Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১০ মাঘ ১৪২৪, ৫ জমাদিউস আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

ইউপিডিএফ’র বিভক্তির জের শীর্ষ নেতা মিঠুন চাকমা প্রকাশ্যে খুন

দিদারুল আলম রাজু, খাগড়াছড়ি থেকে | প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)’র আনুষ্ঠানিক বিভক্তির পর নিজেদের মধ্যকার প্রথম হত্যাকান্ডের শিকার হলেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতা মিঠুন চাকমা। গতকাল বুধবার দুপুরে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের সুইস গেইট এলাকায় নিজ দলের বিদ্রোহীদের গুলিতে খুন হন তিনি। প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ’র অন্যতম একজন সংগঠক ছিলেন মিঠুন চাকমা। দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন ইউপিডিএফ’র সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও যুব সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবেও।
পরিবারিক সূত্র জানায়, গতকাল বুধবার সকালে মামলার হাজিরা দিতে আদালতে যান মিঠুন চাকমা। আদালত থেকে ফিরে শহরের গোলাবাড়ি এলাকায় বাসার গেইটের সামনে তার ছোট ভাইয়ের সাথে দাড়িয়ে কথা বলছিলেন। এসময় দুটি মোটরসাইকেলে করে অস্ত্রধারী কয়েকজন জোরপূর্বক মিঠুন চাকমাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে কিছু দূরে গুলি করে তাকে ফেলে রেখে যায় সন্ত্রাসীরা।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো. আব্দুল হান্নান জানান, দুটি পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে গোলাগুলির সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিঠুন চাকমাকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাসাপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তার।
এদিকে এ ঘটনায় নিজ দলের বিদ্রোহীদের দায়ী করেছেন ইউপিডিএফ’র সাধারণ সম্পাদক রবি শংকর চাকমা। হত্যাকান্ডের পর গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, নব্য মুখোশ বাহিনী কর্তৃক ইউপিডএফ সংগঠক মিঠুন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে রাঙামাটিতে দুই ইউপিডিএফ কর্মী ও সমর্থককে খুনের পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিহ্নিত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় খুনীরা খোদ খাগড়াছড়ি শহরে খুন করার দুঃসাহস পাচ্ছে।’
প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ১৯ বছর পর সদ্য বিদায়ী বছরের ১৫-ই নভেম্বর দু’ভাগে বিভক্ত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ। ওই দিন সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউপিডিএফ’র বিভক্তির খবর প্রকাশ পায়। জেলা সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে ইউপিডিএফ’র সংস্কার গ্রুপের সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রসিত বিকাশ খীসা ও সঞ্জয় চাকমার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালের ২৬-শে ডিসেম্বর আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। কিন্তু বর্তমানে ইউপিডিএফ’র আন্দোলন পরিচালনার কৌশল ও পদ্ধতি সঠিক না হওয়ার কারণে ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা সঞ্জয় চাকমা ও দীপ্তি শংকরসহ অনেকে দল ত্যাগ করেছে। এছাড়া দল ত্যাগ করার অপরাধে অনেক নেতাকর্মীকে খুন করেছে প্রসিত খীসার সন্ত্রাসী বাহিনী।
এছাড়া আরও অভিযোগ করা হয়, গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, বলপ্রয়োগের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি করছে প্রসিত খীসা। প্রসিত খীসা মুখে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধের কথা বললেও এ পর্যন্ত দশজনের অধিক দলীয় নেতাকর্মীকেও হত্যা করা হয়েছে। ইউপিডিএফ’র অনেক নেতা এখন পকেট ভারী নেতা হিসেবে পরিচিত হয়েছে। মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হয়ে প্রসিত খীসার ইউপিডিএফ এখন নীতিহীন, আদর্শহীন, লক্ষ্যভ্রষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। আর এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীদের আর্থিকদন্ড ও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করছে তারা।
ইউপিডিএফ’র এই বিভক্তির মধ্য দিয়ে নয়া মেরুকরণ ঘটে পাহাড়ের রাজনীতিতে। এর আগে ২০১০ সালের এপ্রিলে বিভক্ত হয় সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। জেএসএস’র কেন্দ্রীয় অপর শীর্ষ নেতা সুধাসিন্দু খীসার নেতৃত্বে গঠিত হয় জেএসএস (সংস্কার/এমএন লারমা গ্রুপ)। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের আগে তৎকালীন গেরিলা বাহিনী (শান্তিবাহিনী) প্রধান ও বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ছিলো পাহাড়িদের একক সংগঠন। সেই সময়ে ইউপিডিএফ’র প্রতিষ্ঠাতা প্রসিত বিকাশ খীসা ছিলেন সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জেএসএস’র সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি। ১৯৯৭ সালের ২-রা ডিসেম্বর সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করে জনসংহতি সমিতি। এরপরই প্রসিত খীসার সাথে সন্তু লারমার বিরোধ শুরু হয়। আর সেই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় ১৯৯৮ সালের ১০-ই ফেব্রুয়ারী। পার্বত্য চুক্তির শর্তানুযায়ী ওই দিন গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিকভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনীর সশন্ত্র সদস্যরা। আর তখনই খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে শত শত কালো পতাকা উত্তোলন করে অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানকে ধিক্কার জানায়, বিক্ষোভ করে প্রসিত খীসার অনুসারীরা। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬-শে ডিসেম্বর রাজধানীতে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জেএসএস ভেঙ্গে ইউপিডিএফ’র জন্ম দেয় প্রসিত বিকাশ খীসা। ¯েøাগান দেয়, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্ত¡শাসন চাই’।

এদিকে ইউপিডিএফ’র সংস্কার গ্রুপকে ‘নব্য মুখোশ বাহিনী’ আখ্যা দিয়ে এর প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে সড়ক অবরোধও পালন করেছিলো প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। মূলত, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবকটি আঞ্চলিকদলই পরষ্পরবিরোধী, হিংসাকাতর। সুযোগ পেলেই এক পক্ষ অন্য পক্ষের উপর হামলা চালাচ্ছে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে এ যাবৎ প্রাণ হারিয়েছে সাত শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর