Inqilab Logo

সোমবার, ১৬ মে ২০২২, ০২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৪ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরী

আ’লীগের দাপটে খুলনায় অন্যসকল দলের ভরাডুবি!

প্রকাশের সময় : ২৭ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এটিএম রফিক, খুলনা থেকে : প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে ব্যস্ত দেশবাসী। সারাদেশের ন্যায় খুলনার ৬৭টি ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। তাছাড়া ভোট কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে না পারা, দলীয় মনোনয়ন ও যথাযথ প্রার্থী বাছাইয়ের নাজুক পরিস্থিতি এবং তৃণমূল নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী মাঠে না থাকায় বিএনপিসহ সব দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতাও ফুটে উঠেছে। যে কারণে ক্ষমতাসীনদের দাপটের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি খুলনা জেলার হেভিওয়েট নেতারা।
ইউপি নির্বাচনে খুলনায় ২৬টিতে লাঙ্গল প্রতীক দিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। জাতীয় সংসদের বিরোধী দল সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে সকলেই পরাজিত হয়েছেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে প্রতিনিধিত্ব-ই থাকলো না পল্লীবন্ধু সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা)। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের, বিএনএফ এবং জাসদের প্রার্থীরাও জামানত হারিয়েছেন। ১৩ ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে স্বতন্ত্রের আবরণে প্রার্থী দিলেও জয়ী হয়েছে ফুলতলার একটিতে। খুলনার ৬৭টি ইউনিয়নের ফলাফল পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে, খুলনার ডুমুরিয়ার রঘুনাথপুর ইউনিয়নে ৪ বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান গাজী তফসির আহমেদ, রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের খান জুলফিকার আলী জুলু টানা ১৯ বছর পরিষদের চেয়ারম্যান, তার পাশ্ববর্তী শ্রীফলতলা ইউনিয়নে বার বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান এসএম মনিরুল হাসান বাপ্পী, ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউপি’র ৪ বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান শেখ মোঃ বদরুজ্জামান তসলিম, উপজেলা সদর ইউনিয়নে বার বার নির্বাচিত মোল্লা মোশারফ হোসেন মফিজ, আটরা-গিলাতলার মীর কায়সেদ আলী, বটিয়াঘাটার খান খায়রুল ইসলাম জনি, কয়রার উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের সরদার মতিউর রহমান, রূপসার নৈহাটির সাবেক চেয়ারম্যান মোল্লা সাইফুর রহমানসহ বিএনপি’র বাঘা-বাঘা প্রার্থীদের এজেন্ট ছিল না কেন্দ্রে। নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা দিতে র্ব্যর্থতা, প্রশাসনের বৈরী ব্যবহার, আর্থিক সংকট ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই খুলনা বিএনপি’র হেভিওয়েট সব প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন বলে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ। জমা দিতে যাওয়ার সময়েই মনোনয়নপত্র ছিনতাইয়ের শিকার হন তেরখাদা সদর ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। ফলে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াহেদুজ্জামান। এমন কি ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বয়কট করেন বটিয়াঘাটার সুরখালী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মুসফিকুর রহমান সাগর। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হাদী সরদারের দাপটে মাঠে দাঁড়াতে পারেননি তিনিও। ফুলতলার জামিরা ইউনিয়নের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা ড. মামুন রহমান রয়েছেন লন্ডনে। এখানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব শেখ হারুন অর রশীদ সরদারের পক্ষে স্থানীয় নেতা-কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেননি। জামায়াতের প্রার্থী সাইদুল হাসান খান নির্বাচিত হলেও বিএনপি’র প্রার্থী অবস্থান সর্বশেষ বা চর্তুথতম। আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলেও সুবিধা করতে পারেনি বিএনপি। এখানে জামায়াতের প্রার্থীকেই ভোট দিয়েছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। আবার, দামোদর ইউনিয়নে একাধিকবার নির্বাচিত প্রয়াত চেয়ারম্যান সরদার আবুল কাশেম; তার ছেলে দু’বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান শহীদ আবু সাঈদ বাদলের স্ত্রী সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান জাকিয়া হাসিন বিনাও পরাজিত হয়েছেন। বংশ পরম্পরায় নেতৃত্ব দিয়ে আসলেও দামোদর ইউনিয়নের প্রতিটি কেন্দ্রের প্রত্যেকটি বুথে এজেন্ট দিতে পারেননি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী। পাইকগাছার কপিলমুনি ইউনিয়নে গত দু’বার নির্বাচিত সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন ডাবলু বিএনপি’র নেতা-কর্মীদের দলীয় প্রতীক ধানের শীষের পক্ষে প্রচার-প্রচারণায় নামাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি নেতা-কর্মীদের বলতেন, ‘ব্যক্তি ডাবলু’র পক্ষে ভোট চাইতে, ধানের শীষে নয়।’ তাছাড়া বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নেতা-কর্মীদের পাশে না থাকা ও আ’লীগের সাথে সখ্যতার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সূত্রে জানা গেছে, ডুমুরিয়ার সাহস ইউনিয়নে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী জয়নাল আবেদীন নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু তাই নয়, কয়েকটি ইউনিয়নে বিজয়ী প্রার্থীর মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতার স্থানটিও দখল করেছেন বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীরা। আবার, ডুমুরিয়ার মাগুরঘোনা ইউনিয়নে আবুল কালাম শামসুদ্দিনকে বিএনপি মনোনয়ন দেয়। কিন্তু দলের বিদ্রোহী প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোড়লের পক্ষে কাজ করেছেন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। ফলে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ! বিএনপি’র জেলা, উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা এক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা হারিয়েছেন বলে অভিযোগ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের। সরেজমিন দেখা যায়, নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার দুপুর ১টা ২০ মিনিটে রূপসার আইচগাতী ইউনিয়নের বেলফুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের কোন এজেন্ট দেখা যায়নি। পক্ষান্তরে, বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ও পাইকগাছার সোলাদানা ইউনিয়নে নেতা-কর্মী-সমর্থকদের শক্ত অবস্থান এবং জনসমর্থন প্রার্থীদের পক্ষে থাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরাই জয়লাভ করেছেন।
তবে সাংগঠনিক দুর্বলতা নেই বলে দাবি করেছেন খুলনা বিএনপি’র নির্বাচন পরিচালনা সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. শফিকুল আলম মনা। তিনি বলেন, বিএনপি দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। সরকারি দলের দাপটে বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা দাঁড়াতেই পারেননি। তাছাড়া প্রশাসনকে ব্যবহার করেই আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীরা কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এতে প্রমাণিত হল আওয়ামী লীগের অধীনে কোন নির্বাচনই অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সদ্য সমাপ্ত ইউপি নির্বাচনে খুলনার ৬৭টির মধ্যে ২৬ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। তাদের মধ্যে ১২ জনই জামানত হারিয়েছেন। যদিও আ’লীগের মনোনয়ন পেয়েও পাইকগাছার হরিঢালী ইউনিয়নে বেনজীর আহমেদ বাচ্চু ও কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের এম ইব্রাহিম জামানত হারিয়েছেন। এছাড়া বিএনপি’র ২২জন, (৪৫টি ইউনিয়নে প্রার্থী দিয়ে) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১৬জন, ওয়ার্কার্স পার্টির দু’জন, খেলাফত মজলিসের একজন, জাসদের তিনজন, সিপিবি’র একজন, জেপি’র ৪ জন ও বিএনএফ’র তিনজন প্রার্থীই জামানত হারিয়েছেন।
জেলা জাপা’র সভাপতি মোঃ শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, ‘যেভাবে নির্বাচন হয়েছে তাতে আমাদের পার্টির নেতাকর্মীরা বাইরেই বের হতে পারেননি। নির্বাচনের দিন তো কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও জাল ভোটের উৎসব হয়েছে। আর কিছু বলার নেই।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহ ইমরান বলেন, নির্বাচন সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাই না। আমাদের সকলেই নতুন প্রার্থী, এবার পরিচিতি হল, ভবিষ্যতে আশা করা যায় ভাল ফলাফল হবে। জেপি’র খুলনা জেলা সভাপতি শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, খুলনায় এবার ইউপি নির্বাচনেই প্রথমবারের মত ৪ জন দিয়েছিলাম আমরা। নতুন পার্টি। এবার পরিচিতি হল। আগামীতে প্রতিদ্ব›িদ্বতায় আসতে পারবে জেপি।
জাসদ’র জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক স ম রেজাউল করিম বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এটা বলা যাবে না। আওয়ামী লীগের কারণেই আমাদের প্রার্থীরা হেরেছে, আমাদের ভরাডুবি হয়েছে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আ’লীগের দাপটে খুলনায় অন্যসকল দলের ভরাডুবি!
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ