Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২১ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে লাইটার জাহাজ সংকট এবং পর্যাপ্ত জেটির অভাবে আমদানিকৃত পণ্য সময়মতো খালাস করতে না পারায় ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অতিরিক্ত যে সময় ব্যয় হচ্ছে, তা দিন হিসেবে বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। প্রতিদিনের জন্য জাহাজভেদে ব্যবসায়ীদের গড়ে ১০ থেকে ১৬ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হয়। এতে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা যেমন ব্যাপক ক্ষতির শিকার হন, তেমনি পণ্যের দামও বৃদ্ধি পায়। সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরের পানিসীমায় আসার পর দিনে গড়ে ৩ হাজার টন পণ্য খালাসের শর্ত দেয় বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো। এই শর্ত মেনেই ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করেন। এই হিসাব অনুযায়ী, পণ্য খালাস করতে না পারলে বাড়তি যে সময় লাগে, তার জন্য ক্ষতিপূরণ গুণতে হয়। অথচ পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ ও জেটি থাকলে ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য খালাস করতে পারতেন এবং ক্ষতিরও শিকার হতেন না। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, পণ্য খালাসের জন্য রয়েছে ১৪৫০টি লাইটার জাহাজ। প্রয়োজন আরও ৩০০টির। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যেভাবে পণ্য আমদানি বাড়ছে, তাতে আরও ৫০০ লাইটর জাহাজ দরকার। শুধু লাইটার জাহাজই নয়, কনটেইনারবিহীন পণ্য যেমন ইস্পাত, সিমেন্টের কাঁচামাল, চাল-ডালসহ ভোগ্যপণ্য খালাসের জন্য দুটি জেটি দরকার। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, স্বাধীনতার পর কনটেইনরবিহীন পণ্যবাহী জাহাজের জন্য একটি জেটিও নির্মাণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনও বোধ করেনি। এর ফলে একইসঙ্গে কনটেইনার ও কনটেইনারবিহীন পণ্য খালাস করতে গিয়ে সময় বেশি লাগছে, ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এর জন্য ব্যবসায়ীরা বন্দর কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন। 

দেশের অর্থনীতির প্রধানতম প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের মাধ্যমে শতকরা প্রায় ৮৩ ভাগ পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা হয়। এর ফলে পুরো চাপ এই বন্দরের উপরই পড়ছে। বিপুল পণ্য সময় মতো আমদানি ও রপ্তানি করতে বন্দরের যে সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন, তার যে ঘাটতি রয়েছে, তা বরাবরই বলে আসা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষেরও তা অজানা নয়। তারপরও বন্দরকে সচল ও দ্রুত করার জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং বন্দরের এসব সমস্যা দূরীকরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বেশি মনোযোগ যেন অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কীভাবে লোকবল নিয়োগ করা যায়, তার প্রতি। তা নাহলে বন্দরের পণ্য দ্রুত খালাসে যে ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার প্রয়োজন, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়ার কথা। ব্যবসায়ীরা সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় বছরে যে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়াই ছিল বাঞ্চনীয়। দু:খজনক হলো, বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি যখন বাড়ছিল তখন ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর লাইটার জাহাজ নির্মাণের অনুমোদন স্থগিত করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করলেও ততদিনে আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে কনটেইনারবিহীন পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। এর ফলে পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ এবং জেটির অভাবে আমদানিকৃত পণ্য খালাসে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অধিক সময় লেগে যাচ্ছে। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, পণ্য খালাসে দেরি হওয়ায় বেশিরভাগ জাহাজকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে গড়ে ১০ দিন অবস্থান করতে হয়েছে। এ হিসাবে দিনে গড়ে ১২ হাজার ডলার করে ক্ষতিপূরণ ধরলে জাহাজ কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের দিতে হয়েছে ১১৯৫ কোটি টাকা। এই ক্ষতি এখনো তাদের বহন করে চলতে হচ্ছে। অবশ্য ব্যবসায়ীরা এ ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন আমদানিকৃত পণ্যের দামের সাথে সমন্বয় করে। গত বছর আমদানিকৃত পণ্যের দাম কেজি প্রতি এক থেকে দেড় টাকা বাড়িয়ে দিতে হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিপূরণ দিলেও পণ্যের দাম বাড়িয়ে তা আদায় করে নিচ্ছে ভোক্তাদের কাছ থেকে। বন্দর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ যদি পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ ও জেটি নির্মাণের উদ্যোগ নিত, তবে জাহাজের ওয়েটিং চার্জ হিসেবে যে বিপুল অর্থের ক্ষতি হচ্ছে, তা হতো না। এতে দেশের দ্রব্যমূল্যসহ অন্যান্য খরচও কমে যেত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের আমদানি-রপ্তানি ভিত্তিক অর্থনীতি সচল রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। বন্দরই একমাত্র অবলম্বন, যার মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যায়। কাজেই বন্দরের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা সরকারের দায়িত্ব। যে লাইটার জাহাজ ও জেটি সংকটে প্রতিদিন দেশের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, তা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। এক হিসেবে দেখানো হয়েছে, গত বছর যে পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে, তা দিয়ে ২৫০টি লাইটার জাহাজ কেনা সম্ভব। বিষয়টি বন্দর কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেয়া জরুরী। আমরা মনে করি, আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য মসৃন ও দ্রুত করার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লাইটার জাহাজ ও জেটি সংকট কাটাতে উদ্যোগী হতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে উঠতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ