Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

আন্দোলনেও প্রস্তুত বিএনপি

দু’দলেই নির্বাচন প্রস্তুতি

ফারুক হোসাইন | প্রকাশের সময় : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

খালেদা জিয়ার বার্তা নিয়ে তৃণমূলে ২৫ টিম : আলোচনার সময় দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা
আগামী বছরেই অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এক বছরের কম সময় থাকলেও এখনো নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিপরীত অবস্থানে প্রধান এই দুই রাজনৈতিক দল। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে অনড় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না জানিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করছে বিএনপি। তাই নতুন বছরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করাই বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করতে চায় দলটি। প্রাথমিকভাবে আলোচনার মাধ্যমেই নিজেদের দাবি আদায় করতে চান দলের নেতারা। দাবি আদায়ে আলোচনার পাশাপাশি মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রস্তুত থাকতে বলা হচ্ছে নির্বাচনের জন্যও। নতুন বছরের শুরুতে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা এবং আন্দোলনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এরপরই রাজনৈতিক অঙ্গন পরিবর্তন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলের বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও অরাজনৈতিক ব্যক্তি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা চূড়ান্ত করছেন। শিগগিরই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তা জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন। আর নির্দলীয় সরকারের সেই রূপরেখায় ঠিক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের আদলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার প্রস্তাব দেয়া হবে। সেই প্রস্তাবের আলোকে ক্ষমতাসীন সরকারকে আলোচনায় বসার আহŸানও জানাবে বিএনপি। গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবটি মেনে নিয়ে সরকার আলোচনায় না বসলে আন্দোলনের পথই বেছে নেবে দলটি। ইতোমধ্যে দলের নেতা-কর্মীদের আন্দোলন এবং নির্বাচনের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে ২০ দলীয় জোট, স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান ও উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকেও সবার পরামর্শ নিয়ে একই নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীতে মুক্তিযোদ্ধা দলের সমাবেশে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পায়। ভোটের আগেই সরকার দলের লোক ব্যালট বাক্স সিল মেরে ভর্তি করে রাখে। ফলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। এ সময় তিনি নেতা-কর্মীদের আগামী দিনের কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হোন। বেগম জিয়ার এই বার্তাকেই আগামী দিনের দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখছেন দলের নেতা-কর্মীরা। তারা বলছেন, বিএনপি প্রধান যে বার্তা দিয়েছে সেখানে সুস্পষ্টভাবে আগামী দিনে কি করতে হবে তা বলে দিয়েছেন। এদিকে কেবল দিকনির্দেশনা পেয়েই বসে নেই শীর্ষ নেতারা। দলকে সুসংগঠিত করতে জোরেশোরে কাজ করছেন তারা। এরই মধ্যে জেলায় জেলায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসনের বার্তা। পুনর্গঠন হচ্ছে সাংগঠনিক কমিটিগুলোও। যেসব এলাকার তৃণমূলে দ্ব›দ্ব-কোন্দল ও মনোমালিন্য রয়েছে তা দূর করতেও হস্তক্ষেপ করছেন সিনিয়র নেতারা। আন্দোলনের জন্য পরামর্শ নেয়া হচ্ছে তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকেও, যা পরবর্তীতে পৌঁছে দেয়া হবে বেগম জিয়ার কাছে।
নেতা-কর্মীরা বলছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। যার মাধ্যমে আগামী দিনের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিস্থিতি নির্ভর করবে। সরকার প্রস্তাব মেনে নিলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে জাতীয়তাবাদী দলটি। অন্যথায় রাজপথমুখী হওয়ার চিন্তা করা হবে। বিএনপি প্রধানের নির্বাচন এবং আন্দোলন যে কোনো ঘোষণার জন্য মাঠে থাকতে প্রস্তুত রয়েছেন তারা। এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে সবসময় নির্বাচন ও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত। বেগম খালেদা জিয়া দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সবকিছুই জানেন। তিনি সহায়ক সরকারের রূপরেখা দেবেন। এছাড়া নেতাদের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ও কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
বিএনপি সূত্রে জানা যায়, সহায়ক সরকার ও নির্বাচনকালীন রূপরেখা নিয়ে সরকার যদি চেয়ারপারসনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে পরবর্তী করণীয় নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তবে দলের সিনিয়র নেতাদের বড় অংশই বলছেন, দাবি নিয়ে রাজপথমুখী হওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। সে ক্ষেত্রে দেশব্যাপী ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচিই দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এর আগে সহায়ক সরকারের প্রস্তাবের পক্ষে দেশ-বিদেশে জনমত তৈরির চেষ্টা করা হবে। এ নিয়ে ২০ দলীয় জোট ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শও নেবে বিএনপি। জানা যায়, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি নিয়ে ‘মাঠ গরম’ করার চিন্তা-ভাবনাও রয়েছে বিএনপি জোটের। আগামী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে বিএনপির বার্তা দেশ-বিদেশে পৌঁছে দেয়া হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশের নির্বাচন প্রস্তুতির সঙ্গে খালেদা জিয়ার আন্দোলনের বার্তাও থাকবে। বিএনপির কয়েকজন নীতিনির্ধারণী নেতা জানান, শিগগিরই বেগম জিয়া সহায়ক সরকারের রূপরেখা ও প্রয়োজনে আন্দোলনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন। তিনি জাতির সামনে সহায়ক সরকারের ফর্মুলা দেয়া ছাড়াও নির্বাচন বিষয়ে অনেক কিছু খোলাসা করবেন। পাশাপাশি তৃণমূল বিএনপি চাঙ্গা করতে দ্রæতই বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করবেন দলের প্রধান। এদিকে বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীরা আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছেন। তারা অপেক্ষা করছেন দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতির নির্দেশনা পাওয়ামাত্রই মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ভোটযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, বিএনপি নির্বাচন ও আন্দোলন দু’টির জন্যই সমানভাবে প্রস্তুত আছে। আওয়ামী লীগের লক্ষ্য জোর করে ক্ষমতায় থাকা আর বিএনপির উদ্দেশ্য জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া। তাই ৫ জানুয়ারির মতো আর একতরফা নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। এ ক্ষেত্রে কোনোরকম কমপ্রোমাইজ করার সুযোগ নেই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার রূপরেখা অনুযায়ী নির্বাচন দিতে হবে। ওই নির্বাচনে দেশের মানুষ অংশগ্রহণ করবে এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে।
বার্তা যাচ্ছে তৃণমূলে : নতুন বছরের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে সারা দেশে বেরিয়ে পড়েছে বিএনপির ২৫টি টিম। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব টিম বিএনপির ৭০টি সাংগঠনিক জেলা সফর করবে। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে খালেদা জিয়ার নির্দেশনা যেমন পৌঁছে দেয়া হবে, তেমনি তৃণমূল থেকেও নেয়া হবে আগামী বছরের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের পরামর্শ। তবে সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে তৃণমূলে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব-কোন্দল নিরসন ও নেতা-কর্মীদের সক্রিয় করার মাধ্যমে আন্দোলন ও নির্বাচন উপযোগী করা। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, সংগঠনকে আরো গতিশীল করতে এবং আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে ঢাকা মহানগর (উত্তর-দক্ষিণ) এবং মানিকগঞ্জের দায়িত্বে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বরিশাল জেলা ও মহানগর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর, মির্জা আব্বাস রাজশাহী জেলা ও মহানগর, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সিলেট জেলা ও মহানগর, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী গোপালগঞ্জ জেলা, মেজর জেনারেল (অব:) রুহুল আলম চৌধুরী নেত্রকোনা, বরকত উল্লাহ বুলু ঢাকা জেলা ও মুন্সীগঞ্জ, আহমেদ আজম খান শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন গাজীপুর জেলা ও মহানগর, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান টাঙ্গাইল জেলা। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার থেকে এসব নেতা বিভিন্ন জেলায় সফর শুরু করেছেন। গত ২৭ ডিসেম্বর বরিশালে সফর করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গতকাল সিলেট অঞ্চলে গেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসূফ গোপালগঞ্জ, আবদ্ল্লুাহ আল নোমান ময়মনসিংহ উত্তর, দক্ষিণ ও শেরপুর এবং রুহুল আমীন চৌধুরী নেত্রকোনা, শরীয়তপুর-মাদারীপুর ঘুরে এসেছেন ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান বলেন, গত এক বছরে ভাইস চেয়ারম্যান মো: শাহজাহানের নেতৃত্বে যে সংগঠন গোছানো হয়েছে, এর অগ্রগতি ও তৎপরতা দেখভাল করতেই সারা দেশে টিম যাচ্ছে। নতুন কমিটি হয়েছে, সাংগঠনিক পরিস্থিতি কেমন, এসব বিষয় দেখভাল করার জন্যই এসব টিম। তিনি বলেন, নতুন বছরে আন্দোলন ও নির্বাচন দুটোই আছে। এই প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বলা হচ্ছে।
ভাইস চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শাহজাহান বলেন, নির্বাচনের জন্য প্রার্থী প্রস্তুত আছে। তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। তিনি মনে করেন, এই সরকার আলোচনায় বিশ্বাসী না, আন্দোলনের মাধ্যমেই বিএনপিকে তার দাবি আদায় করতে হবে। দলও সেভাবে প্রস্তুত। দল পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অধিকাংশ জেলায় নতুন কমিটি দেয়া হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোও শিগগিরই হয়ে যাবে। মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোও পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বিশেষ করে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য যুবদল, স্বেচ্ছাবেক দল ও ছাত্রদলকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি।



 

Show all comments
  • তানবীর ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৬:০১ এএম says : 0
    বিএনপির জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো।
    Total Reply(0) Reply
  • রাফসান ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৬:০৩ এএম says : 0
    বিএনপির জন সমার্থন আছে, তবে তাদের সাংগঠনিক অবস্থাকে আরো মজবুত করতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Mahbubur Rahman ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭, ৬:০০ এএম says : 0
    আন্দোলনেও প্রস্তুত বিএনপি ... ai kotha aro onek bar sunaysi. kobe je suru korbe seta e dekhar bisoy
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ