Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ইসলাম প্রচারের নিয়ম-নীতি

অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম | প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম


আল্লাহ জাল্লা শানুহু মানব জাতির জন্য যে দ্বীন অর্থাৎ জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, সেটাই ইসলাম। ইসলাম কোনো আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ গতানুগতিক এবং অনর্থক ধর্ম নয়। ইসলাম হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ, প্রগতিশীল, সর্বকালীন শ্বাশত জীবনব্যবস্থা। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : ইন্নাদ দ্বীনা ইন্দাল্লাহিল ইসলামÑ নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম (সূরা আল-ইমরান : আয়াত ১৯)।
কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করো (সূরা তাহরিম : আয়াত ৬)। এই আয়াতে কারিমার ব্যাখ্যা জানার জন্য হজরত উমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন : হে রাসূল, নিজেকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা করার বিষয়টি তো বুঝলাম, কিন্তু পরিবার-পরিজনকে কীভাবে বাঁচাব? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন, সেইসব নিষিদ্ধ কাজ করতে তাদের নিষেধ করবে, আর যা করতে আদেশ করেছেন, তা করতে বলবে।’ আমরা জানি, ৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজানের শেষ দশকের কোনো এক বেজোড় রাতে, অধিকাংশের মতে, ২৭ রমজান রাতে প্রিয় নবী (সা.) প্রথম ওহি লাভ করেন। সেই রাতেই তিনি গৃহে ফিরে এসে তাঁর সম্মানিতা স্ত্রী হজরত খাদিজা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহার কাছে এ সম্পর্কে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ঈমান আনলেন। এইভাবে নিজের গৃহ থেকে ইশায়াতে ইসলাম বা ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু হলো। তারপর ঈমান আনলেন হজরত আলী করামাল্লাহু ওয়াজহাহু এবং হজরত জায়েদ ইবনে হারিছা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু। এ দু’জনই ছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার-পরিজনের অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম ওহি নাজিলের প্রায় তিন বছর পর থেকে নিয়মিত ওহি নাজিল হতে থাকে বিভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে। ওহি নাজিলের এ পর্যায়ে আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার নির্দেশ দিলেন। ইরশাদ হলো : (হে রাসূল), আপনি উঠুন এবং সতর্ক করুন, আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন (সূরা মুদদাসসির : আয়াত ২-৩); হে রাসূল, আপনার নিকটাত্মীয়গণকে সতর্ক করে দিন (সূরা শুয়ারা; আয়াত ২১৪)।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইশায়াতে ইসলামের জন্য আল্লাহ জাল্লা শানুহু যেসব নির্দেশনা নাজিল করেছেন, সেই মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ইশায়াতে ইসলাম বা ইসলাম প্রচার করা বলতে প্রধানত ইসলামের বাইরের লোকজনের মধ্যে প্রচার করাকে বোঝায় এবং ইসলামের ভেতরে থেকে যারা ইসলামের বিধিনিষেধ অমান্য করে, গোমরাহির মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে যারা পথভ্রষ্টতার আবরণে নিজেদের আচ্ছন্ন করে ফেলে, তাদের সংশোধন করার মধ্যেও ইশায়াতে ইসলামের আবেদন অনুরণিত হয়। এ ক্ষেত্রে হিদায়াতের আবেদন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এসব কাজ যাঁরা করবেন তাঁদের অবশ্যই ইসলাম সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান থাকা এবং সেই অনুযায়ী নিজের আমল-আখলাক গড়ে ওঠা মানুষ হতে হবে।
আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে নজর দেই তাহলে দেখতে পাবো, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন দেশে ইসলাম প্রচারককে বিধর্মীদের ইসলামের দিকে আহŸান করার জন্য পাঠিয়েছেন, তাঁরা সবাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত সাহাবি।
আল্লাহ জাল্লা শানুহু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি করে। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেইÑ এই সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য। আল্লাহ জাল্লা শানুহু মানুষকে দান করেছেন হিদায়াত, দান করেছেন সত্য পথে চলার দিশা। হজরত আদম (আ.) থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী সাইয়েদুল মুরসালিন নূরে মুজাসসাম হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নবী রাসূল আল্লাহ পাঠিয়েছেন তাঁরা সবাই আল্লাহর দেয়া দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থায় ইসলাম প্রচার করেছেন। এই ইসলামের পূর্ণতা লাভ হয় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে। তিনি রাহমাতুল্লিল আলামিন, বিশ্বজগতের জন্য রহমত, তিনি সিরাজাম মুনিরা-প্রদীপ্ত চেরাগ। অন্যান্য নবী রাসূলকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু প্রেরণ করেছিলেন নির্দিষ্ট কোনো জনপদের পথহারা মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য, কিংবা কোনো নবীর নিজ কওমকে পথভ্রষ্টতার হাত থেকে উদ্ধার করার জন্য। আর সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করলেন সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য, সমস্ত মানবজাতির জন্য। তাকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু নবুয়ত ও রিসালাত দান করেন মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির বহু আগে। কিন্তু এ নবুয়তের ধারায় তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানো হয় সবার শেষে। তিনি খাতামুন নাবিয়্যিনÑ নবীগণের সমাপ্তি বা সর্বশেষ নবী।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করতে যে নীতি-পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তাঁকে প্রচÐ বাধার মোকাবেলা করতে হয়। তাঁর পরিবার-পরিজন ও নিজ গোত্রের লোকজনসহ তাকে বয়কট পর্যন্ত করা হয়। তাকে নানারকম প্রলোভনও দেখানো হয়। কিন্তু তিনি বলেন, আমার এক হাতে চাঁদ আরেক হাতে সূর্যও যদি এনে দেয়া হয় তবু আল্লাহ আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা পালন করা থেকে একটুও পিছপা হবো না।
তিনি ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য তায়েফ গিয়েছেন। তায়েফের মানুষ তার আহŸানে সাড়া তো দিলোই না, বরং পাথর মেরে মেরে তার জিস্ম মোবারক ক্ষতবিক্ষত করে দিলো। তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল। তাঁর জিসম মোবারক থেকে খুন ঝরে তার না’ল (জুতো) মোবারক ভরে তার কদম মোবারক তাতে আটকে গেল। সে এক করুণ অবস্থা। তবু তিনি তায়েফবাসীর জন্য দোয়া করলেন এই বলে: আল্লাহ গো! আমার দুর্বলতা, আমার নিরূপায়তা এবং মানব দৃষ্টিতে প্রতীয়মান হেয়তার জন্য আপনার মহান দরবারে এই ফরিয়াদ করছি : হে রহমানুর রহিম, সমস্ত দুর্বলের রব আপনি। আপনিই আমার রব। যদি আমার ওপর ক্রুদ্ধ না হয়ে থাকেন, তাহলে আমি কারো পরোয়া করি না। আপনার শান্তি, আপনার আফিয়াত আমার আশ্রয়। আমি আপনার সেই নূরের কামনা করছি, যে নূর মোবারকে আসমান-জমিন রওশন হয়েছে, যে নূরের ছটায় অন্ধকার বিদূরিত হয় এবং যে নূরের ছটায় দুনিয়া ও আখিরাতের কর্ম সম্পাদন হয়। সেই নূর মোবারকের ওসিলায় আপনি আপনার গজব নাজিল করবেন না। একমাত্র আপনার সন্তুষ্টি সাধন করাই আমার কর্তব্য, যতক্ষণ না আপনি সন্তুষ্ট হন। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিকা। সেদিন তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে অত্যাচারে জর্জরিত অবস্থায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধৈর্য ধারণ করে যারা তাঁকে আঘাত করল তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করে ইসলাম প্রচারের কী নীতিমালা হওয়া উচিত তার অনুপম দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন। তিনি সেদিন ক্ষমার পথ বেছে নিলেন। তিনি তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলেন। তিনি বললেন : হয়তো আল্লাহ্ তায়ালা তায়েফবাসীদের কারো বংশে এমন মানুষ পয়দা করবেন, যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং আল্লাহর সঙ্গে কারো শরিক করবে না।
ইসলামের দিকে মানুষকে কিভাবে আহŸান করতে হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানহু ইরশাদ করেন : ‘তোমার রবের পথে আহŸান করো হিকমতের সঙ্গে এবং সুন্দর সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে, আর ওদের সঙ্গে বাক্যালাপ করবে সদ্ভাবে (সূরা নাহল : আয়াত-১২৫)।
এখানে লক্ষণীয় যে, আল্লাহর পথে মানুষকে আহŸান করার ক্ষেত্রে তিনটি পন্থা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ জাল্লা শানহু। আর তা হচ্ছেÑ হিকমত বা কৌশল, সদুপদেশ ও সদ্ভাবে আলোচনা।
এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছেন আম্বিয়ায়ে কেরাম। তারপর তাদের উম্মতদের মধ্যে যারা সিদ্দিক, শহীদ ও সালেহ। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : যাদেরকে মহান আল্লাহ নিয়ামতমÐিত করেছেন তারা হচ্ছেন নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ ও সালেহগণ (সূরা নিসা : আয়াত-৬৯)। এই সালিহিন বা সালেহদের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন সাহাবায়ে কেরাম, আওলিয়ায়ে কেরাম ও মুত্তাকি দ্বীনদারগণ। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলাম প্রচার করে আসছেন ইসলাম বিশেষজ্ঞগণ। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : ‘তোমাদের মধ্যে এমন এক গোষ্ঠী হোক যারা কল্যাণের দিকে আহŸান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে। এরাই সফলকাম (সূরা আল ইমরান : আয়াত-১০৪)।
৬২৮ খ্রিস্টাব্দে হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদিত হলে একটি স্বস্তির হাওয়া প্রবাহিত হয় আরব ভ‚খÐে। বহু লোক এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দল আসতে থাকে মদিনা মনওয়ারায়। প্রিয় নবী (সা.) বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদের কাছে পত্র পাঠান। ইসলাম প্রচারে সাড়া দিকে দিকে পড়ে যায়। আরব ভ‚খÐ ছেড়ে অনেক উচ্চশিক্ষিতও প্রিয় নবী (সা.)-এর নিকট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাহাবি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ওপারের দেশগুলোতে যান। চীন-সুমাত্রাগামী বাণিজ্য নৌবহরে করে যাওয়ার পথে কোনো কোনো সাহাবি বাংলাদেশের বন্দরে সাময়িক সফর বিরতি দিয়ে এখানে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন, তাদের বেশ কয়েকজনের মাজার শরিফ চীনের ক্যান্টনের ম্যাসেঞ্জার মসজিদ আঙ্গিনায় আজো রয়েছে। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। এখানে ইসলাম প্রচারে ব্যাপক অবদান রাখেন পীর-আওলিয়াগণ, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনÑ হজরত বায়েজিদ বোস্তামি, হজরত শাহ সুলতান রুমি, হজরত শাহ সুলতান বল্খয়ী, হজরত শাহ মখদুম রূপোশ, হজরত শাহ দৌলা, হজরত বাবা আদম শহীদ হজরত বাবা ফরিদ, হজরত আবু তাওয়ামা, হজরত শাহজালাল ও তার ৩৬০ খলিফা, শাহ আলী বাগদাদি, শাহ আলাওল, নূর কুতবুল আলম, আখি সিরাজ, মনসুর বাগদাদি, মুস্তাফা মাদানি, মুজাদ্দিদে জামান আবু বকর সিদ্দিকি, আবদুল হামিদ বাঙ্গালি, শাহ্ নেছারুদ্দীন আহমদ, মওলানা শাহ্ আবদুল করিম, শাহ মো. আবু নঈম, শাহ্ মো. আবুল খায়ের, মওলানা কারামত আলী জৈনপুরী, মওলানা শাহ সুফি তোয়াজউদ্দীন আহমদ, মওলানা রুহুল আমিন, মওলানা আহমদ আলী ইনায়েতপুরী (যশোর), মুনশি মেহেরুল্লাহ প্রমুখ। ইসলামের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারে তাঁদেরই অবদান স্বীকৃত হয়েছেÑ যার ধারাবাহিকতা আজো রয়েছে।
ইসলাম সংসার ছেড়ে বিবাগীর মতো ঘুরে বেড়াতে বলে না। যারা ইসলাম প্রচারের জন্য যোগ্য তারাই ইসলাম প্রচার করবেনÑ এই নিয়ম চলে আসছে প্রাথমিক কাল থেকেই। পীর-আওলিয়াদের পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম।
লেখক : মুফাসসিরে কুরআন, গবেষক
সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।