Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১০ মাঘ ১৪২৪, ৫ জমাদিউস আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

দাতাদের অর্থ ফেরত দেয়ার তাগিদ

| প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে দুই সেতু নির্মাণ
নাছিম উল আলম : দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুটি মহাসড়কে জনগুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণে তহবিল সংস্থান সহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্নের পরও নির্মাণ কাজ শুরু নিয়ে জটিলতার লেগেই আছে। এসব সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু না হওয়ায় সমাপ্তির বিষয়টিও দীর্ঘ সূত্রীতায় আটকে থাকছে। অথচ চট্টগ্রাম-বরিশাল-মোংলা/খুলনা মহাসড়কের বেকুঠিয়া এবং ঢাকা-ভাংগা-গোপালগঞ্জ-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের কালনাতে প্রস্তাবিত সেতু দুটি নির্মিত হলে তা দেশের ৩টি সমুদ্র বন্দর সহ দুটি প্রধান স্থল বন্দর ছাড়াও রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সহ তিনটি বিভাগের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সহজতর করবে। এসব সেতু নির্মাণে বৈদেশিক আর্থিক সহায়তা চুক্তি সম্পন্ন ছাড়াও ‘উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি’ ইতোমধ্যে একনেক এর অনুমোদনও লাভ করেছে। এরপরও সেতু দুটির নির্মাণ কাজ শুরু নিয়ে ছোট-বড় জটিলতার প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ক্রমশ বিলম্বিত হচ্ছে।
এমনকি চীনা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বেকুঠিয়া সেতু নির্মাণে চ‚ড়ান্ত ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াও মূল নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চ‚ড়ান্ত করা হয়েছে বছরাধীককাল আগে। কিন্তু শুধু মাত্র প্রকল্প এলাকায় ওয়ার্ক সেড নির্মাণের জমি হস্তান্তরে জটিলতার কারণে কাজ শুরু হচ্ছে না। ফলে ইতোমধ্যে চীন সরকার তাদের অনুদান ফেরত দেয়ার জন্যও সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একদফা চিঠি দিয়েছে। সেতুটি নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের জন্য প্রায় ৩০ হেক্টর জমির প্রয়োজন।
কিন্তু প্রকল্পটি সময়মত একনেকের অনুমোদন না মেলায় সরকারী বিধি অনুযায়ী পিরোজপুরের জেলা প্রশাসন জমি হুকুম দখল প্রক্রিয়া শুরুতে বিলম্ব করে। তবে অনেক কাল বিলম্ব করে গত ১৬ অক্টোবর বেকুঠিয়াতে ‘বাংলাদেশ-চীন ৮ম মৈত্রী সেতু’ নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন লাভ করে। প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যায় সাপেক্ষ এ সেতুটি নির্মাণে চীন সরকার প্রায় ৬৪৬ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে। প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারের ব্যায় হচ্ছে প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট-এর ঢাকা সফরকালে সেতুটি নির্মাণে অনুদান সংক্রান্ত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চীন অনুদানে ১ হাজার ৪৯৩ মিটার দীর্ঘ এ মৈত্রী সেতুটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগ সহ দেশের সবগুলো সমুদ্র বন্দরের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনকি এর ফলে চট্টগ্রামের সাথে বরিশাল, খুলনা ও মোংলা ছাড়াও বেনাপোল এবং ভোমড়া স্থল বন্দরের সড়ক পথে দূরত্বও প্রায় অর্ধেক হ্রাস পাবার পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর যানবাহনের চাপও কিছুটা কমবে।
গত অক্টোবরে বেকুঠিয়া সেতু নির্মাণ প্রকল্প প্রস্তাবটি একনেকের অনুমোদনের পরে সড়ক অধিদফ্তর ও পিরোজপুরের জেলা প্রশাসন সেতুটির জন্য জমি হস্তান্তরে জোড়াল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে গতকাল সড়ক অধিদপ্তরের সেতু নকশা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইনকিলাবকে জানান, ‘আমরা খুব দ্রæত সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরুর লক্ষে এগুচ্ছি’। ‘চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানকে যত দ্রæত সম্ভব জমি বুঝিয়ে দেয়ার লক্ষে কাজ চলছে’ বলেও জানান তিনি। তবে ঠিক কবে নাগাদ সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হবে তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও সেতুটির নির্মাণ প্রক্রিয়া এখন চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে বলেও তিনি জানান। তবে বিধি অনুযায়ী সেতটিুর জন্য জমি অধিগ্রহনে আরো কয়েকমাস সময় লাগতে পারে।
এদিকে ঢাকা-ভাংগা-গোপালগঞ্জ-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল মহাড়কের মধমুতি নদীর ওপর ‘কালনা সেতু’ নির্মাণে জাপানী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘জাইকা’ আর্থিক সহায়তা প্রদানের কথা। তবে সেতুটি ৪ লেনে নির্মানের কথা থাকলেও স¤প্রতি তা ছয় লেনে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে সরকারী তরফ থেকে। ফলে দরপত্র গ্রহণের পরেও প্রকল্প ব্যায় বৃদ্ধির বাড়তি অর্থের সংস্থান নিয়ে নতুন জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৭শ’ কোটি টাকার ৪ লেনের সেতুটির প্রকল্প ব্যায় হাজার কোটি টাকায় পেঁ^ৗছতে পারে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে।
তবে ইতোমধ্যে একদফা সময় বৃদ্ধি করে সেতুটির জন্য দরপ্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়েছে। গত ১৮ডিসেম্বর দুই খাম পদ্ধতিতে দুটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে তার কারিগরি মূল্যায়নও শেষ পর্যায়ে বলে জানা গেছে। দুটি প্রতিষ্ঠানই কারিগরি মূল্যায়নে যথাযথ বলে বিবেচিত হয়েছে। খুব শীঘ্রই প্রতিষ্ঠান দুটির আর্থিক প্রস্তাবনা উন্মূক্ত করে তার মূল্যায়ন শেষে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার সম্ভব হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে বলা হয়েছে। তবে ৪ লেন সেতুর জন্য জাপানের সাথে ঋণ চুক্তি হলেও তা ছয় লেনে নির্মাণে যে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হবে সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি এখনো। জাপান উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান-জাইকা’র তরফ থেকে প্রাথমিকভাবে বাড়তি অর্থ প্রাপ্তির মৌখিক আশ্বাস পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। বিষয়টি দুু’দেশের সরকারী পর্যায়ে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অনুমোদনে কতদিন লাগবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফরে কালনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নও অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঝুলে যাবার আশঙ্কা করছেন ওয়াকিবাহাল মহল।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মাসের মধ্যেই প্রকল্পটির দর প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠান হবে। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সরকারী চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিষয়টি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটিতে প্রেরণের আগে তহবিলের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র।
ঢাকা-ভাংগা-গোপালগঞ্জ-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল মহাড়কের কালনা’তে মধমুতি নদীর ওপর সেতুটির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেতুটির ডিপিপি আরো বছর দেড়ক আগে একনেক-এর চ‚ড়ান্ত অনুমোদনও লাভ করে। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এবং তাদের কাছ থেকে নকশা ও টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরী সহ তা অনুমোদনেই প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। উপরন্তু সেতুটির জন্য যে প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মান করতে হবে তার জমি হুকুম দখল প্রক্রিয়াও এখনো চ‚ড়ান্ত হয়নি।
এর সাথে ৪ লেনের স্থলে ছয় লেনে নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ কবে শুরু করা সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি সড়ক অধিদফ্তরের দায়িত্বশীল মহল। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলের মতে, ‘যতদ্রæত সম্ভব সেতুটি নির্মাণ কাজ শুরুর লক্ষে চেষ্টা চলছে’।
কালনা সেতুটি নির্মিত হলে শুধু রাজধানীর সাথে যশোর ও বেনাপোলেরই সহজ ও দ্রæত সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে না, এ সেতুটি ব্যাবহার করে বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে যশোর ও বেনাপোলের দূরত্বও হ্রাস পাবে প্রায় ৫০ কিলোমিটার।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।