Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮, ৫ শ্রাবণ ১৪২৫, ৬ যিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী

স্পট রিপোর্ট : ঠিকানা ওদের কমলাপুর স্টেশন

প্রকাশের সময় : ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১২:০৫ এএম, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮

স্টালিন সরকার : গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা ১টা ছুঁই ছুঁই। তীব্র শীতে কিশোর হাসান প্ল্যাটফর্মের এক কোনায় বসে আছে জবুথবু হয়ে। পাতলা জামা গায়ে দুই হাত সামনে এনে থর থর কাঁপছে। ওর পায়ের সামনে পুঁটলি। দু’ চোখে রাজ্যের ঘুম। কোথায় ঘুমাবে হাসান? কমলাপুর স্টেশনের বাইরের লম্বা টিনশেডের ফুটপাথই ওর বিছানা। ধুলোবালি সরিয়ে কোনোরকমে হাত গুটিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘাড় কাৎ করে বসে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। প্রচÐ ঠাÐায় পাশে দু’জন চলে গেছে ঘুমরাজ্যে। অনতিদূরে কোনোরকমে একটা ছেঁড়া চাদর গায়ে জড়িয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে অদ্ভুত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে আরো দু’জন। হঠাৎ একজন হাজির; নাম জহির। অল্পবয়সী ছেলে। মাথায় মাফলার। গায়ে ছেঁড়া চাদর। দেখলেই বোঝা যায় ডানপিটে; ঘুমকাতুরে দু’চোখ। ‘ওই সর, এই হানে আমি ঘুমামু? কীরে, হুনোছ না? হুনতাছি তো! সরমুনা!! দূরে ঘুমা!!! না, নিত্য আমি এইহানে ঘুমাই? প্রচÐ শীতের মধ্যে দুই কিশোরের কথা কাটাকাটির পর ধস্তাধস্তিতে জড়ো হয় আশপাশের মানুষ। কেউ একজন কিশোরদের ঝগড়া মিটিয়ে দেয়। এ দৃশ্য কমলাপুর স্টেশনের। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এই দৃশ্য দেখে দায়িত্বরত এক পুলিশ বলল, এ দৃশ্য এখানে নিত্যরাতের।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দেড়টা। শত শত মানুষে গিজগিজ করছে স্টেশন; অথচ শুনশান নীরবতা। কেউ হনহন করে ঢুকছেন, কেউ স্টেশন থেকে বেরিয়ে যেতে ভীষণ তৎপর। কেউ উদাস ভঙ্গিতে ট্রেনের অপেক্ষায়। কেউ গ্রামের বাড়ি ফেরার প্রত্যাশায় পুলকিত। আবার কেউবা অজানা কারণে ব্যথিত, বিষন্ন। প্রচÐ শীতে কেউ ছেঁড়া কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে রয়েছে। কেউ বা জবুথবু হয়ে কোনায় রয়েছে বসে। কারো গায়ে পাটের বস্তা, কারো গায়ে ময়লা ছেঁড়া কম্বল, কেউবা পাতলা কাপড় মুড়ি দিয়ে শুয়ে গেছেন। বাইরে বইছে শির শির বাতাস। গভীর রাতটা যেন পুরোপুরি ভিন্নজগৎ। এ যেন কোনো অচেনা নগরী। বিশাল এলাকাজুড়ে টিকিট কাউন্টারের সামনে পাঁচ শতাধিক লোক বিক্ষিপ্ত শুয়ে আছে। টিকিট কাউন্টারের সামনে যে লোহার ঘের সেখানেও শুয়ে রয়েছে মানুষ। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। হাজেরা বেগম খাতুন (৫০) এক কিশোরী মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে আসলেন। পলিথিনের ব্যাগ থেকে একটা ময়লা কাঁথা বের করে দক্ষিণ দিকের টিকিট কাউন্টারে গেইটে বিছিয়ে কিশোরী মেয়েকে শুয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু বাধ সাধলো পত্রিকা বিক্রেতা হকার। হাজেরাও ছাড়ার পাত্রী নন। হকারের দাবি তার কাছে দু’জন পত্রিকা কিনেছে ওই জায়গায় বিছিয়ে ঘুমানোর শর্তে। সে পত্রিকা বিক্রি করে এভাবেই আয় রোজগার করে। কিন্তু হাজেরা প্রতি রাতে এখানে ঘুমায়। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনের জন্য স্টেশনে অপেক্ষারত এক যাত্রী মধ্যস্ততা করে ঝগড়া থামিয়ে দিলেন। পরাজিত হাজেরা কিশোরী মেয়েকে নিয়ে দু’হাত দূরে সরে গেলেন।
হাজেরার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতি রাতে এখানটায় ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুমাতে আসেন। দিনের বেলায় একেক সময় একেক জায়গায় থাকেন। সস্তানরা টোকাইয়ের কাজ করে। তিনি নিজে কখনো টোকাই, কখনো ভিক্ষুক; যখন যে কাজ করার সুযোগ পান তাই করেন। বললেন, শীতের বাঁচার উপায় নেই। এমনিতে মশার কামড়ে বেশ কষ্ট হয়। বিছানা বালিশ ছাড়া স্টেশনে ঘুমানো অনেকটা সয়ে গেছে। তবে জায়গাটা নিরাপদ নয়। একটা মেয়ে আছে তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন আবার কী ঘটে যায় কে জানে। কিন্তু কয়েকদিন থেকে শৈত্যপ্রবাহের কারণে কষ্টটা বেড়ে গেছে। শীতের কাপড় নেই। প্রায় রাতে লোকজন কম্বল দিতে আসে। যারা পায় তারা বারবার পায়। আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। মায়ের সঙ্গে ভাব জমে গেছে দেখে ১৩ বছরের কিশোরী রাহেলা বলেন, স্যার, আমরা রাতে একেক সময় একেক জায়গায় থাকি। রাস্তার ফুটপাথে, কিংবা পার্কে। শুধু বৃষ্টির সময়ে কষ্ট হয় তাই স্টেশনে থাকি। মাঝে মাঝে ফুটপাতে পলিথিনের মোড়ানো ঘরে থাকি। তবে শীত বেশি হওয়ায় স্টেশনে আসছি ক’দিন থেকে। কিন্তু রাক্ষুসে মশার যন্ত্রণা আর প্রচÐ ঠাÐায় ঘুম আসে না।
শুধু জমিলা আর কিশোরী রাহেলা নয়; শত শত ছিন্নমূল মানুষ নিত্যরাতে কমলাপুর স্টেশনে ঘুমাতে আসে। আমরা যেমন কাজ শেষে ঘরে ফিরি; তেমনি তারাও ফেরে স্টেশনে। খুব ভোরের কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই আবার জেগে উঠতে হয়। গভীর রাত আর খুব সকালের মাঝখানের যতটুকু সময় মেলে, তা মশার তীব্র কামড়ের মাঝে বিছানা-বালিশ ছাড়া পাকা মেঝের সঙ্গে কোনোমতে চোখ বন্ধ করে ঘুমকে আহŸান করতে হয়। গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত কমলাপুর স্টেশনে ঘুরে দেখা গেল অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষ আশ্রয় নিয়েছে শুধু রাতটুকু কাটানোর জন্য।
কমলাপুরে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা গেল কয়েকজনকে। অধিকাংশ ছিন্নমূল মানুষ দৈনিক পত্রিকা কিনে সেটা বিছিয়ে ঘুমায়। রাতে পুরনো পত্রিকা বিক্রি হয় পাঁচ টাকা, তিন টাকা দরে। তীব্র শীতে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশা চোখে পড়ল। শীতজনিত বিভিন্ন রোগে কষ্ট পাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। শুয়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। গভীর রাতে তিন পথশিশু প্রচÐ শীতে লুডু খেলছে। পাশে শীতে কাঁপছে দু’জন বৃদ্ধ। একটি টিভির ক্যামেরা এলো। ঘুমন্ত বৃদ্ধকে ডেকে তোলা হলো। জানতে চাওয়া হলো কেমন আছেন? ঘুম থেকে ডেকে তোলায় বিরক্ত বৃদ্ধের সাফ জবাব, আপনাদের লজ্জা নেই? আক্কেল নেই? শীতে স্টেশনে ঘুমিয়ে রয়েছি তারপরও জানতে চাচ্ছেন কেমন আছেন? আপনারা কি মানুষ! দাঁড়িয়ে থাকা টিভি রিপোর্টার লজ্জায় দূরে সরে গেলেন, কিন্তু ক্যামেরা চলছেই।
এর আগে রাত সাড়ে ১২টার সময় কয়েক তরুণ এসেছিল কম্বল দিতে। প্রচÐ শীতের মাথা মুড়ে যারা ঘুমিয়ে ছিলেন তাদের মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দেখে দেখে বৃদ্ধদের কম্বল দিচ্ছেন। যাদের কম্বল দিচ্ছেন তারা বেজায় খুশি। যাদের ঘুম ভাঙ্গাচ্ছেন অথচ বয়স কম হওয়ায় কম্বল দিচ্ছেন না তারা প্রচÐ ক্ষুব্ধ। কম্বল দেয়ার দৃশ্য দেখতে পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই কানে এলো কম্বল দিতে আসা এক তরুণ আবদুল মালেক নামক ৬৬ বছর বয়ষ্ক বৃদ্ধের কাছে জানতে চাচ্ছেন রাজনীতি বোঝেন? কাকে ভোট দেন? ঘুম ঘুম চোখে বৃদ্ধ বললÑ আমরা এগুলা বুজি না। কেডা সরকার অইলো আর কেডা অইলো না এইডা নিয়া আমাগো চিন্তা কইর‌্যা লাভ নাই। সরকার হইলো বড় লোকগো লাইগ্যা। হেরা আমাগো লাইগ্যা কিছু করে নাহি? হেরা দেশে থাকলেও যা, না থাকলেও তা। আমরা বাঁইচা থাহি আল্লাহর ভরসায়। বৃদ্ধের ভাগ্যে একটি কম্বল জুটল।
ঘুমানোর জন্য তোশক-বালিশ কিংবা মশার হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় নেই। ঘুমাতে না আছে লাইন, না আছে দিগি¦দিকের কোনো বালাই। কে কোন দিকে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছে, কার পা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। অনেকে পুঁটলি মাথার নিচে বালিশ বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। অনেকের মাথার নিচে সেটুকুও নেই। কেউ কেউ পেপার মুড়িয়ে বালিশের মতো করে মাথার নিচে দিয়েছে। আবার বিছানাও পেপার বিছিয়েই। কেউ আবার পুরোপুরি প্লাস্টারের উপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে। কেউ লুঙ্গি খুলে শরীর মুড়ি দিয়েছে। আবার কেউ গামছা জড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। যারা মানুষ চলাচলের জায়গায় ঘুমানোর চেষ্টা করছে; পুলিশ বারবার এসে তাদের তুলে দিচ্ছে। কিন্তু বিশালাকার কমলাপুর স্টেশনে গিজ গিজ করা মানুষের মধ্য ঘুমানো যুতসই জায়গা না পেয়ে তারা আবার ফিরে এসে মাঝপথেই ঘুমাচ্ছেন। একটি শিশুকে দেখা গেল মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। ডান হাতে দগদগে ঘা। মাথার কাছে পলিথিনের মধ্যে কতগুলো ট্যাবলেট। দেখেই বোঝা গেল, কোনো দুর্ঘটনার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে। যখন সেবা যতেœর ভীষণ প্রয়োজন, ঠিক তখন তার খোঁজ নেয়ারই কেউ নেই; ঘুমানোর জায়গা নেই। কি নির্মম নিয়তি! কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘স্যার ওরা কয় আমি হিরোইন বেচি। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালানোর সময় সিএনজির নিচে পড়েছি। পকেট হাতিয়ে ৫০ টাকার একটা নোট দিতেই কৃতজ্ঞতায় চোখ দিয়ে পানি পড়তে দেখা গেল। বলল, স্যার সবারে কম্বল দেয়; বয়স কম হওয়ায় আমারে কেউ কম্বল দেয় না। এই শীতে কি বাঁচা যায় স্যার!
স্টেশনের বইরে যে টিনের লম্বা শেড সেখানে চারটি শিশুকে দেখা গেল। তারা একটি পেপার দিয়ে বালিশের মতো বানিয়েছে। তাতেই সবাই মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনো ফাঁকে দু’জনের মাথা সরে গেছে। ঘুমের মধ্যেই থর থর করে কাঁপছে। দু’তিন গজ দূরে আরেকটি গ্রæপের দু’জনের মাথার নিচে কয়েকটি পেপার দেয়া। তাদের বুকে পেটে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছে আরো তিনটি শিশু। একটার গায়ে ছেঁড়া কম্বল জড়ানো থাকলেও অন্যদের তাও জোটেনি। তাই শীতে কাঁপছিলেন। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা ২টা ছুঁই ছুঁই। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস কয়েক ঘণ্টা লেটে স্টেশনে এসে গেছে। দে ছুঁট।

 



 

Show all comments
  • M. Nader ১৩ জানুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪৩ এএম says : 0
    it's a real picture of this place
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ