Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৮ মে ২০১৮, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, ১১ রমজান ১৪৩৯ হিজরী

সমন্বয়হীন শিপিং বাণিজ্য

আমদানি-রফতানি পণ্যসামগ্রী সুলভে পরিবহন সুবিধা

| প্রকাশের সময় : ২২ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

শফিউল আলম : বাংলাদেশের মতোই সমুদ্রপথে পণ্যসামগ্রী পরিবহনের চাপ ও চাহিদা বিশ্বজুড়ে সমানতালে বেড়েই চলেছে। শিপিং বাণিজ্যের সবচেয়ে সুবিধার দিক হচ্ছে সুলভে সহজে আন্তঃদেশীয় পণ্য পরিবহন। যা সড়ক রেল ও আকাশপথের তুলনায় অনেক ব্যয় সাশ্রয়ী। শিপিং বাণিজ্যে চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে বিশেষত কন্টেইনার মাদার জাহাজ, ফিডার জাহাজ, লাইটার জাহাজ-কোস্টার, ট্যাংকার নির্মাণের ক্ষেত্রে টেকসই এবং যুগোপযোগী লাগসই প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের জন্য তুলনামূলক কম গভীরতা (ড্রাফট সম্পন্ন) অথচ অধিক পরিমানে পণ্য তথা কন্টেইনার বহনের উপযোগী করে বড়সড় জাহাজের গমনাগমন বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি সমুদ্র বন্দর-ভিত্তিক এই শিপিং বাণিজ্য চলছে আগাগোড়া সমন্বয়হীন বেহাল অবস্থায়। এই খাতে নীতি-নির্ধারকমহলের নেই সুষ্ঠু তদারকি, দূরদর্শী পরিকল্পনা, মিশন কিংবা ভিশন।
দেশের শিপিং বাণিজ্য খাতে বছর বছর প্রবৃদ্ধির গতি ঊর্ধ্বমুখী। যা সামগ্রিকভাবে শিপিং ও বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য ‘শুভ সঙ্কেত এবং সম্ভাবনাময়’ হিসেবে দেখতে চান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে গতকাল (রোববার) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি অধ্যাপক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম জানান, প্রতিবছর দেশে পণ্য আমদানির পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরফলেও শিপিং বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। তবে সেই তুলনায় রফতানির হার হ্রাস পাচ্ছে। শিপিং বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির বা বৈদেশিক রফতানি বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থায় রফতানির আড়ালে সুযোগ বুঝে মুদ্রা পাচার হচ্ছে কিনা তারও সুষ্ঠু তদারকির প্রয়োজন।
দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামে সদ্যবিদায়ী ২০১৭ সালে রেকর্ড সংখ্যক আমদানি-রফতানিমুখী কন্টেইনার ওঠানামা (হ্যান্ডলিং) করা হয়েছে। গতবছরে ২৫ লাখ ৬৩ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার (প্রতিটি ২০ ফুটের একক হিসাবে) হ্যান্ডলিং করা হয়। গত ২০১৬ সালে হ্যান্ডেল করা হয় ২৩ লাখ ৪৬ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার। বিগত ২০১৫ সালে ২০ লাখ ২৪ হাজার, ২০১৪ সালে ১৭ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার। যা বছর বছর বৃদ্ধির সূচক বহন করছে। তবে প্রবৃদ্ধির হার এবার কমে গেছে। কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও। ২০১৬ সালে তা নেমে আসে ১৬ ভাগে। বিদায়ী ২০১৭ সালে তা প্রায় ১০ শতাংশে নেমেছে।
সার্বিকভাবে শিপিং বাণিজ্য খাত বিকাশের পথে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। এরমধ্যে রয়েছে মানসম্মত জাহাজবহরের ঘাটতি, বন্দরের জেটি-বার্থ, ইয়ার্ড, শেড, ট্রানজিট ওয়্যারহাউস, ভারী ও হালকা ইকুইপমেন্টস (যান্ত্রিক সরঞ্জাম), দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল, আইটির সমন্বয় বিশেষত পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, অফডকের (বেসরকারি স্থল কন্টেইনার ডিপো-আইসিডি) চরম অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা ইত্যাদি। এসব কারণে শিপিং খাতে যে হারে গতিবৃদ্ধির কথা প্রত্যাশিত সেই গতি বাড়ছে না। অথচ এসব সমস্যা-সঙ্কট উত্তরণের জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সবকিছু মিলে সমন্বয়হীন অবস্থা বিরাজ বিরাজ করছে।
এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বা অঞ্চলে যে পরিমানে কন্টেইনারজাত পণ্যসামগ্রী রফতানি হয়ে থাকে তার তিন ভাগের এক ভাগই থাকে খালি। সর্বিকভাবে বড় অংশই খালি কন্টেইনার বিদেশে রফতানি করে দিতে হচ্ছে। সেসব কন্টেইনার পণ্য বোঝাই করে ফের চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সামগ্রিকভাবে রফতানির তুলনায় আমদানি বেশি হওয়ায় অর্থাৎ বাণিজ্যিক ভারসাম্যের অভাবে এক তৃতীয়াংশ কন্টেইনার খালি রফতানি করতে হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল, ভূটানসহ ভূমিবেষ্টিত দেশগুলোর নিত্য ও ভোগ্য পণ্যসামগ্রী চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রফতানির সুযোগ নিশ্চিত করা হলে খালি কন্টেইনার রফতানির বাবদ বিরাট লোকসানের বোঝা শিপিং খাতকে বহন করতে হবে না। অতিসম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনকালে নেপালের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল বন্দর ব্যবহারের ব্যাপারে পুনরায় গভীর আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। তারা প্রস্তাব দিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যেসব খালি কন্টেইনার রফতানি হচ্ছে সেগুলোতে নেপালে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী রফতানি করা যাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ নেপালের প্রস্তাব বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে।
এদিকে সমুদ্র পরিবহনের খাতে চাহিদা ও চাপ সামাল দিতে গিয়ে প্রসারিত হচ্ছে শিপিং বাণিজ্য। সমগ্র বিশ্বে সাগর-মহাসাগর, উপসাগর ও উপকূলীয় নৌ-রুটে অর্থাৎ শিপিংয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাপক সুলভ। তার তুলনায় আকাশপথ, সড়ক ও রেলপথে পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল, ঝুঁকি ও অনেক ঝামেলাপূর্ণ। বিশেষত জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করার জন্য সা¤প্রতিক সময়ে সমগ্র বিশ্বেই সমুদ্রপথ ব্যবহার তথা শিপিং বাণিজ্য কাজে লাগিয়ে আমদানি ও রফতানি পরিচালনায় নির্ভরতা বেড়েই গেছে। এ ক্ষেত্রে কন্টেইনার বোঝাই পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে কন্টেইনার পরিবহন খাতে গত বছর ২০১৫ সাল থেকে প্রবৃদ্ধির হার লক্ষ্যণীয়ভাবে বাড়ছে। শিপিং সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগও আছে ব্যাপক। কিন্তু বিভিন্নমুখী সহায়ক উদ্যোগ, দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে আরও অবারিত সুযোগ-সম্ভাবনা উন্মোচনের পথ আটকে আছে।
শিপিংখাতের বিশেষজ্ঞরা জানান, মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমার উপর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বা মেরিটাইম বাউন্ডারি স্বীকৃত হওয়ার ফলে আন্তঃদেশীয়, আন্তঃমহাদেশীয় এবং দেশের অভ্যন্তরে নৌপথেও জাহাজ, ট্যাংকার, ফিডার জাহাজ, কার্গোজাহাজ, কোস্টার, বার্জ, ফেরিসহ বিভিন্ন ধরণের ছোট-বড়, মাঝারি আকারের নৌযান চলাচলেরর ব্যস্ততা এবং চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। এরজন্য দরকার সময়োচিত এবং সমন্বিত পরিকল্পনা। দিক-দিশেহারা অবস্থায় শিপিং খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে যাবে না। দেশের সমগ্র শিপিং সেক্টর প্রসারিত করা সম্ভব হলে প্রতিবেশী দেশসমূহে শিপিং পরিবহনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎপাদিত ওষুধ ও পেটেন্ট সামগ্রী, ভেষজ দ্রব্য, শাড়ী, বস্ত্র্র ও তৈরিপোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রট্রিক পণ্যসামগ্রী, সিরামিক পণ্য, প্লাস্টিকজাত দ্রব্যাদি, আসবাবপত্র, কৃত্রিম অলংকার-গহনা, তথ্য-প্রযুক্তি, আসবাবপত্র, হালকা ও মাঝারি আকৃতির কার্গো কোস্টার নৌযান, হালকা যন্ত্রপাতি, কেবলস, লোহা ও স্টিল সামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও বেকার্স খাদ্যদ্রব্য, খেলনা প্রভৃতি পণ্যসামগ্রী ও সেবা পণ্য রফতানির পথ হবে আরও সুগম। প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ খুলে যাবে। তবে এরজন্য বিশ্বের শিপিং বাণিজ্য-সফল দেশসমূহের মডেল অনুসরণ করে দেশের সমগ্র শিপিং খাতের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করা প্রয়োজন।

 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।