Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৪ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

জাহাজ নির্মাণের সোনালি অতীত কারিগরি বুদ্ধি অবকাঠামো প্রস্তুত

| প্রকাশের সময় : ৮ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

শফিউল আলম : ভাটির দেশ বাংলাদেশ। আয়তনে ছোট হলেও ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে অতুলনীয় সৌভাগ্যের ঠিকানা। বিশাল ভাটি অঞ্চলসহ বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল ধারণ করে আছে অফুরান সম্পদরাজি এবং অযুত সম্ভাবনা। ৪-৫শ’ থেকে এক হাজার বছর পূর্বে এই বিরাট অঞ্চলের মানুষজন বহুমুখী কর্মকান্ডে ছিল সদাব্যস্ত। হরেক কর্মক্ষেত্রের মাঝে শীর্ষে ছিল যাবতীয় জাহাজ-নৌযান নির্মাণ শিল্প। ছিল জাহাজের মেরামত খাত। স্থানীয় জনগণই জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত কর্মকান্ডে অতুলনীয় দক্ষতা ও নৈপূন্যের পরিচয় দেন। সাগর নদ-নদী অববাহিকা ও উপকূলের নিপূণ কারিগরিদের সুনাম সেকালে ছড়িয়ে পড়ে সুদূর রাবাত থেকে জাকার্তা, রাশিয়া থেকে বিলাত, পর্তুগালসহ সারা পৃথিবীতে। এদেশের সমুদ্র উপকূলের ইয়ার্ডগুলোতে নির্মিত জাহাজবহর পৃথিবীর এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে ভেসেছে, ফেলেছে নোঙর। এমনকি এদেশের ইয়ার্ড থেকে সাড়ে ৫শ’ বছর পূর্বে যুদ্ধজাহাজও নির্মিত হয়েছে ইউরোপের দেশের জন্য। জাহাজ-নৌযান নির্মাণ ও মেরামত শিল্পখাতের সেই সোনালী অতীত আজও মুছে যায়নি। তবে অতীতের সেই সমৃদ্ধি হারিয়ে গেছে। গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায় কোনমতে ঠাঁই করে টিকে আছে। বিশেষত বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের হরেক শিল্প-বাণিজ্যের মাঝে আজ শিপবিল্ডিং বা জাহাজ-নির্মাণ শিল্প অতীতের সেই গৌরবের ধারা থেকে যেখানে বহুগুণে এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেক পেছনে পড়ে আছে। অথচ সমৃদ্ধ অতীতকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে পুরোপুরি অনুকূলে। শুধুই দরকার সমন্বিত ও বলিষ্ঠ মহাপরিকল্পনা। মিশন আর ভিশন।
হাজার বছর পূর্বে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর এলাকা, পতেঙ্গা, হালিশহর, কাট্টলী, সীতাকুন্ড, স›দ্বীপ, গহিরা, কক্সবাজার, নোয়াখালীর হাতিয়া, রামগতি, চর আলেকজান্ডার, জাহাজমারা, ভোলা, বাকেরগঞ্জে স্থাপিত হয় অনেকগুলো জাহাজ-লঞ্চ-নৌযান নির্মাণ কারখানা। পরবর্তী সময়ে ঢাকা-নারায়নগঞ্জের কাছে বুড়িগঙ্গা, মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার অববাহিকায় গড়ে উঠে অসংখ্য জাহাজনির্মাণ ইয়ার্ড, ডক ইয়ার্ড ও স্লিপওয়ে। সমুদ্রগামী জাহাজ, ট্যাংকার, লাইটার, কার্গো, নৌযান, বার্জ, স্টীমার, ট্রলার নির্মাণের কাজে নিয়োজিত কারিগর ও শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্যে রাতদিন জমজমাট ছিল সেসব জাহাজনির্মাণ ইয়ার্ড। জাহাজনির্মাণ ও মেরামতের হরেক ধরনের কাজে সম্পৃক্ত হাজার হাজার কর্মঠ, সুদক্ষ, অর্ধদক্ষ নির্মাণ শ্রমিকের প্রতিটি পরিবার আর্থিক স্বচ্ছলতায় ছিল ভরপুর। এই শিল্পখাতের সুবাদে দেশের বাজারে এবং বিদেশে রফতানি বাবদ বিপুল অঙ্কের আয় এসেছে। তবে শাসকমহলের উদাসীনতায় এবং ব্রিফকেস সর্বস্ব ট্রেড ব্যবসা ও অন্যান্য কারণে কালক্রমে জাহাজনির্মাণ ও মেরামত শিল্পকে মন্দা গ্রাস করে। ধীরে ধীরে প্রায় বিলুপ্ত হতে থাকে। জাহাজনির্মাণ শিল্পের হারিয়ে যাওয়া সোনালী অতীত পুনরুদ্ধারের জন্য গত একশ’ বছরে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।
জাহাজ-নৌযান নির্মাণ ও মেরামত শিল্প শুধুই নয়। অতীতে জাহাজ ও স্টীমারে মাস্টার, সারেং, ইঞ্জিনিয়ার, কারিগর, নাবিক ও শ্রমিকের চাকরি ছিল অতি লোভনীয়। কেননা জাহাজে বিভিন্ন পদে চাকরির ভাল বেতনের সুবাদে জাহাজী পরিবারগুলোর আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। স›দ্বীপ, হাতিয়া, পতেঙ্গা, আনোয়ারা, নোয়াখালীর উপকূল ও অববাহিকা এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ‘জাহাজী’ লোকজন ছিলেন। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনা, নারায়নগঞ্জ এলাকায় এককালে জাহাজের চাকরিকে বলা হতো ‘রাজার হালের চাকরি’। দেশীয় জাহাজে ছাড়াও এদেশের দক্ষ, সৎ ও কর্মঠ কাপ্তান, মাস্টার, কারিগর ও নাবিকরা বিদেশের বিভিন্ন নামীদামী শিপিং কোম্পানিতে যথেষ্ট সুনামের সাথে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে দেশের অনেক লোকজন বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সন্ধান পেতেন। বিপুল সংখ্যক লোকজনের বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত ছিল। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো। এ প্রেক্ষাপটে একদা শিপিং সেক্টরে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে।
দেশ-দেশান্তরে পণ্যসামগ্রী পরিবহনে শিপিং খাতই প্রধান মাধ্যম। শিপিং সার্কেলকে ঘিরে শিল্প-বাণিজ্যিক কর্মকান্ডকে বিশ্বের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাপী জাহাজের চাহিদা প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। মানসম্মত ও নিরাপদ কাঠামো নিশ্চিত করে নির্মিত জাহাজের কদর সবসময়ই বেশি। পণ্যবাহী সমুদ্রগামী মার্চেন্ট জাহাজ, কার্গোজাহাজ, বার্জ, ট্যাংকার, ট্রলার, কোস্টার, টাগ, যাত্রীবাহী স্টীমার, প্রমোদতরী, পেট্রোল ভেসেল এমনকি যুদ্ধ জাহাজসহ বিভিন্ন ধরনের জাহাজের চাহিদা অনুযায়ী শিপিং কোম্পানীর মালিকরা তাদের পছন্দসই বাজার থেকে জাহাজ সংগ্রহ করে থাকে। প্রতিটি জাহাজ ৩০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত যাতে সচল থাকে। সাগর-মহাসাগরের বুকে যে কোনো প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করে পাড়ি দিতে সক্ষম- এমন কারিগরি প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন কাঠামো বিন্যাস করে নির্মিত জাহাজের চাহিদা রয়েছে। এরজন্য যথাযথ মানের জাহাজ কিনতে গিয়ে অকাতরে বড়সড় অঙ্কের বাজেট থেকে অর্থব্যয় করে থাকে বিশ্বের খ্যাতনামা জাহাজ বা শিপিং কোম্পানির ক্রেতা ও ব্রোকারগণ।
সওদাগরী পালের নৌযান ও জাহাজ থেকে বাস্পীয় (স্টীম) ইঞ্জিন হয়ে জ্বালানি তেল গ্যাস চালিত এমনকি অতিস¤প্রতি সৌরশক্তি-চালিত জাহাজের ধাপে ধাপে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটেছে কালের বিবর্তনের পথরেখা ধরে। বাংলাদেশে জাহাজনির্মাণ শিল্পের পুরনো অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ দীর্ঘকাল বন্ধ থাকায় শিপবিল্ডিং খাত মূল ধারার শিল্প-বাণিজ্য-কর্মসংস্থানের অপার সুযোগ-সম্ভাবনা থেকে ছিটকে পড়েছে। তবে জাহাজনির্মাণ শিল্পখাত অতীত সমৃদ্ধির ধারায় ফিরে আসতে পারবে না তা কিন্তু নয়। কারণ এই খাতের উপযোগিতা প্রশ্নে প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ও অবকাঠামো সুবিধাসমূহ। দেশে বিশাল সমুদ্র উপকূল, নদী অববাহিকা, খাঁড়ি উন্মুক্ত রয়েছে। যেখানে সুদূর অতীতেও গড়ে উঠেছিল শতাধিক শিপবিল্ডিং ইয়ার্ড। স›দ্বীপ, হাতিয়া, চট্টগ্রামে পালের জাহাজ এমনকি কলের জাহাজও নির্মিত হতো। ইউরোপ, আরব, পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সুদক্ষ কারিগরদের সাথে জাহাজনির্মাণ ইয়ার্ডে একযোগে কাজ শেখার সুযোগ লাভ করেন এদেশীয় কারিগররা। ফলে তারা বিস্ময়কর দক্ষতা, জ্ঞানবুদ্ধি ও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন।
তবে জাহাজ-নৌযান শিল্পে সরকারের সুষ্ঠু ও সহায়ক নীতিমালা ও প্রণোদনার অভাবে থমকে যায় অগ্রযাত্রা। ধরে রাখা যায়নি সাফল্য। তাছাড়া বাংলাদেশের জাহাজী প্রকৌশলী, কারিগর, নাবিকরাও তাদের কর্মক্ষেত্রে মন্দা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়েন। মেধা, দক্ষতা, পরিশ্রম দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সদিচ্ছাকে তারা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। অনেকেই পাড়ি জমান বিদেশে। সেখানে উচ্চ বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় আকর্ষণীয় চাকরি পান। তাদের অধিকাংশই শ্রমনিষ্ঠা ও সফলতার বিনিময়ে এদেশের জন্য সুনাম বয়ে আনেন। ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরের মতো বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের মেরিন প্রকৌশলীরা জাহাজনির্মাণ ইয়ার্ডে অতুলনীয় সাফল্যের প্রমাণ রেখে আসছেন। অথচ দেশে সেই সুযোগ তারা পাননি। এদেশে হাজার বছর পূর্বে জাহাজ-নৌযান নির্মাণ শিল্পের সোনালী অতীত অমলিন। আছে এই খাতে বাংলাদেশীদের কারিগরি জ্ঞান-বুদ্ধি-বিচক্ষণতা। রয়েছে প্রকৃতির অপার দান অবকাঠামো সুবিধা। সবকিছু কাজে লাগিয়ে অতীতকে সাবলীলভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব এমনটি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট শিপিং বিশেষজ্ঞরা



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: জাহাজ


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ