Inqilab Logo

ঢাকা শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ০৯ মাঘ ১৪২৭, ০৯ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

ফেরত গিয়ে রোহিঙ্গদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আশ্রয়েই থাকতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

আরো ২ শতাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
মিয়ানমারের যে সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতন, পৈচাসিকতা এড়াতে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে শরণার্থী হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিমরা; দেশে ফিরে গিয়ে তাদের আবার সেই সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে থাকতে হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে স¤প্রতি এমন একটি চুক্তি করেছে দুই দেশ যাতে সপ্তাহে ১৫শ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে দেশটি। সা¤প্রতিক নিবন্ধন বলছে বাংলাদেশে নতুন পুরনো মিলিয়ে দশ লাখ রোহিঙ্গা বাস করছে।
তবে একদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলা হলেও, এখনো মিয়ানমারে সহিংসতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া কি কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে? খবর বিবিসির। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাটির রিপোর্টে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে গবেষণা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা। তাকে এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু যারা যাবে তাদের তো সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আশ্রয়েই থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘ধরুন হিন্দু রোহিঙ্গারা বলছেন সরকার চাইলে তারা ফেরত যাবেন। অনেক সরাসরি নির্যাতিত হয়নি কিন্তু অন্যরা পালিয়ে এসেছে বলে তারাও এসেছে। এখন ফেরত নিলেও তাদের বাড়িঘর পুড়ে গেছে। তাদের জন্য শেড করা হয়েছে। যখন তখন আবার ঘটনা ঘটতে পারে।
বিবিসি থেকে প্রশ্ন করা হয় মিয়ানমারের প্রতিশ্রæতির ওপর কি আস্থা রাখা যায়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অবশ্যই না। যতক্ষণ তারা নাগরিকত্ব না পায় আর আন্তর্জাতিক সংস্থার তদারকি ছাড়া তারা যাবে না এটাই তারা (রোহিঙ্গা) বলছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে থাকার পেছনে যেসব বেসরকারি দেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থারও স্বার্থ আছে- এ অভিযোগের সত্যতা কতটুকু? তিনি বলেন, এখন যে পরিস্থিতি সেটি সরকার মোকাবেলা করতে পারবে না। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থার থাকা প্রয়োজন। আর আন্তর্জাতিক সংস্থা তারা চায় শরণার্থীদের যেনো পুশব্যাক না করা হয়। এটি সত্যি যে এখানে লাভবান হওয়ার মতো অনেক পক্ষ আছে। কিন্তু দেখতে হবে রোহিঙ্গাদের যে চাহিদাগুলো সেগুলো সঠিকভাবে ম্যানেজ করা হচ্ছে কি-না।
টেকনাফ সীমান্তে আরও ২ শতাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
টেকনাফ থেকে মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান জানান : প্রত্যাবাসনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার চার মাস পরেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্দ হয়নি। গত বুধবার ভোরে রাখাইনের বুছিডং থানার দুই শতাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়া পাড়া সৈকত পয়েন্ট দিয়ে এপারে ঢুকেছে। একদিকে মিয়ানমার সরকারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা চলছে। অপরদিকে রাখাইন রাজ্যে মগ সেনাদের নির্যাতন ও পুরুষদের ধরে নিয়ে বিনা বেতনে শ্রমিক খাটানোর অভিযোগে এখনো প্রতিদিন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গা।
জানা যায়, গত বুধবার ভোরে রাখাইনের বুছিডং থানার দুই শতাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফের সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়া পাড়া সৈকত পয়েন্ট দিয়ে এপারে ঢুকেছে। তারা সকলে টেকনাফ বাস স্টেশনে এসে জড়ো হয়। বুছিডং থানার সিংদিপ্রাং গ্রামের রোহিঙ্গা ছৈয়দ আলমের পুত্র আবু ছৈয়দ (৩৫) বলেন ‘১২ জানুয়ারি ভোর রাতে বাড়ী থেকে বের হয়ে পাহাড়, বিল অতিক্রম করে এপারে আসার জন্য মিয়ানমার সীমান্তে পৌঁছি। আসার সময় সেনারা আমাদের টাকা, স্বর্ণালংকার কেড়ে নিয়ে এপারে আসতে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা করেনি। সেনারা পুরুষদের ধরে নিয়ে পারিশ্রমিক ছাড়া কাজ করাচ্ছে। কোথাও কাজ করা যাচ্ছেনা। ফলে স্ত্রী, সন্তানরা অর্ধহারে অনাহারে ঘরে দিনাতিপাত করেছি। তাই আবারো ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে এপারে আশ্রয়ে নিতে হয়েছি’।
একই এলাকার সনজিদা বেগম (৩০) বলেন ‘আমার স্বামীকে সেনারা ধরে নিয়ে ১০ দিন ধরে বন্দি রেখে কাজ করিয়েছে। কিন্তু কোন পারিশ্রমিক দেয়নি। এতোদিন ঘরের ছেলে মেয়েদের নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে ছিলাম’।
রোহিঙ্গা নারী নুরে জান্নাতের কোলে দুই মাসের ফুটফুটে শিশু। তিনি বলেন ‘এপাড়া থেকে ওপাড়া পালিয়ে অনেক সহ্য করে এতোদিন নিজের দেশের মাটি আঁকড়ে ধরেছিলাম। কিন্তু বর্বর মগ সেনাদের বিভিন্ন কৌশলে নির্যাতন নিপীড়ন থামছেনা। কাজ কর্ম না থাকায় চরম খাদ্য সংকটে থেকেছি। অবশেষে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এদেশের আশ্রয়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছি’।
পুঁইমালিগ্রামের ফয়েজুর রহমান বলেন ‘আমরা একসাথে ৩০ জন এসেছি। ৫দিন হেঁেট পাহাড়ী ও বিল অতিক্রম করে মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটা তারের ঘেরা পার হয়ে নাইক্ষ্যংদিয়া সীমান্তে নৌকার অপেক্ষায় থেকেছি। পরে নৌকা পেয়ে জনপ্রতি ৫০ হাজার কিয়াতের বিনিময়ে এপারে ঢুকেছি’। পালিয়ে আসা সকল রোহিঙ্গাদের একই অভিযোগ।
টেকনাফ বাস স্টেশনে অবস্থান করা টেকনাফ মডেল থানার এএসআই রিংকন বলেন ‘সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৯১ জন রোহিঙ্গাকে রেজিস্ট্রেশন তালিকায় লিপিবদ্ধ করেছি। পরে তাদের সকলকে বালুখালী ও কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে’।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রোহিঙ্গা

৫ ডিসেম্বর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন