Inqilab Logo

ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

শুঁটকিতেই হাজার কোটি টাকা

| প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

শান্ত সাগরে মাছ শিকারের এখন ভরা মওসুম : চর উপকূল দ্বীপাঞ্চলে শুঁটকি তৈরির ধুম : রসনাবিলাসী পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ : রফতানি চাহিদা ব্যাপক
শফিউল আলম : বঙ্গোপসাগর এখন শান্ত। মাছ শিকারের ভরা মওসুম। হাজারো ট্রলার নৌযানে হরেক প্রজাতির টনে টনে মাছ শিকার করা হচ্ছে। আহরিত মাছের একটি বড় অংশ থেকে শুঁটকি তৈরির জন্য বর্তমান রোদেলা শুষ্ক আবহাওয়া সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এরফলে দেশের বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক উপকূল, চর ও দ্বীপাঞ্চলে শুঁটকির কারবার জমজমাট। এ সময়টা পর্যটনেরও ভরা মওসুম বা পিক সিজন। শুঁটকি মাছ রসনাবিলাসী পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ। বৃহত্তর চট্টগ্রাম কক্সবাজারে বেড়াতে আসা দেশের বিভিন্ন এলাকার
পর্যটকগণ শখ করে উপকূলের শুঁটকি মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের তৃপ্তিকর নানান জাতের শুঁটকি মাছ। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শুঁটকি রফতানি বাজারের চাহিদা ব্যাপক হলেও তা আয়ত্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, শুঁটকি মহাল মালিকরা দাবি করছেন, সরকারের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও সমন্বয় থাকলে শুঁটকিতেই হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা অনায়াসে সম্ভব। কেননা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, নেপাল, ভূটান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহে বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকি মাছের কদর থাকায় বড় ধরনের চাহিদা অধরা রয়েই গেছে। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের প্রসার ঘটলে বিশেষত সামুদ্রিক মৎস্যরাজি এমনকি মিঠাপানির মাছেরও অপচয় রোধ হবে। সেই সাথে বাড়বে এই খাতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।
দেশের সর্ববৃহৎ শুঁটকি আড়ত ও মোকাম বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘সওদাগরী পাড়া’ আছদগঞ্জে অবস্থিত। আর সর্ববৃহৎ ও বেশি সংখ্যক শুঁটকি মহাল রয়েছে কক্সবাজার জেলায়। বাংলাদেশ ডিহাইড্রেশন সী-ফুডস রফতানিকারক সমিতি ও ব্যবসায়ীদের সূত্রগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে বার্ষিক গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি মাছ প্রস্তুত করা হয়। দেশের প্রায় সবখানেই শুঁটকি মাছ বেচা-কেনা হয়। বেশিরভাগ শুঁটকি কড়া রোদে শুকিয়ে অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি করা হয়। তাছাড়া বিভিন্ন স্থানে শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ২০টি কারখানা রয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি উন্নতমানের প্রায় ২শ’ কোটি টাকার শুঁটকি বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে বছরে অন্তত এক হাজার কোটি টাকার শুঁটকি রফতানি সম্ভব।
এদিকে সচরাচর এখানে-সেখানে যথেচ্ছ বা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শুঁটকি মহালগুলোতে স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ধরনের ক্ষতিকর কীটনাশক, রাসায়নিক, ফরমালিন প্রভৃতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে অনেকেই শুঁটকি খেতে চান না। ভোক্তা সাধারণ এবং রফতানিকারকরা বলছেন, শুঁটকির প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থা যাতে স্বাস্থ্যসম্মত হয় তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে ক্রেতাদের আস্থাশীল করে তুলতে হবে। এরজন্য প্রয়োজনে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিষমুক্ত ব্যবস্থায় তথা রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির ইতিবাচক উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে মান ও প্রকার-প্রজাতি ভেদে প্রতিকেজি শুঁটকি মাছ ৩শ’ টাকা থেকে ১ হাজার ৬শ’ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। মানসম্মত শুঁটকি মানুষের খাবার হিসেবে চাহিদা ছাড়াও ফেলনা ও খাবার অনুপযোগী শুঁটকি বা বর্জ্যসমূহ দেশে পোলট্রি ও মৎস্য খামারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধারণত প্রতি ৩ কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি তৈরি হয়। সমগ্র শুঁটকি খাতে প্রায় সারাদেশে ১০ থেকে ১২ লাখ লোক জড়িত। শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ও রোদে শুকানোর সর্ববৃহৎ মহাল রয়েছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়া পাড়া নাজিরার টেকে। এছাড়া কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও এর বিশেষত সোনাদিয়া, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, চকরিয়া, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম মহানগরী সংলগ্ন কর্ণফুলী, চরলাক্ষ্যা, চর বাকলিয়া, পতেঙ্গা, হালিশহর, কাট্টলী, সীতাকুÐ, স›দ্বীপ এলাকায় ব্যাপক পরিমাণে শুঁটকি তৈরি হয়। তবে সোনাদিয়া, রাঙ্গাবালি ও বাঁশখালীর শুঁটকি প্রসিদ্ধ। অত্যন্ত জনপ্রিয় শুঁটকি মাছের তালিকায় রয়েছে- ছুরি, চিংড়ি, লইট্টা, রূপচাঁদা, কোরাল, লাক্ষ্যা, সুরমা, পোয়া, ফাইস্যা, কাতরা, বিসা, রিঠা, হাঙ্গর, কাইক্যা, বাচা প্রভৃতি। বছরজুড়ে বঙ্গোপসাগর থেকে হরেক জাতের মাছ শিকার করা হয়। তবে শুঁটকি রোদে শুকানো বা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য মোক্ষম সময় হচ্ছে অক্টোবর থেকে মার্চ-এপ্রিল মাস পর্যন্ত।
এই খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শুঁটকি মাছ দেশে ও বিদেশে আরও ব্যাপক আকারে বাজার পেতে পারে। শুঁটকি হচ্ছে একটি অপ্রচলিত পণ্য। সেই বিবেচনায় সরকার যদি অবকাঠামো সুবিধা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও রাশিয়ার বিভিন্ন দেশে উত্তরোত্তর অধিক হারে শুঁটকি রফতানি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে জেলেরা অসহায়। তারা সুদি মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ করে জেলেরা যাতে নিজেরাই শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত করতে পারে এরজন্য সবার আগে প্রয়োজন বিনাসুদে অথবা স্বল্পসুদে ঋণ প্রদান করা। তাহলে জেলেরা দাদন ব্যবসায়ীদের কবল থেকে মুক্ত হবে। তাছাড়া শুঁটকি রফতানিকে উৎসাহিত করতে হলে বিশেষ রফতানি সুবিধা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদানের বিষয়েও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রায় এক কোটি লোক মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। খাদ্য থেকে প্রাপ্ত প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে মৎস্য ও মৎস্যজাত খাদ্যদ্রব্য থেকে। দেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু মাছের চাহিদা ২০ দশমিক ৪৪ কেজি। চাহিদার বিপরীতে বার্ষিক খাদ্য হিসাবে মাছ গ্রহণ করা হচ্ছে ১৮ দশমিক ৯৪ কেজি। অর্থাৎ ১ দশমিক ৫০ কেজি ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে গ্রহণকৃত মাছের আমিষের ৫ ভাগ আসে শুঁটকি থেকে। সামুদ্রিক মাছের প্রায় ২০ ভাগ শুঁটকি হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। বর্তমানে বছরে প্রায় ৭শ’ ২০ মেট্রিক টন শুঁটকি বিদেশে রফতানি হচ্ছে। সমন্বিত পরিকল্পনা থাকলে রফতানির হার তিনগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।



 

Show all comments
  • আহমদ উল্লাহ ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮, ২:৪৯ এএম says : 0
    ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শুঁটকিত

২৭ জানুয়ারি, ২০১৮
আরও পড়ুন