Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮, ৮ কার্তিক ১৪২৫, ১২ সফর ১৪৪০ হিজরী

অবশেষে গেজেট গ্রহণ করেছেন আপিল বিভাগ

বিচারকদের চাকরিবিধি

| প্রকাশের সময় : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

প্রতিটিক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের প্রাধান্য রয়েছে -আদালত
স্টাফ রিপোর্টার : নিন্ম আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা ও আচরণ বিধি গেজেট অবেশেষে গ্রহণ করে নিয়েছে আপিল বিভাগ। গতকাল বুধবার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ গেজেটটি গ্রহণ করে আদেশ দেয়। এসময় আদালত বলেছেন, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সেক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে। সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া গভর্নমেন্ট কিছুই করতে পারবে না। এভরি স্টেপ সুপ্রিম কোর্ট মাস্ট বি কনসার্ন। অনুসন্ধান শুরুই হবে না সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ ছাড়া। আদেশে বলা হয়, বিধিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রাইমেসি বজায় রাখা হয়েছে। আমরা এই বিধিমালা গ্রহণ করছি।
গত ১১ ডিসেম্বর সরকার বিচারকদের চাকরিবিধির ওই গেজেট প্রকাশ করে। পরে তা এফিডেভিট আকারে আপিল বিভাগে জমা দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। গতবছর ৩০ জুলাই তা গ্রহণ না করে কয়েকটি শব্দ ও বিধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মদ্য পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। মামলাটি শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আপলি বিভাগের মধ্যে তীব্র বাকবিতন্ডর সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে আইন মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বধীন আপিল বিভাগ আলোচনায়ও বসতে চেয়েছিলেন। তবে আইনমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে না যাওয়ার আর বসা হয়নি। পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়। এরপর তিনি ছুটি নিয়ে বিদেশ যান। পরবর্তীতে তিনি বিদেশ থেকে পত্রযোগে পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন। মোট ৮৪ কার্যদিবস শুনানির পর চাকরিবিধির বিষয়টি নিষ্পত্তির পর্যায়ে এল। আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হয়। এসময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন, অ্যাটনি জেনারেল মাহবুবে আলম। মাসদার হোসেন মামলার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম। শুরুতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আদালত চাকরি সংক্রান্ত শৃঙ্খলার বিধিমালা গেজেট আকারে জারির নির্দেশ দিয়েছিলেন। গত ১১ ডিসেম্বর সেটা জারি করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, আমাদের আরো একটি আবেদন আছে। ২০১৬ সালের ২৮ আগষ্ট এ আদালত যে আদেশ দিয়েছিলেন সেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদের প্রেসিডেন্ট বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। আমরা সেটা প্রত্যাহার চাচ্ছি।
এসময় আদালত বলেন, সেটা করা যাবে। আগে গেজেটের বিধিগুলো পড়–ন। এসময় অ্যাটর্নি জেনারেল বিধিমালা পড়তে গেলে মাসদার হোসেন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ব্যারিষ্টার এম আমীর-উল ইসলাম ডায়াসে দাঁড়ান। তিনি বলেন, বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ আবেদন করবো। এ বিষয়ে আমার একটি লিখিত বক্তব্য রয়েছে। সেটা দেখুন। সেটা নিষ্পত্তি করুন।
তখন আদালত বলেন, আগে যতবার রুল হয়েছে, সব আপিল বিভাগে সাবমিট করা হয়েছে। ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম বলেন, রুল তো হয়েছে ১৩৩ এ কর্মবিভাগের জন্য। আদালত বলেন, একবার রুল হলে তা চেঞ্জ করা যাবে না তা তো না। আমীর উল ইসলাম বলেন, আমি তো বিচার বিভাগের লোক। কিন্ত এটা তো কর্ম বিভাগে নিয়ে নেয়া হয়েছে। আমার সাবমিশন নিষ্পত্তি করেন। আদালত বলেন, বলা হচ্ছে, আমরা সব দিয়ে দিয়েছি। কোথায় নিয়ে নেয়া হয়েছে, দেখান আপনি। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিধিমালার গেজেট থেকে পড়তে বলেন আদালত। অ্যাটর্নি জেনারেল পড়তে থাকেন। বিধি পড়ার সময় আদালত বলেন, সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ গ্রহণ না করিয়া- আগে ছিল না এটা। আদালত বলেন, দেখুন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জায়গায় সুপ্রিম কোর্টের নাম ঢুকিয়েছি। আগে সুপ্রিম কোর্টের নাম ছিল না। সবখানে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া অনুসন্ধান করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া সরকার কিছুই করতে পারবে না। অথচ পত্রিকায় লিখে দিয়েছে, সব নিয়ে নিয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বিধি ২৯ পড়ার সময় আদালত বলেন, জোরে পড়েন। না পড়ে আন্দাজে লিখে ফেলে। আমরা পাঁচজন বিচারপতি কি এতই বোকা? আমরা কি নবিশ? প্রত্যেকেই আপিল বিভাগের বিচারপতি। অথচ কথা হচ্ছে, আমরা শেষ করে ফেলেছি।
এ পর্যায়ে আদালত ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলামকে বলেন, মিস্টার ইসলাম রুলস পড়ে শোনালাম। এর বেশি আমরা পারি না। আপনার কিছু বলার আছে? তখন ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম বলেন, সুপ্রিম কোর্ট অ্যাপ্রুভ করার পর আমার কী বলার থাকে?
তখন আদালত আবার বলেন, বাইরে বলা হচ্ছে, গেল গেল সব গেল। আমরা আপিল বিভাগের পাঁচজন লোক। সব দিয়ে দিলাম আমরা? এরপর আদালত বিচারক শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট গ্রহণ করে আদেশ দেন।
আদালত আদেশে বলেন, এই গেজেট আমরা পড়েছি। বিধিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রাইমেসি বজায় রাখা হয়েছে। আমরা এই বিধিমালা গ্রহণ করছি। বিধি হয়ে গেছে। একারণে পর্যবেক্ষণ এখন অকার্যকর বলে প্রত্যাহার করা হলো। একটা সময়ের জন্য (ফর দ্যা টাইম বিং) বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হলো।
রাষ্টপক্ষের কৌশলীর বক্তব্য; অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এতদিন অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরি থেকে অপসারণ বা অন্যান্য শৃঙ্খলা বিধানের জন্য কোন আলাদা বিধি ছিল সেগুলি ছিল না। এখন আমরা আলাদা শৃঙ্খলাবিধির গেজেট করে তা আদালতে দাখিল করি। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে সেটা গ্রহণ করেছেন। আজকে থেকে এটা কার্যকর হবে।অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘গেজেট জারির পর অনেকেই নানা রকম কলাম লিখছেন বা টক- শোতে বলছেন সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব হয়ে গেছে এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। এই রুলসটা পড়লেই বোঝা যাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শে বিধান রাখা হয়েছে।
মাসদার হোসের মামলার আইনজীবী: ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম বলেন, শৃঙ্খলাবিধিটা সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। যেটা কর্ম বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। এ বিষয় চ্যালেঞ্জ করে রিট করার ইচ্ছা ছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেটা অনুমোদন করার কারণে সেটা আর সম্ভব হবে না। মাসদার হোসেন মামলার চূড়ান্ত শুনানি করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে আলাদা করতে ঐতিহাসিক এক রায় দেয়। একইসঙ্গে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে স্বতন্ত্র সার্ভিস ঘোষণা করা হয়। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেয় সর্বোচ্চ আদালত। গেজেট খসড়া নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনার মুখে বিচারপতি সিনহা ছুটি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর দেশ ছাড়ার পর ছুটি শেষে ১০ নভেম্বর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। এরপর গত ১৬ নভেম্বর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ওই খসড়া নিয়ে মতপার্থক্য দূর হয়েছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর