Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০১৯, ০১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১২ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

স্যারের জন্মদিন

প্রকাশের সময় : ২৮ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

নারায়ণ চন্দ্র রায়
রনজিত মল্লিক। বি, এ পাশ করে স্থানীয় একটি হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি নিয়েছেন। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব বেশি নয়। গাড়িতে করেও যাওয়া যায়। আবার হেঁটেও স্কুলে যাওয়া যায়। রনজিত বাবু গাড়িতে খুব কমই যাতয়াত করেন। মাসের বেশির ভাগ সময় হেঁটেই স্কুলে যাতায়াত করেন। গ্রামের রাস্তায় দুই পাশে গড়ে ওঠা দেবদারু, হিজল, কড়–ই, খেজুর, তালগাছ, কলা-বাগান ও আম-কাঁঠালের বাগান এবং বাঁশ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে তিনি প্রতিদিন স্কুলে যাতায়ত করেন। রনজিত বাবু স্কুলে চাকরি নেওয়ার আগে তিনি বেশ কয়েক বছর শহরের একটি ওষুধের দোকানে সেলস ম্যানের চাকরি করেছেন। অভাবের সংসার। নুন আনতেই পান্তা ফুরিয়ে যায়। রনজিত বাবু টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন। অনেক গুলো ভাই বোন। বড় সংসার। রনজিত মল্লিকের বাবা জমিদার বাবুর খেতে-খামারে কাজ করেন। পাশাপাশি অন্যের জমিতে বর্গা করেন। প্রতি বছর বর্গা জমি থেকে যে ধান পান এতে করে ভোলানাথ মল্লিকের সংসার চলতে চায় না। ফলে বছরের ৩/৪ মাস ভোলানাথ মল্লিক ও তার স্ত্রীকে সংসার চালাতে হয় ধার-দেনা এবং ঋণ করে। এছাড়া ভোলানাথ মল্লিক জমিতে শাক-সবজি চাষ করেন। নিজের খাবারের পাশাপাশি বাজারে বিক্রিও করেন। এতে করে প্রতি বছর বেশ মোটা অংকের টাকা লাভ হয়। এ বছর হঠাৎ করে দেশে বন্যা হওয়ায় ভোলানাথ মল্লিকের ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হয় ভোলানাথ মল্লিককে।
এ দিকে অনেক কষ্ট করে বি, এ পাশ করেন রনজিত মল্লিক। তিনি বি, এ পাশ করে গ্রামের পরের এক গ্রামের পরের এক গ্রামের একটি স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি নেন। রনজিত বাবু স্কুলে চাকরি পাওয়ার পেছনে ওর স্যারের অবদান সব চেয়ে বেশি ছিল। ওর স্যারই ওকে স্কুলের শিক্ষকতার চাকরিটা পাইয়ে দেন। রনজিত মল্লিকের সেই শিক্ষকের নাম মোহাম্মদ আলী। তিনি রনজিতের স্কুল শিক্ষক। রনজিত মল্লিকের একজন প্রিয় শিক্ষক এই আলী স্যার। ওর স্যারই একদিন রনজিতকে শুন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের কথাটি জানিয়েছিল। সে আর দেরি না করে চটজলদি বায়োডাটাসহ দরখাস্ত জমা দিল। ভাইবা পরীক্ষা নেওয়ার পর নরজিত মল্লিককে স্কুলে জয়েন করার জন্য বলা হল। রনজিত মল্লিক মঙ্গলবার দিন স্কুলে জয়েন করেন। নতুন স্কুল, ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই নতুন। জায়গাটিও নতুন। একদম অচেনা পরিবেশ। প্রথম দিন প্রধান শিক্ষক সাহেব রনজিত মল্লিককে তৃতীয় শ্রেণীর ইংরেজি ক্লাশে নিয়ে গেলেন। রনজিত মল্লিককে ক্লাশেল ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। এরপর স্কুলের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অন্যান্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল।
ক্লাশে পরিচয় পর্বের একপর্যায়ে ইউসুফ ও সুজন দাঁড়িয়ে রনজিত স্যারকে জিজ্ঞেস করল, স্যার আপনার জন্ম দিন কবে? স্যার বললেন, আমার জন্ম দিন ২৮ শে আগস্ট। কিছু দিন পর ইউসুফ ও সুজন রনজিত স্যারকে বলল, স্যার আমরা একটা ক্লাশ পার্টি করতে চাই। স্যার ওদের কাছে জানতে চাইলেন, তোমরা কি ধরনের ক্লাশ পার্টি করতে চাও। ইউসুফ বলল, স্যার আমরা আপনার জন্ম দিন পালন করতে চাই। স্যার বললেন, তোমারা আমার দিনের অনুষ্ঠান করবে সে ভালো কথা। কিন্তু টাকা পাবে কোথায়? সুজল বলল, স্যার আমরা সবাই ৫০ টাকা করে চাঁদা তুলবো। রনজিত স্যার বললেন, তোমার জণ্য ৫০ টাকা অনেক বেশি হয়ে যাবে। তোমরা বরং ১০ টাকা অথবা ২০ টাকা করে তোল। রনজিত স্যার প্রথমে রাজি ছিলেন না। ছাত্র-ছাত্রীদের পিরাপীরিতে শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। রনজিত স্যার পরে ওদেরকে বললেন, জন্ম দিন অনুষ্ঠানের সমস্ত টাকা আমি দিব। তোমাদেরকে দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা কেউ রাজি হল না। স্যার তখন অনেক খরচের টাকা দিতে চাইলেন। ওরা সেটাও রাজি হল না। ইউসুফ ও সুজনের সঙ্গে ক্লাশের সবাই কন্ঠ মিলিয়ে বলল, স্যার আপনাকের কিছুই দিতে হবে। আপনি শুধু আপনার জন্ম দিন পালন করার অণুমিত দিন। স্যারের এখানে কিছুই বলার নেই, কিছুই করার নেই। স্যার নিরব হয়ে রইলেন। এ দিকে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীরা সবাইকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বিষয়টি কাউকে বলেনি, গোপন রেখেছিল।
সে যাই হোক দেখতে দেখতে একদিন চলে এল দীর্ঘ প্রতীক্ষার সেই মহেন্দ্রক্ষণ। ক্লাশ রুমেই জন্ম দিনের পার্টির আয়োজন করাহ ল। সকল শিক্ষক-শিক্ষিকারা যথাসময়ে চলে এলেন এবং নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের বক্তব্য দেওয়ার পর পরই কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডাকা হল রনজিত মল্লিক স্যারকে। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আজ সত্যিই খুব আনন্দিত এবং গর্বিত। সত্যি কথা বলতে কি আমি আমার জন্ম দিনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তোমরা আমার জন্ম দিনের কথাটি মনে রেখেছো। এজন্য তোমারদেরকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। রনজিত স্যার আরও বললেন, আমার আজ সত্য বলতে বাঁধা নেই। আমর পয়ত্রিশ বছর বয়সে কোন দিন আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি। আমাদের ফ্যামিলি থেকেও যে আমার জন্ম দিন পালন করা হয়েছে এমনটিও জানা যায়নি। আমার মা-বাবা, ভাই-বেকান, এবং আমার ফ্যামিলি কখনও আমার জন্ম দিন পালন করেনি, তোমারা আজ আমার জন্ম দিন পালন করে আমার বাব-মায়ের কর্তব্যটাই পালন করলে। আমি তোমাদের কাছে ঋণি। রনজিত স্যারের চোখে এ সময় জল টলমল করছিল। মল্লিক স্যার তার পুরো বক্তব্য শেষ না করেই বক্তবের সমাপ্তি টানেন।
এর আগে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, সকল স্যার-ম্যাডামসহ নরজিত স্যারকে সঙ্গে নিয়ে ‘মল্লিক স্যারের জন্ম দিনের’ কেক কাটা হয়। নরজিত স্যার তার প্রিয় ছাত্র ইউসুফ এবং সুজনকে নিয়ে কেক কাটছিলেন এবং উপস্থিত সবাই এ সময় বলছিল হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ মল্লিাক স্যার। ছাত্র-ছাত্রীরা একজন একজন করে মল্লিক স্যারকে জন্ম দিনের কেক খাইয়ে দিচ্ছিল এবং মল্লিক স্যারও ছাত্র-ছাত্রীদের পাশপাশি অন্যান্য স্যার-ম্যাডামদের কেক খাইয়ে দিচ্ছিলেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন