Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১২ কার্তিক ১৪২৭, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের বসার জায়গা সঙ্কট

মাঠপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ছড়াছড়ি। কিন্তু এসব কর্মকর্তাদের বসার জায়গা নেই। অথচ মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে চেয়ার খালি পড়ে আছে। মেধাবীদের অনেকেই পদায়ন ও পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি কাজের দায়-দায়িত্ব কৌশলে এড়িয়ে চলছেন অনেক কর্মকর্তা। নথি নিষ্পত্তিতে অনেকেই দায়িত্ব নিচ্ছেন না।
সচিবালয় নির্দেশমালা মানা হচ্ছে না। অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার কাজ বাদ দিয়ে তারা ব্যতিব্যস্ত নিজেদের কাজে। সব মিলিয়ে প্রশাসনের এখন বেহাল অবস্থা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন ৭৮ জন। এর মধ্যে তিনজন বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি। এ বছরই অবসরে যাবেন ছয় সচিব। বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব আছেন ৮৭৩ জন, যুগ্ম-সচিব আছেন ৯৩০ জন, উপ-সচিব আছেন ১২২৯ জন, এবং সিনিয়র সহকারী সচিব আছেন ১৫২০ ও সহকারী সচিব ১২৭০ জন। আবার আগামী বছর ২৪তম ব্যাচের ৩৫০জন কর্মকর্তারা উপ-সচিবে পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়ার চলছে। পদোন্নতি পাওয়ার জন্য তারা প্রত্যাশায় দিন গুণছেন। গত ১১ ডিসেম্বর আবারও সরকার যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ১২৮ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছে। অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদের সংখ্যা ১১১টি হলেও এই ১২৮জন বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদয় কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬০ জনে। পদোন্নতি প্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিবদের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের পূর্বপদে সমন্বয় করা হয়েছে। পদের বিপরীতে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি হওয়ায় বেশিরভাগ কর্মকর্তাকেই আগের পদেই পদায়ন (ইন সি টু) করা হবে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর ৫৩৬ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপ সচিবের তিন স্তরে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। এর আগে একই বছরের মে মাসে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম-সচিব ও উপসচিব পদে আরও ২১৭ কর্মকর্তা এবং ২০১৫ সালের জুন মাসে উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব এবং অতিরিক্ত সচিব পদে আরও ৮৭৩ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। গত ২৩ এপ্রিল ২৬৭ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে উপ সচিব পদে পদোন্নতি দেয় সরকার। প্রশাসনে যুগ্ম সচিবের স্থায়ী পদ আছে ৪৩০টি। এরপর আবার নতুন করে গত ২১ ডিসেম্বর সরকার আরও ১৯৩ জন উপ সচিবকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়। এ নিয়ে প্রশাসনে বর্তমানে যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪২ জন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল মেয়াদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন ধাপে জনপ্রশাসনের ২ হাজার ৫২৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছিল। এর মধ্যে উপসচিব হিসাবে ১ হাজার ৬৬ জন, যুগ্ম সচিব পদে এক হাজার ৯১ জন, অতিরিক্ত সচিব পদে ২৯৩ জন এবং সচিব পদে ৭৮ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পান।
সচিবালয়ে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ঘুরে দেখা গেছে, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম-সচিব, উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার অভাব নেই। বিভিন্ন কক্ষে কোনোভাবে তাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাত্র কয়েক বছর আগেও যেসব কক্ষে সহকারী সচিব বা সিনিয়র সহকারী সচিবরা বসতেন, সেসব কক্ষে এখন বসছেন উপ-সচিব ও যুগ্ম-সচিবরা। প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা ব্যক্তিগত সহকারীরা যেসব কক্ষে বসতেন, সেখানে বসছেন সিনিয়র সহকারী সচিবরা। স্বরাষ্ট্রসহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়েই কাঁচের তৈরি ছোট ছোট কাউন্টারের মতো ঘরে বসছেন উপ-সচিবরা। যুগ্ম-সচিব হিসেবে যোগদানকারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বসার ব্যবস্থা হয়েছে একজন সিনিয়র সহকারী সচিবের জন্য নির্ধারিত কক্ষে। গতকাল রোববার সচিবালয়ে পদোন্নতি পাওয়া এক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, কোনোভাবে বসার একটা জায়গা পেয়েছি, তাতেই খুশি। অনেকে তো বসার জায়গাও পাচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুগ্মসচিব বলেন, আমাদের অবস্থা ভাল হলেও বসার জায়গার ক্ষেত্রে খুবই করুণ অবস্থা। মাঠ প্রশাসনে যারা আছেন তারা অনেক ভালো আছেন। তাদের বসার রুম আছে, গাড়ি আছে এবং বাসাও আছে।
সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্য ‘সচিবালয় নির্দেশমালা’ জারি করা হয়েছে। দাফতরিক কার্যনিষ্পত্তি সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল পদ্ধতিতে সম্পাদনের জন্য সংবিধানের ৫৫(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রুলস অব বিজনেসের নির্দেশনায় এটি প্রণয়ন করা। এর সর্বশেষ সংস্করণ সচিবালয় নির্দেশমালা-২০১৪ মাত্র কয়েকদিন হলো প্রকাশ হয়েছে। এতে সচিবালয়ে কর্মবণ্টন ও অফিস কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কর্মকর্তারা এ নির্দেশনা মানছেন না। হাতে গোনা ৫-৭ জন সচিব ছাড়া অনেকেই এই নির্দেশনা আমলে নেননি। এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, কোনো কর্মকর্তাই কোনো কিছুর দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন না। রাজনৈতিক পরিচয়ে দলবাজি করে পদ-পদবি নিয়েছেন। সচিব হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে আছেন, কিন্তু সরকারের কাজের দায়িত্ব নিতে চান না। মাঠপ্রশাসনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মকর্তার আধিক্য বা সংকট না থাকলেও রাজনৈতিক কারণে চলছে অচলাবস্থা। অনেক মন্ত্রী-এমপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা এসিল্যান্ডকে বদলাতে তদবির করছেন। সরকারের শেষ সময়ে মন্ত্রী-এমপিরা তাদের পছন্দ মতো কর্মকর্তাকে নিজের উপজেলায় চাচ্ছেন। এ নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অস্থির। কারণ, মাঠপর্যায়ে এক স্টেশনে একজন কর্মকর্তার তিন বছর চাকরি করার বিধান রীতিমতো বাধ্যতামূলক। মন্ত্রী-এমপিদের তদবির রক্ষা করতে হলে নিজের করা নিয়মই ভাঙতে হবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার ইনকিলাবকে বলেন, যেভাবে পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে এটা ভাল, তবে জনগণ প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছে না। পদোন্নতির ক্ষেত্রে দক্ষতা, সততা ও মেধাকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়া দরকার। বসার জায়গা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারকে ভেবে চিন্তে দেখার প্রয়োজন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো: মোজাম্মেল হক ইনকিলাবকে বলেন, প্রশাসনে পদোন্নতি দেয়া সরকারের রুটিন কাজ। বৈষম্য দূর করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার কারণেই উপরের দিকে কর্মকর্তার সংখ্যা বেড়েছে। জায়গা সংকট থাকলেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামীতে জায়গার সংকট হবে না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সচিবালয়ে

১০ অক্টোবর, ২০১৬
১ এপ্রিল, ২০১৬

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ