Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১১ মাঘ ১৪২৪, ৬ জমাদিউস আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

বালুতে বিশাল সম্ভাবনা

শফিউল আলম | প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

বঙ্গোপসাগরের সৈকত থেকে খনিজ ভারী বালু উত্তোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। ১৯৭৫ সালে কক্সবাজারের কলাতলীতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষায়িত একটি কেন্দ্র স্থাপনের পর এবার দীর্ঘ ৪৩ বছর পর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ও ব্যাপকভাবে সৈকতের খনিজ তেজষ্ক্রিয় ভারী বালু, মাটি ও পাথর উত্তোলনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের সৈকত খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্র সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুসন্ধান ও আহরণ কাজে নিয়োজিত আছে। কমিশনের বিজ্ঞানীদের এ যাবৎ চার দশকের গবেষণা ও অনুসন্ধানে ১৭টি ভারী খনিজ স্তুপের আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। হরেক খনিজ দ্রব্যের বিস্তৃতি, মজুদ এবং গুনগত মানও নির্ণয় করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের জন্য ব্যাপকভাবে সম্ভাবনাময় হিসেবে যেসব সৈকত ভারী ও তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু চিহ্নিত করেছেন তার মধ্যে রয়েছে- ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন এবং রুটাইল। তাছাড়া আছে টাইটানিয়াম, লিউকক্সিন, কেনাইট ও মোনাজাইট। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের সমুদ্র উপকূল থেকে বিক্রি সম্ভব হবে বার্ষিক কয়েক হাজার কোটি টাকার তেজষ্ক্রিয় ভারী বালুসহ এ ধরনের দ্রব্য। যা বর্তমানে বলতে গেলে ফেলনা এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। উচ্চ তেজষ্ক্রিয় (হাইলি রেডিয়েটেড) ও ভারী খনিজ বালু উত্তোলনের সময় যাতে কোনো ধরনের জনস্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব না পড়তে পারে এরজন্য পরমাণু বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞ-প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রাক-প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের ধারক বাংলাদেশ। আর তার বেশিরভাগ অংশ রয়েছে দেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে কক্সবাজারে। আর সেই নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘতম সৈকত বেলাভূমি ধারণ করে আছে লাখ কোটি টাকা মূল্যের হরের ধরনের ভারী, তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু। যা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। সারা বিশ্বে এসব পদার্থের উন্নতি-অগ্রগতির পথে ইতিবাচক ব্যবহারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অবশেষে বাংলাদেশও বিলম্বে হলেও এসব ভারী খনিজ বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলন করে বিদেশে রফতানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এর অর্থনৈতিক সদ্ব্যব্যহারই মূল উদ্দেশ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায় , বিভিন্ন বিচিত্র ধরনের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদরাশির ধারক সুবিশাল বঙ্গোপসাগর। এই সম্পদরাজির আর্থিক মূল্য লাখ লাখ কোটি টাকা। তেল ও গ্যাস, অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প ছাড়াও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূলে লাখ কোটি টাকা মূল্যের খনিজ ও তেজষ্ক্রিয় ভারী বালু বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা সম্ভব বলে জোরালো আশাবাদী পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। সৈকতজুড়ে মজুদ খনিজ ভারী তেজষ্ক্রিয় বালুর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক টাইটানিয়াম, ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, মেগনেটাইট, লিউকক্সিন, কেনাইট, গারনেট ও মোনাজাইটের মজুদ রয়েছে বেশি কক্সবাজারের সৈকতে। তাছাড়া কুয়াকাটা, খুলনার সমুদ্র সৈকত ও উপকূলভাগে এ ধরনের খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, এককভাবে কক্সবাজারেই বার্ষিক ১ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেজষ্ক্রিয় ভারী খনিজ বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলন করা সম্ভব। যার একাংশ দেশের শিল্প-কারখানায় কাজে লাগিয়ে বিদেশেও রফতানি হতে পারে। এর বাজার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। খনিজ সম্পদরাশির এই হাতছানি দেশের জনগণের অর্থনৈতিক ভাগ্যের চাকা বদলে দিতে পারে। বঙ্গোপসাগরের সর্বমোট আয়তন ২২ লাখ ৫২ হাজার বর্গ কিলোমিটার। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত এবং বাংলাদেশের জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত আইন-বিধিমাফিক ২শ’ নটিক্যাল মাইল সাগরের সামনের দিকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বাংলাদেশের একান্ত অর্থনৈতিক পানিসীমায় (ইইজেড) অধিকার স্বীকৃত বা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সেই সাথে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ-শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ থেকে খুলনার দুবলার চর পর্যন্ত সমুদ্র তটরেখা বরাবর সমৃদ্ধ রয়েছে ভারী খনিজ বালু, মাটি, পাথরসহ হরেক মূল্যবান পদার্থের রাশি রাশি মজুদের ফলে।
চার দশকে পরমাণু শক্তি কমিশনের বিভিন্ন স্থানে নিবিড় গবেষণায় জানা গেছে, দেশের সমুদ্র সৈকতে অনেক ধরণের খনিজ সম্পদ লুকায়িত রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম হচ্ছে খনিজ, তেজষ্ক্রিয় ভারী বালুর মতো অনাহরিত বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক সম্পদ। কক্সবাজারে বছরে ১.৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেজষ্ক্রিয় ভারী খনিজ বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আহরণ এবং বিদেশে রফতানি করে বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকা মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ নিশ্চিত হতে পারে। কক্সবাজারে ১২৭ কিলোমিটার ব্যাপী সুপরিসর সৈকত নিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। তাছাড়াও সমগ্র বেলাভূমি জুড়ে মূল্যবান খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় পদার্থসমৃদ্ধ খনিজ বালুর ব্যাপক মজুদ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা এবং ঐকান্তিক আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কক্সবাজারে একটি অপারেশনাল স্টেশন স্থাপন করা হয়। এর উদ্যোগে পাইলট প্রকল্পভিত্তিক স্থান বাছাই করে সেখানে গবেষণার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক উত্তোলন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ’৭০-এর দশক থেকে এ কার্যক্রম চলছে। তবে তা সম্ভাবনার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। এর সূচনায় পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানী মরহুম ড. এম ওয়াজেদ মিঞার প্রায়াস ও অবদান রয়েছে।
সমুদ্র সৈকত ও উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই খনিজ ও তেজষ্ক্রিয় ভারী বালুর আর্থিক মূল্য কয়েক লাখ কোটি টাকা হতে পারে বলে বিজ্ঞানী ও গবেষকদের জোরালো ধারণা। পরমাণু শক্তি কমিশন বাজেট ও লোকবলসহ অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে এর সুষ্ঠু আহরণ এবং গবেষণা প্রক্রিয়া ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পুরোদমে কাজে লাগাতে সক্ষম হচ্ছে না। খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় ভারী বালুর মতো অনাহরিত বিপুল পরিমাণ সমুদ্র সম্পদ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারে। কমিশনের বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের শহর থেকে টেকনাফ বিস্তৃত সৈকতে বালুর সাথে গড়ে ২৩ শতাংশ হারে ১৭ ধরণের তেজষ্ক্রিয় পদার্থসমৃদ্ধ ভারী খনিজ বালু মজুদ রয়েছে। যার প্রাথমিক পরিমাণ শনাক্ত করা হয়েছে ৪.৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এটি বিশাল এক অর্থনৈতিক সম্পদের ধারক। এখানকার খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালু আহরণ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বিবেচিত হবে। এসব খনিজ মূল্যবান ভারী বালু কক্সবাজারের নাজিরার টেক থেকে টেকনাফ ছাড়াও কুয়াকাটা, খুলনায়ও সমুদ্র সৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কক্সবাজার জেলায় কমপক্ষে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে এসব মূল্যবান ভারী খনিজ বালুর মজুদ রয়েছে।
এদিকে এয়ারক্রাফট নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে সৈকতের ভারী খনিজ বালুর বিশ্বব্যাপী ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্রমাগত চাহিদা বাড়ছে। পরমাণু শক্তি কমিশনের এসব কাজে দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও পর্যাপ্ত জনবল, কারিগরি সক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। তেজষ্ক্রিয় পদার্থমিশ্রিত বালু আহরণ করা না হলে যেসব এলাকায় খনিজ ভারী বালু মাত্রাতিরিক্ত মজুদ অরক্ষিত পড়ে আছে সেখানকার বাসিন্দাদের মাঝে উচ্চ তেজষ্ক্রিয়তাজনিত এবং অত্যধিক মাত্রায় তেজষ্ক্রিয়তাদুষ্ট (রেডিয়েশনজনিত) বিভিন্ন রোগব্যাধি দেখা দিতে পারে এমনটি আশংকাও করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এর পরিপ্রেক্ষিতেও বাংলাদেশের সৈকত খনিজ ভারী বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আহরণ, সদ্ব্যবহার ও রফতানি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরমাণু শক্তি কমিশনের বিশেষজ্ঞরা সৈকতে ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালুর পরিবেশ, পানি, বাতাস, মাটিতে এবং জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিয়মিত মাঠ জরিপ পরিচালনা করছেন।

 


Show all comments
  • এনায়েত ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১:১২ এএম says : 0
    এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • তানবীর ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ৪:১০ পিএম says : 0
    এখানে কোন বিদেশী সংস্থা ও দুর্নীতি পরায়ণ সংস্থাকে সংযুক্ত করা যাবে না।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর