Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ভোটযুদ্ধে এগিয়ে জাপা ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে আ.লীগ-বিএনপির প্রার্থীরা

গ্রামীণ জনপদে ইউপি নির্বাচনের হাওয়া

প্রকাশের সময় : ২৭ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

শফিকুল ইসলাম বেবু, কুড়িগ্রাম থেকে

দ্বিতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার মধ্যে ভূরুঙ্গামারী ও চিলমারী উপজেলায় আগামী ৩১ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় দফায় রাজিবপুর উপজেলায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও সীমানা জটিলতার কারণে হাইকোর্ট সেখানে নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। এর বিরুদ্ধে পিটিশন দেয়া হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ফলে সবার চোখ এখন ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ৭ ইউনিয়ন এবং চিলমারী উপজেলায় ৬ ইউনিয়নসহ মোট ১৩ ইউনিয়নে। এবার দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যানরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে দলের অবস্থান ও ভোটার সংখ্যা নিয়ে আগাম কিছু জানা না গেলেও এই নির্বাচনের পর নিজ নিজ দলের অবস্থান জানতে পারবে সবাই। ফলে বাইরের উপজেলার লোকজনের চোখও এখন এই দুই উপজেলায়। এজন্য সাধারণ ভোটার, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও জনপ্রতিনিধিরা অপেক্ষায় আছেন শেষ পর্যন্ত কার গলায় জয়ের মালা শোভা পায়। ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, এই উপজেলার ৭ ইউনিয়নের মধ্যে জাতীয় পার্টি ৪টিতে, বিএনপি ২টিতে এবং আ.লীগ প্রার্থীরা ১টিতে এগিয়ে আছে। তবে দলীয় সমর্থকরা এটি মানতে নারাজ। তাদের কথা ভোটের পর এই হিসাব নিকাশ সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। এ ব্যাপারে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান খোকন চৌধুরী জানান, বর্তমান সরকার ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করছে। এই উন্নয়ন তরান্বিত করতে ৭ ইউনিয়নে আ.লীগ ব্যাপক ভোট পাবে। উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ওয়াহেদুজ্জামান সরকার জানান, এই উপজেলা হল জাতীয় পার্টির ঘাঁটি। এখানকার মানুষ এরশাদ ও লাঙ্গল ছাড়া আর কিছু বোঝে না। কোন অঘটন না ঘটলে আমরা ৭ ইউনিয়নে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো। এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে তিলাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও উপজেলা বিএনপির সেক্রেটারী ফরিদুল ইসলাম শাহিন শিকদার বলেন, ভূরুঙ্গামারীর মানুষ বেগম খালেদা জিয়াকে অন্তর দিয়ে ভালবাসে। তারা বিগত স্বৈরাচারী সরকার এবং বর্তমানের লুটপাটের সরকারকে ভোটের মাধ্যমে উচিত শিক্ষা দিতে তৈরী। এটা বুঝতে পেরেই সরকারদলীয় লোকজন আমাদের কর্মী-সমর্থকদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে দিচ্ছে না। তারা জিততে পারবে না জেনে নানান অপকৌশল করছে। আমাদেরকে হয়রানি করছে। আমরা প্রশাসনকে বারবার অভিযোগ করেও নিরাপত্তা পাচ্ছি না। সুষ্ঠুভোটের পরিবেশ থাকলে বিএনপি প্রার্থীরা ৭ ইউনিয়নে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে বলে আশা করছি। সরজমিন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ইউনিয়নগুলো ঘুরে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল তাদের নিজস্ব মতামতসহ সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীদের সম্পর্কে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। সাধারণ মানুষের কথা ভূরুঙ্গামারী মানুষ শান্তিপ্রিয়। কিন্তু বিশেষ একটি দলের কিছু বখাটে লোকজন পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। তবে যুব ভোটাররা খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন ভোট দেয়ার জন্য। ভূরুঙ্গমারী উপজেলার তরুণ সাংবাদিক আসাদুজ্জামান খোকন জানান, এবারে নারী ও যুব ভোটারদের উপর নির্ভর করবে জয় পরাজয়ের হিসাব। দলীয় প্রভাব সব জায়গায় পড়বে না। তিনি আশংকার কথা জানালেন, এবার মেম্বাররা দলীয়ভাবে প্রতীক না পাওয়ায় রয়েছে চরম বেকায়দা অবস্থায়। নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউনিয়নের মেম্বাররা প্রার্থীদের মধ্যে টাকা ছড়াছড়ি করছে। চলছে খিচুরী, বিরিয়ানি খাওয়াসহ ভোটারের বাড়ীতে বয়লার মুরগী পাঠিয়ে খাওয়া-দাওয়া। অপরদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কাছ থেকে জানা গেল কিছু ক্ষোভের কথা। বেশ কয়েকজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় খরচ ও বিড়ম্বনা বেড়েছে। আমরা আর্থিকভাবে কিছুটা সহায়তা পেলেও দলীয় লোকজনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। প্রতিদিন ওয়ার্ডভিত্তিক খরচের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আগে ভোটারদের কাছে যেতাম। এখন দলীয় লোকজন নিয়ে চলাফেরা করায় নির্দলীয় ভোটারদের কাছে ভিড়লে নানান অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া প্রতিদলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকায় তারা সমস্যা সৃষ্টি করছে। কেউ কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীর পক্ষে গোপনে কাজ করছে। ফলে চরম টেনশনে থাকতে হচ্ছে। এদিকে ৭ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে এলাকার ভোটার, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে জানা গেল। এই উপজেলার ৭ ইউনিয়নের মধ্যে আ.লীগ প্রার্থী আন্ধারীরঝাড়ে এগিয়ে আছে। বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে আছে তিলাই ও বলদিয়া ইউনিয়নে। অপরদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী পাইকেরছড়া, জয়মনিরহাট, বঙ্গসোনাহাট ও চর ভূরুঙ্গামারীতে এগিয়ে আছে। তবে এসব ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে। জানা গেল, তিলাই ইউনিয়নে প্রধান তিন দলের প্রার্থী রয়েছে। এরমধ্যে আ.লীগ থেকে আবুল হোসেন, বিএনপি থেকে ফরিদুল ইসলাম শাহিন শিকদার, জাতীয় পার্টি থেকে সাগর আলী মাস্টার ও স্বতন্ত্র হিসেবে বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নুরু। এই ইউনিয়নে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি প্রার্থী ফরিদুল ইসলাম শাহিন শিকদার। তিনি বিএনপি’র উপজেলা সেক্রেটারী। জাতীয় পার্টির প্রার্থী দুর্বল এবং বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম নুরু বিভিন্ন কাজে বিতর্কিত হওয়ায় বিএনপি প্রার্থীর সাথে আ.লীগ প্রার্থীর চূড়ান্ত লড়াই হবে বলে ভোটাররা জানান। পাইকেরছড়া ইউনিয়নে একই পিতার দু’সন্তান আ.লীগ ও বিএনপি থেকে প্রার্থী মনোনিত হয়েছে। এরমধ্যে আ.লীগের লুৎফর রহমান ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি এবং বিএনপির আব্দুর রহিম ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি। এই ইউনিয়নে অপর প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টি থেকে আব্দুর রাজ্জাক সরকার ও জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল জব্বার সরকার। এখানে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুর রাজ্জাক সরকার বর্তমানে এই এলাকার জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য একেএম মোস্তাফিজুর রহমানের জ্যাঠাতো ভাই। এখন পর্যন্ত সাধারণ ভোটারদের সমর্থন তার দিকে রয়েছে। তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন বিএনপি প্রার্থী আব্দুর রহিম। আ.লীগ প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় আ’লীগের অবস্থান এখানে নড়বড়ে। বর্তমান চেয়ারম্যান নজির হোসেন আ’লীগ থেকে মনোনয়ন না পাওয়ায় তিনি নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়ালেও তার সমর্থকরা জাতীয় পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জয়মনিরহাট ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জালাল উদ্দিন, বিএনপি প্রার্থী বাদল তালুকদার, জাতীয় পার্টি প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ সরকার, ন্যাপ-ভাসানী প্রার্থী শহিদুল ইসলাম এবং এখানে জাতীয় পার্টি থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় পার্টি ইউপি সভাপতি রফিকুল ইসলাম প্রধান আঙ্গুর। এই ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ সরকার কিছুটা এগিয়ে আছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী বাদল তালুকদারও পিছিয়ে নেই। এখানে লড়াই হবে সমানে সমান। আ.লীগ থেকে অপরিচিত লোককে প্রার্থী করায় আ.লীগ ভোটাররা বিপাকে পড়েছে। আ’লীগের জালাল উদ্দিন একজন তরুণ যুবক। তিনি এলাকায় থাকেন কম। নাগেশ্বরী কলেজে চাকরি করায় এলাকার লোকজনের সাথে তার উঠাবসা নেই। আন্ধারীরঝাড় ইউনিয়ন আ.লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে আ.লীগ থেকে দুজন প্রার্থী রয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থীকে আ.লীগ থেকে বহিষ্কার করায় কে হবেন পরবর্তী চেয়ারম্যান তা নিয়ে রয়েছে নানান জল্পনা কল্পনা। এখানে আ.লীগ প্রার্থীর সাথে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হয়েছেন ফজলুল হক মন্ডল। জাতীয় পার্টি থেকে জাবেদ আলী মন্ডল। বিএনপি থেকে উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি সোহেল হোসেন মনা। এই ইউনিয়নে আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন রাজু আহমেদ খোকন। বলদিয়া ইউনিয়নে এগিয়ে আছেন বিএনপির প্রার্থী প্রভাষক মোখলেছুর রহমান। তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জাতীয় পার্টি প্রার্থী মোজাম্মেল হক ব্যাপারী। তবে আ.লীগ প্রার্থী সহিদুল ইসলাম সহিদও লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই। এখানে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চর ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নে এগিয়ে আছেন জাতীয় পার্টি প্রার্থী ফজলুল হক। তার ঘারে নিঃশ্বাস ফেলছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম জুয়েল। এখানে বিএনপি প্রার্থী বাদশা আলম মিঠুও মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন দূরত্ব কমিয়ে আনার জন্য। বঙ্গ সোনাহাট ইউনিয়নে কিছুটা এগিয়ে জাতীয় পার্টি প্রার্থী ডা. শাহজাহান আলী মোল্লাহ। এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মাঈদুল ইসলাম লিটন সমানতালে লড়াই করছেন। তবে দুজনের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই বিদ্রোহী প্রার্থী আ’লীগের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ ব্যাপারী ও জাতীয় পার্টির একেএম মাকসুদুর রহমান রতন। দুজনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সবদিক থেকে বিবেচনা করলে এই ৭ ইউনিয়নে আ.লীগ প্রার্থীরা জোর লড়াই করলেও জাতীয় পার্টি ও বিএনপি প্রার্থীরা এক ইঞ্চি মাটি ছাড় দিবে না। এখন অপেক্ষার পালা শেষ পর্যন্ত কার গলায় জয়ের মালা শোভা পায়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।