Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ২৯ কার্তিক ১৪২৫, ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

ছিনতাইকারীর কাছে অসহায় নগরবাসী

গতকাল ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে নির্মমভাবে প্রাণ গেল দু’জনের

| প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

সাখাওয়াত হোসেন : রাজধানীতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারী চক্র। সাধারণ মানুষ ছিনতাইকারীদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন। এখন কেউ নিরাপদে-নির্বিঘেœ আর পথ চলতে পারছেন না। অহরহ ঘটা ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্ক সাধারণ মানুষের মধ্যে। গতকাল ভোরে ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে ছিনতাইকারীর গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল একটি বেসরকারি হাসপাতালের নারী কর্মী হেলেনা বেগমের। হেঁটে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে ছিনতাইকারীরা হাতের ব্যাগ ধরে টান দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই গাড়িতেই পিষ্ট হন তিনি। অন্যদিকে গতকাল ভোরে গেন্ডারিয়ার স্বামীবাগ সায়দাবাদ রেললাইনের পাশের গলিতে ইব্রাহিম (৩৫) নামে এক ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা। দু’টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। নিহতদের লাশ ময়না তদন্তের পর আত্মীয় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর দয়াগঞ্জে ছিনতাইয়ের সময় মায়ের কোল থেকে পড়ে আরাফাত নামের পাঁচ মাসের এক শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়। গত বছর নভেম্বরে মতিঝিলে হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার সময় রিকশা থেকে পড়ে গুরুত্বর আহত হন এফবিসিসিআইয়ের এক নারী কর্মকর্তা। গত ৮ অক্টোবর ভোরে ওয়ারী এলাকাতেই ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আবু তালহা নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিহত হন। তালহা ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে বাসার সামনের রাস্তায় ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখে তালহা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করেন। এ সময় এক ছিনতাইকারীকে ধরে ফেললে তার সঙ্গীরা তালহাকে ছুরিকাঘাত করে। পরে তালহা মারা যায়।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ঢাকায় ছিনতাইসহ যেকোনো অপরাধ ঠেকাতে র‌্যাব কাজ করছে। কিছু ক্ষেত্রে ত্বরিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঠেকানো সহজ বিষয় নয়। র‌্যাব প্রতিনিয়তই ছিনতাইকারীসহ অন্যান্য অপরাধীদের গ্রেফতার করছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারানোর বিষয়টি কারো কাম্য নয়। এরই মধ্যে র‌্যাবের হাতে অনেক ছিনতাইকারী ধরা পড়েছে। র‌্যাব এ ধরনের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মারুফ হোসেন সরদার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ধানমন্ডির ছিনতাইয়ের ঘটনায় আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গাড়ি ও ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। ছিনতাইকারীদের গ্রেফতারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ছিনতাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে বলে তিনি জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে বেশ কিছু এলাকায় দামি গাড়িতে করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। প্রকাশ্যেই এই গাড়িগুলো রাস্তায় চলছে। এমনকি নম্বরপ্লেট ছাড়াও এই গাড়িগুলো রাস্তায় চলাচল করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে।
নিহতের নারীর স্বামী মনিরুল ইসলাম হাসপাতালে সাংবাদিকদের জানান, হেলেনা বেগম তার সঙ্গেই বরিশাল থেকে লঞ্চে করে গতকাল শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে ঢাকা পৌঁছান। ধানমন্ডি ৭ নম্বরে বাস থেকে নেমে সড়ক পার হতে গেলে সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার থেকে দুর্বৃত্তরা হেলেনার হাতের ব্যাগ ধরে টান দেয়। এতে হেলেনা গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। ছিনতাইকারীরা তার ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত হেলেনা বেগম গ্রিন রোডের গ্রিন লাইফ হাসপাতালের একজন আয়া ছিলেন। হাসপাতালের পাশেই তিনি থাকতেন। ধানমন্ডি থানার ওসি (তদন্ত) মো. পারভেজ ইসলাম জানান, বরিশালে ছুটি কাটিয়ে গতকাল ভোরে স্বামী মনিরুল ইসলামের সঙ্গে লঞ্চে করে ঢাকায় ফেরেন হেলেনা। ঘটনার পর খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, গতকাল শুক্রবার ভোরে ৫টার দিকে স্বামীবাগ এলাকায় চার-পাঁচজন ছিনতাইকারী মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে তাকে ছুরিকাঘাত ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপায় ছিনতাইকারীরা। এরপর তিনি দৌড়ে সালাউদ্দিন হাসপাতালের সামনে আসেন। ওই হাসপাতালে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এরপর সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে ভোর ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তার পকেটে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল ফোন সেট পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ছিলেন মো. ইব্রাহিম। তার ক্ষতবিক্ষত শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। তবু থামেননি। দৌড়াতে দৌড়াতেই হাসপাতালে পৌঁছান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেয়ার পথে চিরদিনের মতো থেমে যায় তার এই জীবনের দৌড়। ইব্রাহিমের স্বজন ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় শেখপাড়ায় থাকতেন এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ইব্রাহিম। মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশের ব্যবসা রয়েছে তার। ব্যবসার কাজে প্রায়ই ঢাকায় আসতেন ইব্রাহিম। ঘটনার আগে নারায়ণগঞ্জে গিয়েছিলেন তিনি। তার পকেটে নারায়ণগঞ্জের বাসের টিকিট পাওয়া গেছে। সেখান থেকেই ঢাকায় ফেরেন তিনি। এরপরই এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত ইব্রাহিমের ভাগ্নে বাদল বলেন, সায়েদাবাদ এলাকার স্বামীবাগ রেললাইনের আশপাশের কোনো এলাকায় হয়তো ইব্রাহিমকে দুর্বৃত্তরা কুপিয়েছে। এ অবস্থায় এক কিলোমিটারের বেশি পথ রক্তাক্ত অবস্থায় দৌড়ে সালাউদ্দিন হাসপাতালে আসেন তিনি। তার বুকের ডান পাশে দুটি, বাঁ পাশের বুকের কিছু ওপরে একটি, ডান পায়ে দুটি এবং বা হাতে একটি করে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার সোহেল রানা সাংবাদিকদের বলেন, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিন-চার দিন আগে তিনি ঢাকায় আসেন। নবাবপুর একটি হোটেলে উঠেছিলেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিনই। শুধু রাতের বেলায় নয়, দিনের বেলায়ও বিভিন্ন এলাকায় সমানতালে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে টানা পার্টির দৌরাত্ম্য। যারা ছোঁ মেরে ব্যাগ, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকাসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। ছিনতাইকারী থাবায় পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন কেউ কেউ। পুলিশ ও ডিবির হাতে ধরা পড়লেও এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর অন্তত দেড় শতাধিক স্পটে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব ছিনতাইকারী চক্রের প্রত্যেকটি দলে তিন থেকে পাঁচজন করে সদস্য রয়েছে। যারা বিভিন্ন স্পটে শিকারের আশায় ওঁৎপেতে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের কেউ কেউ মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার নিয়েও সংশ্নিষ্ট এলাকায় টহল দিতে থাকে। বিশেষ করে ভোরে লঞ্চ, বাস ও ট্রেনে করে যারা ঢাকায় আসছেন কিংবা ঢাকার বাইরে যান, তাদের টার্গেট করা হয়। এ ছাড়া ট্রাফিক সিগন্যালে কিংবা ব্যস্ততম সড়কে যানজটের অপেক্ষায় থাকে টানা পার্টির ছিনতাইকারী সদস্যরা। ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনার সত্যিকার ও সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই পুলিশের কাছে। কারণ, ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া সত্তে¡ও মানুষ বাধ্য না হলে থানায় গিয়ে কোনো অভিযোগ করেন না হয়রানির ভয়ে। অনেকে ছোটখাটো আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও থানায় বিষয়টি অবহিত করেন না। ফলে ছিনতাই বৃদ্ধির বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কাছেও অনেকাংশে অজানা থেকে যাচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের সূত্র মতে, ঢাকার মাসে গড়ে মাত্র ১৮-২০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কিন্তু ভুক্তভোগী, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকরি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের হিসাব মতে, ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনা পুুলিশের হিসাবের চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। ছিনতাইকারীদের দাপট এতটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে যে, সাধারণ মানুষ তো বটেই; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের হাতে। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকা, বাড্ডা, বনানী, খিলক্ষেত, ভাষাণটেক, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, গুলিস্তান, রামপুরা, হাজারীবাগ, মেরুল বাড্ডা, মহাখালী, গুলশান, পান্থপথ, ফার্মগেট, ওয়ারী, মৌচাক, হাতিরঝিল, শান্তিগর, কাকরাইল, সায়েদাবাদ, ফুলবাড়িয়া, বাবুবাজার, রাজারবাগ, কমলাপুর, ধানমন্ডিসহ মহানগরীর থানা এলাকায় অন্তত প্রায় দেড় শতাধিক ছিনতাইয়ের স্পটে মোটরসাইকেলে ও মাইক্রোবাসে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ছিনতাই করা হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর