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় হাই কমিশন থেকে ট্রাভেল পাস ইস্যু প্রক্রিয়া কড়াকড়ি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। গত ১২ ডিসেম্বর থেকে হাই কমিশন কর্তৃপক্ষ অঘোষিতভাবে ট্রাভেল পাস ইস্যু বন্ধ করে দেয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইনানুযায়ী ট্রাভেল পাস বঞ্চিত অবৈধ এসব কর্মী আগামী ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে গ্রেফতার হলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। অনেক অবৈধ কর্মী সরকার নির্ধারিত ৪৪ রিংগিত ব্যাংকে ফি জমা দিয়ে দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত চার-পাঁচ শ’ রিংগিত ঘুষ দিয়ে ট্রাভেল পাস নিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
মালয়েশিয়া থেকে একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তবে হাই কমিশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ট্রাভেল পাস ইস্যু বন্ধ করা হয়নি; যাচাই-বাছাই করে ট্রাভেল পাস দেয়া হচ্ছে। ইস্যুকৃত ট্রাভেল পাস যাতে অপব্যবহার না হয় সে জন্য সতর্কতার সাথে ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হচ্ছে। এদিকে, মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের আর ভিসার কর দিতে (লেভি) হবে না। নিয়োগকৃত কর্মীদের নিয়োগকর্তাকেই কর পরিশোধ করতে হবে। মজুরি থেকে আর কর দিতে হবে না বলে দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এখন থেকে আগামী ১ জানুয়ারীর শুরুতে নিয়োগকর্তারাই বিদেশি কর্মীদের কর প্রদান করবে।
‘এই নীতিমালার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় নিয়োগকারীরা নতুন বিদেশি কর্মীদের জন্য এবং তাদের অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট বহিভর্‚ত কর্মীদের জন্য শুল্ক ফি বহন করতে হবে’। ‘নিয়োগকর্তা আধিকারিক’ নামক দলিলের অংশ হবে যা বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের আগে নিয়োগকর্তাদের স্বাক্ষর করতে হবে। ‘বিদেশি কর্মী লেভি সম্পর্কে আইনের শাসন অনুসরণ করতে ব্যর্থ যারা নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়ে দিয়েছে।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর মালয়েশিয়া সরকার ঘোষিত অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের বৈধতা দেয়ার সময়সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর পরে রি-হিয়্যারিং কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যাওয়া কোনো অভিবাসী কর্মী ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে তার ১০ হাজার রিংগিত জরিমানাসহ এক বছর জেল হতে পারে। এ যাবত প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি কর্মী রি-হিয়্যারিং প্রকল্পের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছে। নিবন্ধিত এসব কর্মীর বৈধতা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাই কমিশনের শ্রম সচিব সায়েদুল ইসলাম বুধবার রাতে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আগামী ৩১ ডিসেম্বরের জন্য কাউকে অপেক্ষা না করে আজই অবৈধ কর্মীদের নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন। প্রতিদিন বাংলাদেশ হাই কমিশনে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অবৈধ কর্মীরা ট্রাভেল পাসের জন্য ভিড় জমাচ্ছেন। অবৈধ কর্মীরা ভোর বেলা থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ট্রাভেল পাস না পেয়ে নিরাশ মনে খালি হাতে কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছেন। হাই কমিশনে ট্রাভেল পাসের কাউন্টারের কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ ও জনৈক মহিলা কর্মচারীর দুর্ব্যবহারে আগত কর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রামের মো. আবদুুল্লাহ গত ১১ ডিসেম্বর আউট পাসের জন্য ৪৪ রিংগিত ব্যাংক ড্রাফট কেটে তার ডিজিটাল পাসপোর্টের ফটোকপি এবং স্থানীয় নির্বাহী অফিসারের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে গত ১২ দিন যাবত হাই কমিশনে আউট পাস সেকশনে দায়িত্বরত কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদের কাছে ধরণা দিয়েও কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। যারাই চার-পাঁচশ’ রিংগিত বকশিস দিচ্ছে, তাদের ভাগ্যেই আউট পাস জুটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাই কমিশনের শ্রম সচিব সায়েদুল ইসলাম এক প্রশ্নের জবাবে ইনকিলাবকে বলেন, ট্রাভেল পাস দেয়া বন্ধ করা হয়নি। ট্রাভেল পাস দেয়া হচ্ছে তবে যাচাই-বাছাই করে ট্রাভেল পাস দিচ্ছি যাতে ইস্যুকৃত ট্রাভেল পাসের অপব্যবহার না হয়। হাই কমিশনের ট্রাভেল পাস সেকশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, ট্রাভেল পাস দেয়া বন্ধ এমন কথা যারা বলছেন তারা সঠিক বলেননি; ট্রাভেল পাস দেয়া বন্ধ না।
মালয়েশিয়ায় রি-হিয়ারিং প্রক্রিয়ায় অবৈধ কর্মীদের বৈধকরণের সুযোগ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেলে দেশটিতে অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হবে বলে জানা গেছে। দেশটিতে ২০১৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কয়েকটি ক্রাইটেরিয়ার মাধ্যমে বৈধকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে রি-হিয়ারিং এবং পরবর্তীতে এর সঙ্গে (যাদের কোনো কাগজপত্র নেই) যুক্ত হয় ই-কার্ড প্রোগ্রাম। ই-কার্ডের প্রক্রিয়া শেষ হয় গত ৩০ জুন।
অবৈধ কর্মীদের যারা ই-কার্ডের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছে, তাদেরকে রি-হিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বৈধ হতে হবে। রি-হিয়ারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যারা নিবন্ধিত হয়েছেন এবং যারা এখনো নিবন্ধন করেননি তাদের দ্রæত মাই-ইজি, বুক্তিমেঘা ও ইমান এ তিন কোম্পানির মাধ্যমে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বৈধতার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেশটির অভিবাসন বিভাগের পাশাপাশি কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশন কর্তৃপক্ষ বারবার তাগিদ দিয়ে আসছে। মালয়েশিয়া বিএনপি শাখার (একাংশের) সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সালাহ উদ্দিন রাতে কুয়ালালামপুর থেকে জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বৈধ-অবৈধ সকল নাগরিকরাই ট্রাভেল পাস পাওয়ার অধিকার রাখেন। দেশটি এসে যারা কঠোর পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স আয় করে এতদিন দেশে পাঠিয়েছেন । এখন এদের যারাই বিভিন্ন কারণে অবৈধ হয়েছে তাদের ভোটার আইডি, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সনদ এবং পাসপোর্টের কপি থাকলেই তারা যে কোনো সময়ে ট্রাভেল পাস চাইলে হাই কমিশন ট্রাভেল পাস দিতে বাধ্য। এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা কাজী সালাহ উদ্দিন বলেন, কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের ট্রাভেল পাস সেকশনের অসাধু কর্মকর্তারা টু-পাইস কামানোর জন্যই ট্রাভেল পাস ইস্যু কমিয়ে দিয়েছেন। এতে হাজার হাজার অবৈধ কর্মী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরত যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বিপদগ্রস্ত হবে। তিনি অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থেই আজ-কালের মধ্যেই অপেক্ষমাণ সকল বাংলাদেশি নাগরিকদের ট্রাভেল পাস সরবরাহ করে দেশে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার জোর দাবি জানান। কাউকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সন্দেহ করে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ট্রাভেল পাস দেয়া বন্ধ করার কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের জন্য পেনিন্সুলার মালয়েশিয়ায় ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক বিদেশি কর্মীদের জন্য লেভি হার নির্ধারিত হয় এক হাজার ৮৫০ রিংগিত হারে এবং কৃষি ও কৃষি খাতে ৬৪০ রিংগিত। একটি পরিবারের প্রথম বিদেশি দাসীর জন্য লেভেলে ৪১০ রিংগিত, দ্বিতীয় ৫৯০ রিংগিত, তৃতীয় এবং চতুর্থ এবং পরবর্তী ৫৯০ রিংগিত নির্ধারিত হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, এই নীতি মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী ব্যবস্থাপনার উন্নতির উদ্যোগ। অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির মোট কর্মসংস্থানমূলক হারের জন্য বৈদেশিক কর্মীদের কর্মসংস্থানের ১৫ শতাংশ সীমিত করা এবং বিদেশি কর্মীদের লিজি সিস্টেমের উন্নতির মাধ্যমে কম দক্ষ বিদেশি কর্মীদের প্রবেশের নিয়ন্ত্রণ অন্তর্ভুক্ত।



 

Show all comments
  • Jiam Babor ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৪:৪৯ এএম says : 0
    কাউকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সন্দেহ করে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের ট্রাভেল পাস দেয়া বন্ধ করার কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
    Total Reply(0) Reply
  • Saiful islam ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৯:১৬ পিএম says : 0
    আমরা কি ভাবে বাংলাদেশে যাবো আমরা যারা বাংলাদেশের নাগরিক তাদের রৌহিগা ভেবে আমাদের টাভেলপাস বনদো করে দিছে এখন আমাদের কি উপাই হবে একটু যদি বলেন ত অনেক ভালো হবে কি করলে দেশে যেতে পারবো
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর