Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ০৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

চট্টগ্রামে চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ছিল আলোচনায়

র ফি কু ল ই স লা ম সে লি ম | প্রকাশের সময় : ১ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

চট্টগ্রামে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল খুনের ঘটনা। মহানগর ও জেলায় অসংখ্য হত্যার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনায় তোলপাড় হয় দেশজুড়ে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দিয়াজ ইরফান চৌধুরীর খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে বছরজুড়েই নানা কর্মসূচি পালিত হয়। এক আসামি গ্রেফতারের জেরে চবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্রলীগের একাংশ। নগরীর কদমতলী শুভপুর বাসস্ট্যান্ডে খুন হন পরিবহন ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ চৌধুরী। নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে বন্দুকধারীরা। তখন মূল সড়কে চলছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভের ঘটনায় আনন্দ শোভযাত্রা। এ শোভাযাত্রার আয়োজক স্থানীয় তিন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনাÑ শোভযাত্রার পেছন থেকে বের হয় বন্দুকধারীরা। খুনের পর তারা ফের শোভাযাত্রায় মিশে যায়। যদিও এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন আয়োজকরা। ওই খুনের পর ক্ষোভে-বিক্ষোভে রাস্তায় নামেন কদমতলী এলাকার সর্বস্তরের ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। তারা ধর্মঘট, বিক্ষোভ সমাবেশ, পুলিশ কমিশনার বরাবরে স্মারকলিপিসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন। নিহত তরুণ ব্যবসায়ী হারুনের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর চৌধুরী।
তার চাচা দস্তগীর চৌধুরী ছিলেন চসিকের ডেপুটি মেয়র ও নগর বিএনপির সেক্রেটারি ও সিনিয়র সহ-সভাপতি। বড় চাচা মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী সদরঘাট থানা আওয়ামী লীগের আহŸায়ক। রাজনৈতিক পরিবারের এই যুবক সদরঘাট থানা যুবদলের আহŸায়ক ছিলেন। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য সরকারি দলের সন্ত্রাসীদের দায়ী করেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতারা। তারা অভিযোগ করেন, সরকারি দলের চাঁদাবাজদের বাধা দেয়ায় তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আলোচিত এই খুনের ঘটনায় জড়িতরা ধরা পড়েনি। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দশ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা দেয়া হলেও পুলিশ তা বদলে ফেলে। ওই দশজনকে সন্দেহজনক হিসেবে রাখা হয়েছে। নিহতের স্বজনরা বলছেন, পুলিশের সামনেই হারুনকে গুলি করা হয়। পুলিশ খুনিদের কিছু না করে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে, এখন আসামিদের ধরার বদলে তাদের আশ্রয় দিয়ে চলেছে।
এর আগে ৬ অক্টোবর একই থানা এলাকার দক্ষিণ নালাপাড়ায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস রুবেলকে। পুলিশ জানায়, প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটে। খুনিরা লালখান বাজার আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমের অনুসারী। লালখান বাজার থেকে দল বেঁধে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাযোগে দক্ষিণ নালাপাড়ায় গিয়ে তারা সুদীপ্তকে হত্যা করে। খুনের সময় দুই দফা ফাঁকা গুলি ছুড়ে তারা ফের লালখানবাজার ফিরে আসে। এক আসামি আদালতে খুনের দায় স্বীকার করে এমন জবানবন্দিও দিয়েছে। সুদীপ্তের অনুসারী ছাত্রলীগের নেতাদের অভিযোগ, এই খুনের নির্দেশদাতা মাসুম। তাকেসহ খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে ছাত্রলীগ রাস্তায়ও নামে। নগরীর মুসলিম হলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আতাউর রহমান খান কায়সারের স্মরণসভায় এসে ছাত্রলীগের বিক্ষোভের মুখে পড়েন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি ছাত্রলীগের নেতাদের দাবি অনুযায়ী খুনিদের গ্রেফতারে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেন। তবে এই আলোচিত খুনের ঘটনায় এখনও মূল আসামিরা ধরা পড়েনি।
গেল বছরের আলোচিত খুনের অন্যতম যুবলীগ কর্মী ইমরানুল করিম ইমন হত্যা। নির্মম এই হত্যাকান্ডের প্রধান আসামি নগর যুবলীগের নেতা অমিত মুহুরী। ইমনকে নগরীর নন্দনকাননের বাসায় দাওয়াত দিয়ে এনে খুন করা হয়। অমিত মুহুরীর অপর বন্ধু ও ইমন হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী শিশির আদালতে দেয়া জাবনবন্দিতে জানায়, ইমনকে একটি চেয়ারে বসিয়ে প্রথমে তার হাত-পা ও মুখ বাঁধা হয়। এরপর গলা কেটে হত্যা করে অমিত। এ সময় বাসায় উচ্চ শব্দে গান চলছিল। পরে চেয়ারে বাঁধা লাশ বাথরুমে নিয়ে রাখা হয়। সেখানে লাশ রেখে রাতভর গান শুনে অমিত মুহুরী ও তার স্ত্রী। এরপর অমিত তার সহযোগীদের নিয়ে ইমনের লাশ একটি ড্রামে ভরে তাতে এসিড ও চুন দিয়ে লাশ গলানোর চেষ্টা করে। পরে ওই ড্রাম সিমেন্টে ঢালাই করে ড্রামটি এনায়েতবাজার মোড়ের অদূরে রানীর দীঘিতে ফেলে দেয়া হয়। পুলিশ অজ্ঞাত হিসেবে ড্রামভর্তি ওই লাশ উদ্ধারের পর শিশিরকে আটক করে। পরে তার দেয়া তথ্যে কুমিল্লার একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে হানা দিয়ে অমিত মুহুরীকে পাকড়াও করা হয়। আদালতে অমিত খুনের দায় স্বীকার করে। অমিত দাবি করে তার স্ত্রীর দিকে কুনজর দেয়ায় ইমনকে সে এভাবে খুন করে সাজা দিয়েছে। ভয়ঙ্কর অমিত মুহুরীর হাতে নগরীতে আরো কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। এসব মামলারও তদন্ত চলছে। সিআরবিতে রেলের টেন্ডারবাজিতে জোড়া খুনের আসামি অমিত এখন কারাগারে। তবে ইমন খুনের ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের কাউকে আর ধরতে পারেনি পুলিশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিগত ২০১৬ সালের ২০ নভেম্বর খুন হন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সহ-সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী। ছাত্রলীগের দলীয় কোন্দলের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটে। গেল বছরজুড়ে পুত্রের খুনিদের গ্রেফতারে আইনি লড়াই আর রাস্তায় নানা কর্মসূচি পালন করেন দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী। এই হত্যা মামলার আসামি চবির সাবেক সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে পরপর দুই দিন ক্যাম্পাস অচল করে ছাত্রলীগ। চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় গেল বছর শতাধিক খুনের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এসব খুনের সাথে জড়িতদের বেশিরভাগই ধরা পড়েনি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।