Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮, ৪ শ্রাবণ ১৪২৫, ৫ যিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী

সমঝোতার লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না

মুনশী আবদুল মাননান | প্রকাশের সময় : ১৪ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দু’পক্ষের নেতাদের মধ্যে বাকযুদ্ধ যেভাবে বাড়ছে তাতে দল দু’টির মধ্যকার দূরত্ব আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। অথচ দেশবাসী চাইছে, দু’দলের মধ্যে নির্বাচন বিষয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হোক, যাতে একটি সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের একটি নির্বাচন তাদের একান্ত প্রত্যাশাই শুধু নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গণতন্ত্রের অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য অপরিহার্যও বটে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বির্তকিত নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দেশের রাজনীতি গভীরে খাদে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, গত চার বছরে তার উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। গণতন্ত্রের পথেই এদেশের রাজনীতি বিকশিত হয়েছে। সেই গণতন্ত্রও এখন রুদ্ধ। গণতন্ত্র নয়, উন্নয়নই আসল, এমন তত্তে¡র পেছনে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার অভিলাষ বিদ্যমান। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরবিরোধী নয়। বরং গণতন্ত্র থাকলে উন্নয়ন আরও দ্রুতায়িত হয় এবং উন্নয়ন কাজে জনসম্পৃক্ততা বাড়ে। গত চার বছরে উন্নয়নের অনেক স্বপ্ন, অনেক গালগল্প বিস্তার লাভ করেছে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন কতটা হয়েছে এবং দেশবাসী তার সুবিধা কতটুকু পেয়েছে বা পাচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনযাপনে প্রতিফলিত হতে বাধ্য। এই চার বছরে জনজীবনমানের কতটা উন্নতি হয়েছে তার হিসাব-নিকাশ করলেই বুঝা যায় উন্নয়ন কতটা হয়েছে, কতটা সুফলদায়ী হয়েছে। কিছুমাত্র উন্নয়ন হয়নি, এ দাবি করা যাবে না। উন্নয়ন অন্য অনেক কিছুর মতই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, উন্নয়ন কিছু না কিছু হয়ই। এক নায়কের সরকার, সামরিক সরকার, স্বৈরাচারী সরকার এমনকি ঔপনিবেশিক সরকার বা দখলদার সরকারের আমলেও কমবেশী উন্নয়ন হয়। কিন্তু উন্নয়নের কারণে ওইসব সরকার সমর্থন পেতে পারে না, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার অধিকার পেতে পারে না। রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে, গণতন্ত্রকে অচল করে দিয়ে, জনগণের বাক, ব্যক্তি ও নিরাপত্তার অধিকার হরণ করে কোনো দেশ স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না, এগিয়ে যেতে পারে না। এই বিবেচনাটা সামনে রেখেই আমাদের করণীয় নির্ধারণ করা দরকার। এমন একটা নির্বাচন হওয়া দরকার, যাতে জনরায় সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিফলিত হয় এবং গণরায়ভিত্তিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সকল হৃত অধিকার ফিরে আসে। গণতান্ত্রিকভাবে স্বীকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে সে সরকার যেমন ‘শক্তিশালী’ সরকার হতে পারে, তেমনি জনগণের কাছে তার জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হতে পারে। জবাবদিহিতাহীন সরকার স্বভাবতই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, যা কাম্য হতে পারে না। এ ধরনের সরকার জনহিত ও দেশকল্যাণের চেয়ে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতেই অধিক ব্যস্ত থাকে।
রাজনীতির অবাধ চর্চার আবশ্যকতা প্রশ্নাতীত। গণতন্ত্রই কেবল সে সুযোগ প্রদান করে। গণতন্ত্রে বিভিন্ন দল ও মত থাকে। গণতন্ত্র সেই বহুদল ও বহুমতকে প্রশ্রয় দেয়। রাজনীতির মূল লক্ষ্য যেহেতু জনসেবা ও দেশকল্যাণ সুতরাং সব দলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানমূলক সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। গণতন্ত্র সেই শর্তই আরোপ করে। বর্তমান সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক সরকার বলে পরিচয় দিতে বিশেষ উৎসাহ বোধ করে। অথচ বিরোধীদলের জন্য কোনো স্পেস দিতে চায় না। এটা গণতন্ত্রসম্মত নয়। দেশকে অবাধ রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে দেখতে চাইলে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা চাইলে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেটা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো মিলেই করতে হবে। সকলেই আশা করে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে ইতিবাচক উপদান সংযুক্ত হবে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলসমূহ বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। ইতোপূর্বে কয়েকটি উপলক্ষে কিছু শুভ আলামত লক্ষ্য করা গেলেও সম্প্রতি দু’দলের নেতাদের মধ্যে বাক- বিতন্ডা জোরদার হয়েছে। সরকার চলে গেছে কঠোর অবস্থানে। বিএনপিও পাল্টা জবাব দিতে কসুর করছে না। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পদ্মাসেতু নিয়ে একটি মন্তব্য করেন ছাত্রদলের এক সভায়। তিনি বলেন, সরকার এখন পদ্মাসেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু পদ্মাসেতু এই আওয়ামী লীগের আমলে শেষ হবে না। তিনি আরও বলেন, জোড়াতালি দিয়ে সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার এই মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে গত বুধবার জাতীয় সংসদে তার অভিমত জানতে চাওয়া হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেতু তো জোড়া দিয়েই করা হয়। জোড়া না দিলে সেতু হয়না। কিন্তু উনি জোড়াতালি দিয়ে কি বুঝাতে চেয়েছেন, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে বাংলাদেশে তো একটি কথা রয়েছে, পাগলে কিনা কয়, ছাগলে কিনা খায়। আমার মনে হয়, এ ধরনের পাগলের কথায় বেশি মনোযোগ না দেয়াই ভালো।
পদ্মাসেতু নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার মন্তব্যকে অনেকেই ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। কেউ কেউ একে ‘দায়িত্বহীন’ মন্তব্য বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু তার মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তা কতটা ‘দায়িত্বশীল’, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘পাগল’ এবং তার মন্তব্যকে ‘পাগলের প্রলাপ’ হিসাবে তাচ্ছিল্য করা প্রধানমন্ত্রীর পদ ও মর্যাদার দিক থেকে মানানসই বলে মনে হয় না। বেগম খালেদা জিয়া তিন তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির চেয়ারপারসন। অন্যদিকে শেখ হাসিনাও তিন তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালের অবিসংবাদী সভানেত্রী। স্বভাবতই তাদের কাছ থেকে ‘দায়িত্বশীল’ মন্তব্যই সকলে প্রত্যাশা করে। তারা যদি একে অপরকে সম্মান দিয়ে কথা না বলেন, তবে সেটা অত্যন্ত দু:খজনক বলেই প্রতিভাত হতে বাধ্য। কথাই কথা বাড়ে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের উপর পদ্মাসেতু নির্মিত হলে সেটা তো টিকবে না। খালেদা জিয়া ভুল বলেননি। বরং তিনি ওই মন্তব্য করে সাচ্চা দেশপ্রেমিকের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, পদ্মাসেতু যে একটি রং ডিজাইনের উপরে নির্মিত হচ্ছে সেটা আমাদের কথা নয়, বিশেষজ্ঞদের কথা। দেরি না করে মির্জা ফখরুলের কথার জবাব দিতে গিয়ে এসেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি সড়ক ও সেতুমন্ত্রীও বটে। তিনি বলেছেন, পদ্মাসেতুর নির্মাণ নিয়ে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মামলার মুখোমুখি হতে হবে। এভাবে কথার পিঠে কথা বাড়তে থাকলে দুই দলের মধ্যে তিক্ততা আরও বাড়বে।
একই দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তরে জিয়া পরিবারের অর্থপাচারের একটি চিত্র তুলে ধরছেন। তার উত্থাপিত পাচারকারীর তালিকায় রয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমান, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো, তার স্ত্রী শার্মিলা রহমান। এ তালিকায় আরও রয়েছে বিএনপি-আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নোত্তর পর্বে ২৫৬ পৃষ্ঠার প্রশ্নের জবাবে ১৫৩ পৃষ্ঠা জুড়েই ছিল জিয়া পরিবারের অর্থ পাচারের বিবরণ। এই পাচারকৃত অর্থের বিবরণ কতদূর সত্য, কারো পক্ষেই তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। বিভিন্ন সূত্র-উৎস ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী এই বিবরণ তুলে ধরেছেন। অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। উল্লেখ আবশ্যক, প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিভিন্ন সময় জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করলেও এই প্রথম জাতীয় সংসদে তার একটি ‘পূর্ণ বিবরণ’ প্রধানমন্ত্রী উপস্থাপন করছেন। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই’ এটা করা হয়েছে কিনা সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায়না। বিএনপির তরফে উপস্থাপিত পাচারকৃত অর্থের বিবরণ ও অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রী ‘মিথ্যাচার’ করেছেন বলে অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, সংসদে প্রধানমন্ত্রী যে সম্পদের কথা বলেছেন, সম্পদের যে নাম দেয়া হয়েছে, বাস্তবে সম্পদগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। এই যে মিথ্যাচার, এই মিথ্যাচার করে গোটা দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রী বিভ্রান্ত করেছেন। এই পাল্টা-পাল্টি বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য জানা সম্ভব নয়। আসল সত্য জানা তখনই সম্ভব, যখন নিরপেক্ষ নির্মোহ তদন্ত হবে।
সংসদে বেগম খালেদা জিয়াকে পাগল বলা ও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ উপস্থাপন করা রাজনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। তাদের মতে, এটা করে সরকার হয়তো রাজনৈতিক ফায়দা পেতে চাইছে। রাজনীতিতে সম্ভাব, সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের প্রত্যাশা এর ফলে যে আরও অনিশ্চত হয়ে পড়তে পারে সেটা বিবেচনায় নিতে চাইছে না। এটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়। বিএনপির তরফে প্রায় লাগাতারই অভিযোগ করা হচ্ছে, বিএনপিকে বাইরে রেখে ৫ জানুয়ারির মতো আর একটি একতরফা, ভাটারবিহীন ও প্রতিদ্ব›িদ্বতাবর্জিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের নীল নকশা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সম্পর্কিত মামলার কার্যক্রম জোরদার করার প্রেক্ষিতে বিএনপির নেতারা অনেকবারই বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, এই মামলায় যদি তার শাস্তি হয়, তবে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার যোগ্যতা হারাবেন। এমন বাস্তবতায় তিনি আপিলে যাবেন এবং তখন তার নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার কোনো বাধা থাকবে না বলে আইনবিদদের অভিমত। এটা সরকারের অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও মামলাকে দ্রæত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির ওপর চাপ বাড়ানো বা অব্যাহত রাখার জন্য। কোনো কারণে যদি বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় তাহলে পোয়াবারো ধারণ হবে আওয়ামী লীগেরই। যদিও আওয়ামী লীগের নেতারা প্রায়শ:ই বলে থাকেন, বেগম খালেদা জিয়া বা বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার ইচ্ছা আওয়ামী লীগের নেই। মুখের একথা মনের কথা কিনা, সেটা অবশ্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাই অনুমান করতে পারবেন। যেভাবে বিএনপিকে আক্রমনের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রান- পেরেসান করা হচ্ছে তাতে বুঝা যায়, দু দলের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা সদূরপরাহত।
সমঝোতা না হলে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা এবং নির্বাচন আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে দেশী-বিদেশী মহলের সন্দেহ রয়েছে। তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। তারা বিশেষ করে বিএনপির অংশগ্রহণ অপরিহার্য বলে মনে করে। বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। তার আরও দাবি, সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ও আওয়ামী লীগের অবস্থান এর বিপরীত। জাতির উদ্দেশ্যে গত শুক্রবারে প্রদত্ত ভাষনে প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। অবশ্য সরকারের গঠন ও প্রকৃতি কি হবে তা তিনি উল্লেখ করেননি। এর উত্তর সংবিধানের মধ্যেই আছে। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সংবিধান এমন নির্দেশই রয়েছে। সংবিধানে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা বিদ্যমান। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ব্যাপারটি কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন হচ্ছে তার ওপর প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করে। দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগ অবস্থানে অনড় আছে। বিএনপিও তার দাবিতে দৃঢ়। এ অবস্থায় বিএনপি নির্বাচনে অংশ নাও নিতে পারে, যদি সরকার বিন্দুমাত্র নমনীয় না হয়। বিএনপির তরফে বলা হয়েছে, আন্দোলন ও নির্বাচন দুই প্রস্তুতিই দলের আছে। এর মধ্যেই পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা না হয় সেক্ষেত্রে রাজনীতি সংঘাতময় হয়ে উঠতে পারে। কোনোভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা হবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি। সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।
অনেকেই আশা করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষনে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু কথা, নিদেনপক্ষে কোনো ইঙ্গিত থাকবে। ভাষণে সে রকম কিছু নেই। এতে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ বা সমঝোতা নয়, এই সিদ্ধান্তই যদি বহাল থাকে, তবে রাজনৈতিক সংকট নিরসন, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা, নির্বাচন এবং তাতে সব দলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিতই থেকে যাবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সমঝোতার একটা জায়গা উন্মুক্ত রাখা উচিৎ। তাদের বিবেচনায় সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে তার ফলাফল কি হবে, সকলেরই জানা। সে নির্বাচন হবে আগের মতই প্রশ্নবিদ্ধ। তাতে জনসম্মতিভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। দেশ চলে যাবে আরও বিপর্যয়ের দিকে।
গত ৯ বছরের ইতিহাস ও ঘটনাপ্রবাহের ওপর নজর দিলে দেখা যাবে, সরকারে ও দলে প্রধানমন্ত্রীর একক ও নিরংকুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত ছিল। এখনও তাই আছে। এদিকে লক্ষ্য রেখেই অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক সংকট উত্তরণ এবং অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা বিধান করতে পারেন একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই। তার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতাই এজন্য যথেষ্ট। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এই যে আস্থা ও বিশ্বাস, তিনি তার যথার্থ মূল্য দেবেন, এটাই সকলের প্রত্যাশা।
অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রীরই দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী সে দায়িত্ব পালনে সফল হলে ইতিহাসে নন্দিত প্রধানমন্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করবেন। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা কারো জন্যই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতাকালে কে কি অবদান রাখলেন সেটাই আসলে ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয় এবং যুগযুগ ধরে মানুষ সেই অবদানই স্মরণ করে।



 

Show all comments
  • alim ২৫ জানুয়ারি, ২০১৮, ৯:৪৬ এএম says : 0
    “ সমঝোতা কি করে হয়, ভিতরে থাকিলে প্রতিহিংসা আর ভয় ?”
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।