Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮, ৯ বৈশাখ ১৪২৫, ০৫ শাবান ১৪৩৯ হিজরী

সৎ ব্যবসা উত্তম ইবাদত

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর) : একবার বিলাল রা. ভাল জাতের খেজুর নিয়ে রসুলুল্লাহ স.-এর খেদমতে হাজির হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এসব কোথা থেকে আনলে? বিলাল রা. জবাব দিলেন, আমাদের নিকট নিকৃষ্টমানের খেজুর ছিল, তার দুই সা পরিমাণ দিয়ে উৎকৃষ্ট এক সা খেজুর নিয়ে এসেছি। রসুলুল্লাহ স. বললেন, উহ্! এ তো নির্ভেজাল সুদ! এমন কাজ কখনো করো না। তোমরা ভাল খেজুর কিনতে চাইলে আগে তোমার খেজুর বিক্রি করো, পরে তার মূল্য দিয়ে ভালো খেজুর ক্রয় করো। ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয়ঃ ব্যবসা বা ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে উপার্জিত অতিরিক্ত অংশকে মুনাফা বলা হয়। এ ধরনের মুনাফাকে ইসলামে হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে মুনাফার বিনিময় হয়। এখানে একজন অন্যজনের প্রয়োজন সরবরাহ করার জন্য সময়, মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে থাকে এবং তার বিনিময় দান করে। ব্যবসার ক্ষেত্রে অর্থ দ্রব্যে এবং দ্রব্য অর্থে রূপান্তরিত হয়। এ রূপান্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু লোকের কর্ম সংস্থান সৃষ্টি হয়, অর্থের প্রবাহ চালু হয় এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে দেশে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে, ব্যবসার নতুন নতুন দিগন্ত খুলে যায় এবং উন্নয়নে গতি সঞ্চারিত হয়।
সংক্ষেপে সুদ ও লাভের পার্থক্য নিম্নে পেশ করা হলো: মুনাফার সম্পর্ক ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবসার সাথে, সুদের সম্পর্ক নগদ ঋণও সময়ের সাথে পুঁজি বিনিয়োগের ফলেযে অতিরিক্ত আয় হয়সেটি মুনাফা। নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে পরিশোধের শর্তে ঋণ দেয়ার পর পূর্ব নির্ধারিত হারে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থই সুদ। মুনাফা বিক্রেতার পুঁজি, শ্রম ও সময় বিনিয়োগের ফল, কিন্তু সুদের ক্ষেত্রে ঋণদাতার কোন শ্রম বিনিয়োগ করতে হয় না।
মুনাফা অনির্ধারিত ও অনিশ্চিত, কিন্তু সুদ নির্ধারিত ও নিশ্চিত। ব্যবসায়ী জানেনা তার ব্যবসায় আদৌ লাভ কি ক্ষতি হবে। লোকসান সার্বক্ষণিক তাকে তাড়া করে ফেরে। কিন্তু সুদী মহাজন ঋণ গ্রহীতা মরল কি বাঁচল তাতে তার কিছু যায় আসে না। আসল সহ সুদ তার ঘরে ফিরে আসবেই। বিক্রেতা ক্রেতার নিকট থেকে যতই মুনাফা আদায় করুক না কেন সেটা একবারই আদায় করতে পারবে, কিন্তু সুদ একই মূলধনের উপর বারবার নির্ধারণ এবং আদায় করা যায় (যাকে আমরা চক্রবৃদ্ধি সুদ বলে থাকি)।
মুনাফায় লোকসানের ঝুঁকি বহন করতে হয়, কিন্তু সুদে কোন ঝুঁকি নাই। ‘সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী র.।’ সুতরাং প্রতিটি মুসলমানকে সুদ ও মুনাফার পার্থক্য সম্পর্কে জানতে হবে। ইসলাম সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে কথা বলা বা আমল করাকেই পছন্দ করে। কারণ অনুমান ভিত্তিক কথাটি যদি সরাসরি আল্লাহর কথার বিপরীত হয় তবে দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই বরবাদ হয়ে যাবে। অর্থনীতির জটিল তথ্যগত জ্ঞান অর্জনের জন্য গভীরে প্রবেশ করতে না পারলেও ঈমান রক্ষার তাগিদে অন্তত ক্রয়-বিক্রয়, মুনাফা ও সুদের পার্থক্যটুকু আত্মস্থ করা একান্ত প্রয়োজন।
মূল্য নির্ধারণ বা দামনীতি : সাধারণ অবস্থায় সরকার কর্তৃক দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দেয়া ঠিক নয়। কারণ এতে উৎপাদনকারীর উৎপাদনে আগ্রহ ও উদ্দীপনা কমে যায়। রসুলুল্লাহ স. বলেছেন: ‘তোমরা মূল্য বেঁধে দিও না। কেননা আল্লাহ তাআলাই মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন, হ্রাস-বৃদ্ধি করেন এবং রিযিক প্রদান করেন। ‘সুনানে আবু দাউদ ও জামে তিরমিযি।’ হযরত আনাস রা. বলেন, নবী করীম স. এর যামানায় একবার দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে লোকেরা বললো হে আল্লাহর রসুল! আপনি দ্রব্যমূল্য ধার্য করে দিন। নবী করীম স. বললেন, আল্লাহ তাআলাই মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন, হ্রাস-বৃদ্ধি করেন এবং রিযিক প্রদান করেন। আমি আশাবাদী যে, আমি আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবো যে, রক্তপাত ও আত্মসাৎ করে জুলুম করেছি বলে তোমাদের কেউ আমার বিরুদ্ধে কোন কিছুর দাবি উত্থাপন করতে সক্ষম হবে না। ‘মিশকাত, জামে তিরমিযি, সুনানে আবু দাউদ।’
মূল্য বিক্রেতার অধিকার। তাই বলে খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীগণ যেনতেনভাবে মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না। যদি এমনটি কেউ করেন তবে উল্লেখিত হাদীসের আলোকে আত্মসাৎকারী হিসেবে সাব্যস্ত হবেন। এ ধরনের অসাধু, স্বেচ্ছাচারী উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীগণ যদি সীমালংঘন পূর্বক অস্বাভাবিকভাবে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্য নির্ধারণ ছাড়া ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ করা সম্ভব না হয় তাহলে সরকার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। ‘ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত মাস্লা-মাসায়েল, সম্পাদনা পরিষদ, ইফারা প্রকাশনা, মে-২০০৫।’ মূল্য নির্ধারণের পর কেউ যদি সীমালংঘন করে অধিক মূল্যে বিক্রয় করে তাহলে এ বিক্রয় যথার্থ হবে, তবে আইন লংঘনের দায়ে সে দোষী সাব্যস্ত হবে। ‘আল-কুরআনের অর্থনীতি, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৯, ইফারা গবেষণা: ও ইফারা প্রকাশনা, এপ্রিল-১৯৯০।’ ব্যবসার লক্ষই হলো মুনাফা লাভ। ইসলাম তা অর্জন নিষিদ্ধ করে না, ব্যবসায়ীকে মুনাফা থেকে বঞ্চিত করে না। কেননা মুনাফা পাওয়ার অধিকার না থাকলে কেউ-ই ব্যবসা করতো না। ফলে জনণের জীবন-জীবিকা অসম্ভব হয়ে পড়তো। তবে রবিহুল ফাহশ অর্থাৎ অত্যধিক, সীমাহীন মুনাফা (ঊীবপংংরাব ধহফ বীঃড়ৎনরঃধহঃ ঢ়ৎড়ভরঃ) গ্রহণ ইসলামে নিষিদ্ধ। কেননা, তা এক ধরনের শোষণ, অন্যদের ওপর জুলুম। শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ মুনাফা হচ্ছে ক্রয় মূল্যের এক ষষ্ঠাংশের সীমার মধ্যে যা থাকবে। আর এ মতও দেয়া হয়েছে যে, মুনাফা ক্রয় মূল্যের এক-তৃতীয়াংশের সীমার মধ্যে থাকা উচিত। কোন ফিকহবিদ রায় দিয়েছেন, ব্যবসায় অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান লোকদের বিবেচনায় যা স্বাভাবিক, তা-ই বৈধ মুনাফা। পণ্যমূল্য জানে না এমন ক্রয়কারীর নিকট থেকে বেশি মূল্য আদায় করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আইনের দৃষ্টিতে তা ধোকা, প্রতারণা। এ কাজযে করে ফিকহবিদগণ তার নাম দিয়েছেন ‘আল-মুস্তারসিল’। এ সংক্রান্ত হাদীস হচ্ছে : যে মুসলিমই অপর মুসলিমের নিকট থেকে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা নিল সে তাকে প্রতারিত করলো, সে বড়ই অপরাধী। ‘হিদায়া বুযু পর্ব ও আলমগীরী ৩য় খÐ।’ অপর হাদীসে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী যদি সীমাতিরিক্তমূল্য গ্রহণ করে এ সুযোগে যে, ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত মূল্য জানেনা, তাহলেএই অতিরিক্ত পরিমাণের মূল্য সুদ পর্যয়ে গণ্য হবে। ‘আল-কুরআনের অর্থনীতি, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৯, ইফারা গবেষণা: ও ইফারা প্রকাশনা, এপ্রিল-১৯৯০।’ আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। নবীস. বলেছেন, ‘মানুষের সম্মুখে এমন এক সময় আসবে যখন কোন ব্যক্তি অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে তা হালাল বা হারাম পন্থায় অর্জিত হচ্ছে কি না তা মোটেই চিন্তা করবে না। ‘আল-কুরআনের অর্থনীতি, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৯, ইফাবা গবেষণাঃ ও ইফাবা প্রকাশনা, এপ্রিল-১৯৯০।’ তারা এটি তাফসীর মারাগী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৪ থেকে উদ্ধৃতি করেছেন। এ আয়াতে ‘অন্যায়ভাবে’ বলতে এমন সব পদ্ধতির কথা বুঝানো হয়েছে যা সত্যও ন্যায়নীতি বিরোধী এবং নৈতিক দিক দিয়েও সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা আমাদের সমাজের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে সকল প্রতারণা লক্ষ করি তা অন্যায় এবং আল্লাহর রসুল তা নিষিদ্ধ করেছেন। এতক্ষণ পণ্যের মূল্য নির্ধারণ বা দামনীতির যে আলোচনা করা হলো তার আলোকে নিম্নে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু উদাহরণ পেশ করা হলো :
(ক) বিভিন্ন কল-কারখানাও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমের সঠিক মূল্য দেয়া হয় না। আর্থিক অসচ্ছলতা, কর্মসংস্থানের অভাবও শ্রমের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা নিত্যন্তই অল্প মজুরীতে শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ দেয়। শ্রমিক-কর্মচারীর স্বল্প বেতন দেয়ার ভিত্তিতে অর্জিত আয় এবং প্রতিষ্ঠানের মুনাফায় নিজেরা বিত্ত-বৈভবের পাহাড় গড়ছে। কিনতু শ্রমিক-কর্মচারীরা চিরদিন অবহেলিত মানুষের কাভারেই রয়ে যাচ্ছে। এটি ইসলামী শ্রমনীতিতে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বরং নিরেট পুঁজিবাদী ও সমাজবাদী নীতির ফল।
তাছাড়া বাজার মূল্যের চেয়ে অত্যন্ত নগণ্য বেতনও মজুরীটুকুও সঠিক সময়ে পরিশোধ করা হয় না বরং মাসের পর মাস বাকি পড়ে থাকে।এ ধরনের কোন ব্যবস্থাই ইসলাম সমর্থিত নয়। কারণ শ্রমিকের দেহের ঘাম শুকানোর এগই মজুরী পরিশোধের তাগিদ দিয়েছেন মানবতার বন্ধু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ স.। ইসলামের দামনীতি অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর শ্রমের সঠিক বাজার মূল্য থেকে কম দেয়া অংশটুকু প্রতিষ্ঠানের মালিকদের আয়-উপার্জনকে অবৈধই করে এবং অবশ্যই তিনি সূরা আন নিসার ২৯ নং আয়াতে উল্লেখিত ‘অন্যায়ভাবে’ ও রুসুলুল্লাহ স. এর হাদীসের ‘আত্মসাৎ’ এর অপরাধের আওতাভুক্ত হবেন। কারণ কুরআন-হাদীসে বর্ণিত সুষমবণ্টন নিশ্চিত করণের লক্ষে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকদের শ্রমের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও পরিশোধ করা হয়নি। তাছাড়া এ ধরনের মালিকরা আল্লাহ তাআলার নিম্নলিখিত আয়াতে বর্ণিত ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, ‘লোকদের থেকে নেবার সময় পুরোমাত্রায় নেয় এবং তাদেরকে ওজন করে বা মেপে দেবার সময় কম দেয়। সত্যিই শ্রমিক-কর্মচারীদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেয়ার সময় এরা পুরোমাত্রার চেয়েও বেশি আদায় করে থাকে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার বেলায় তাদের হাত গলদেশে ঝুলিয়ে রাখে। তাছাড়া কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ১৬/১৮ ঘন্টাও বাধ্যতামূলক কাজ করানো হয় যা সমাজবাদীদের বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এগুলোতে ওভার টাইমের মূল্য খুবই কম। এদের কঠিন হৃদয়ের কাছে রসুলুল্লাহ স. এর আরেকটি বাণী পেশ করছি। তিনি বলেছেন,‘তোমাদের সেবকরা তোমাদের ভাই। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা তোমাদের অধীনস্ত করেছেন। সুতরাং আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছেন সে তার ভাইকে যেন তাই খাওয়ায় যা সে নিজেখায়, তাকে তাি পরিধান করায় যা সে নিজে পরিধান করে। আর তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ যেনো তার ওপর না চাপায়। একান্ত যদি চাপানো হয়, তবে সে তা সম্পাদনের তাকে সাহায্য করে। “সহীহ্ বুখারী”। এ হাদীসের আলোকে প্রতিষ্ঠানের অর্জিত আয়ের একটা অংশ শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রাপ্য। এ প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
(খ) বিভিন্ন ইসলামী কো-অপারেটিভ সমিতি স্থানীয় সরকার ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেলা বা থানা পর্যায়ের সমবায় অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে অনেকটা ব্যাংকিং পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বিনা জামানতে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দৈনিক কিস্তি পরিশোধের শর্তেক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রদান করে থাকে। বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ লাভের হার শতকরা ২০% থেকে ২৮%। বিনিয়োগের টাকা দৈনিক কিস্তিতে আদায় করা হলেও লাভের হারে ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতির অনুসরণ করা হয় না। ফলে দৈনিক কিস্তি আদায়ের কারণে এর শতকরা হারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০% থেকে ৫৬%। তাছাড়া দৈনিক আদায়কৃত টাকার সাথে সাথে আবার অন্যত্র বিনিয়োগ করা হয়। ঘর্ণায়মান এ পুঁজির লাভের হার হিসাব করলে এর শতকরা হার ক্ষেত্রবিশেষ দ্বিগুণ বা তার চেয়েও বেশি হবে। এরা ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ/বিনিয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা এবং নিজেদের ঋণ/বিনিয়োগের সহজলভ্যতা, সহজ কিস্তিতে পরিশোধযোগ্যতা ও অশিক্ষিত বা আধাশিক্ষিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গরীব ব্যবসায়ীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। দুর্বলতার জন্য এ সকল ব্যবসায়ী কোনদিন খোঁজ নিয়ে দেখে না বা এ সকল প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের জানায় নাযে, কতটুকু লাভ তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে। যে কোন দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্রয়-বিক্রয় করা বা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতারণার শামিল। এ সম্পর্কিত হাদীস হচ্ছে: যে মুসলিমই অপর মুসলিমের নিকট থেকে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা নিলসে তাকে প্রতারিত করলো, সে বড়ই অপরাধী। সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম। অপর হাদীসে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ী যদি সীমাতিরিক্ত মূল্য গ্রহণ করে এ সুযোগে যে, ক্রেতা পণ্যের প্রকৃত মূল্য জানে না, তাহলে এ অতিরিক্ত মূল্য সুদের পর্যায়ে গণ্য হবে। ‘আল-কুরআনের অর্থনীতি, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৯, ইফারা গবেষণাঃ ও ইফারা প্রকাশনা, এপ্রিল-১৯৯০।’
‘চার ইমাম কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের বেলায় নগদ মূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি গ্রহণ জায়েয বলেছেন। তবে এটিরও একটি সীমা থাকা প্রয়োজন। আর এ ব্যাপারে চার ইমামের শর্ত হলো, ক্রয়-বিক্রয়ের মজলিসেই ক্রেতা ও বিক্রেতাকে চূড়ান্ত ফয়সালা করে নিতে হবে যে, ক্রয়-বিক্রয় নগদ মূল্যে করা হচ্ছে না কি বাকিতে। যাতে মূল্যের বিষয়টি অজ্ঞাত থেকে না যায়। ‘আল-কুরআনের অর্থনীতি, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫৮৯, ইফাবা গবেষণাঃ ও ইফাবা প্রকাশনা, এপ্রিল-১৯৯০।’ তারা এটি তাফসীর মারাগী, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৬৪ থেকে উদ্ধৃতি করেছেন”। ইসলামী ব্যাংকিং এর সাফল্যের কারণে ইদানিং কো-অপারেটিভ সমিতিগুলোকেও ইসলামী নাম দিয়ে লাইসেন্স নিতে দেখা যায় এবং তারাও ইসলামী শরীয়ার আলোকে ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে। সাধারণ কো-অপারেটিভগুলো যেহেতু সুদনির্ভর তাই মানুষকে শোষণ করার জন্য তারা যে কোন কৌশলই অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু ইসলামী কো-অপারেটিভগুলোর ইসলামের মূল্যনীতি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী।
(গ) শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এটির পরিপূর্ণ উন্মেষ ঘটেছে বিগত দুটি সরকারর আমল থেকে। আগেও শেয়ার বেচাকেনা হতো কিন্তু সাধারণের মধ্যে এর এতটা ব্যাপকতা ছিল না। বর্তমানে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এর প্রসার ঘটেছে যে এদের অনেকেই শেয়ার কি জিনিস, এর স্বরূপই বা কি, ইসলামে এর অনুমোদন রয়েছে কিনা, এর কিছুই জানে না। কোম্পানীর শেয়ারকে আরবীতে সাহ্ম বা হাসাস বলা হয়। অর্ধ অংশ। কেউ যদি শেয়ার ক্রয় করে তবে শেয়ার সার্টিফিকেট এ কথার প্রমাণ যে, উক্ত ব্যক্তি এই কোম্পানীর বিশেষ একটি অংশের মালিক। কয়েকজনে মিলে অংশীদারী ব্যবসা করা হয়। কিনতু বড় ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য কয়েকজনের পুঁজি যথেষ্ট নয় বিধায় কোম্পানী গঠন করে বাজারে শেয়ার ছাড়া হয় অর্থাৎ কোম্পানীর অংশীদার হওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়। যারা আহবানে সাড়া দিয়ে শেয়ার ক্রয় করে তারা কোম্পানীর অংশীদার হিসাবে গণ্য হয়। এ অংশীদারগণ তাদের নিজেদের প্রয়োজনে শেয়ার অন্যত্র বিক্রি করতে চায় বিধায় ষ্টক মার্কেট গড়ে উঠেছে। তাছাড়া জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানী নামে শরীকানা ব্যবসার পদ্ধতিও চালু আছে।(চলবে)

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।