Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬, ১৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

যন্ত্রণার নাম হানিফ ফ্লাইওভার

অব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাচারিতায় উপরে-নিচে ভয়াবহ যানজট : কর্তৃপক্ষের সাথে ডিএসসিসির যোগসাজশে ৪ বছরেও সংস্কার হয়নি নিচের রাস্তা : এখনও ফ্লাইওভারের উপরে ৮টি স্থানে বাস দাঁড়ায় : তদবিরে নি

নূরুল ইসলাম : | প্রকাশের সময় : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

যন্ত্রনার নাম যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। উঠতে-নামতে এমনকি ফ্লাইওভারের উপরেও যানজট। কখনও কখনও সেই যানজট গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অবহেলার কারনে দিন দিন এ যানজট ভয়াবহ আকার ধারন করছে। ভুক্তভোগিদের মতে, ফ্লাইওভারের মুখসহ উপরের বিভিন্ন স্থানে বাস ও টেম্পু দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, বিভিন্ন যানবাহনকে ফ্লাইওভারে উঠতে বাধ্য করা, টোলবুথে অধিক সময় ব্যয় করাসহ নানা কারনে এ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে করে টাকা দিয়ে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদেরকে। অভিযোগ উঠেছে, ফ্লাইওভার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগসাজশ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যাত্রাবাড়ী জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গত চার বছরেও ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা সংস্কার করেনি। গাড়িগুলোকে ফ্লাইওভারে উঠতে বাধ্য করতেই এই কৌশল নেয়া হয়েছে। শুধু মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার নয়, রাজধানীর যানজট নিরসনে ফ্লাইওভারগুলো তেমন কোনো কাজে আসছে না। প্রকৃতপক্ষে এগুলো বিভিন্ন এলাকায় যানজট বাড়াচ্ছে।
২০১৩ সালের অক্টোবরে চালু হয় গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। ঢাকার সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল এ ফ্লাইওভারের সাফল্য নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে ফ্লাইওভারটি থেকে নামার পরই যানবাহনকে প্রচন্ড যানজটের মুখে পড়তে হতো। এখন উঠতে গিয়েও একই অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিন এই যানজট এতটাই বেড়ে যায় যে, ফ্লাইওভারের উপরেও কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এতে করে যাত্রীদের ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীতে ফ্লাইওভারের মুখে বিভিন্ন বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে করে পেছনের দিকের গাড়িগুলোর দীর্ঘ লাইন তৈরী হচ্ছে। একই স্থানে ফ্লাইওভারের নিচের দিকের রাস্তাটি অত্যন্ত সরু হওয়ায় একটার বেশি গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম ৮ লেন মহাসড়ক থেকে ফ্লাইওভারের নিচের সরু রাস্তায় আগে প্রবেশ করতে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তাটি গত চার বছর ধরে ভেঙে একাকার হয়ে আছে। একটা একটা করে গাড়ি প্রবেশ করে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে চলতে না পারায় পেছনে বিশাল লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার ট্রাফিক পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ফ্লাইওভারের মুখে সব সময় ৮/১০টি লোকাল বাস দাঁড়িয়ে থাকে। এতে করে ৮ লেন মহাসড়ক ধরে আসা গাড়িগুলো ফ্লাইওভারে প্রবেশ করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এক পর্যায়ে তা ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, রাস্তার উপর বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানোর জন্য কয়েকটা বাসের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছিলাম। এতে উল্টো কথা শুনতে হয়েছে। আমাদেরকে বলা হয়েছে, ফ্লাইওভার যেহেতু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, সেহেতু তারা তাদের লোকবল দিয়ে যা করার করবে। এ কারনে টাফিক পুলিশ সেখানে আর ডিউটি করতে রাজি হয় না। ট্রাফিক পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তাটি ইচ্ছে করে সরু করা হয়েছে। তার উপর গত চার বছর ধরে রাস্তাটি চলাচলের অযোগ্য পড়ে আছে। পায়ে হাঁটার মতো অবস্থা নেই। গাড়িগুলো যাতে ফ্লাইওভারে ওঠে এজন্যই রাস্তাটি ফেলে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাস্তাটি মেরামত করার জন্য বহুবার বলেছি। কিন্তু কেউই আমাদের কথায় কান দেয়নি। তার ভাষায়, গাড়িগুলো যদি স্বাভাবিক গতিতে চলতে না পারে তাহলে যানজটতো হবেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারটি যে লক্ষ্যে করা হয়েছিল তা কার্যত সফল হয়নি। স¤প্রতি অর্থমন্ত্রীর এক বক্তব্যে এর প্রমাণও মেলে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ফ্লাইওভারটি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী লিখেছেন, “মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার অনেক ঢাকঢোল বাজিয়ে শুরু হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তার গুরুত্ব তেমন থাকেনি। কিন্তু প্রকল্প সম্পাদিত হয়েছে। এর হিসাব-নিকাশ চ‚ড়ান্ত করা দরকার। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং সেতু বিভাগ যৌথভাবে বিষয়টি সমাধানের জন্য সুপারিশ করুন।’ সূত্র জানায়, হানিফ ফ্লাইওভারের ব্যয় নিয়ে জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে এ চিঠি দেওয়া হয়।
এদিকে, চালু হওয়ার পর পরই হানিফ ফ্লাইওভারে সিঁড়ি লাগিয়ে যাত্রীওঠানামা করানো হতো। বাসগুলো ফ্লাইওভারের উপরেই দাঁড়াতো। শুরুর প্রথম বছরে পর পর কয়েকটি দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যূর ঘটনায় সিঁড়িগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০১৬ সালে আবার নতুন করে সিঁড়িগুলো খুলে দেয়া হয়। একই সাথে নতুন নতুন মিলিয়ে মোট ৭টি সিঁড়ি লাগানো হয়। ফ্লাইওভারের উপরে বাস ও টেম্পু স্ট্যান্ডও বানানো হয়। গাড়িগুলো যাতে দ্রæত গতিতে চলতে না পারে সেজন্য ওপরের রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত গত বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশে সিঁড়িগুলো অপসারণ করে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। এখন সিঁড়ি না থাকলেও ফ্লাইওভারের উপরে কমপক্ষে ৮টি স্থানে বাস ও টেম্পু দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করায়।
ভুক্তভোগি শ্যামলী পরিবহনের চালক আব্দুল মালেক বলেন, কুমিল্লা থেকে চার লেন মহাসড়ক ধরে ঢাকার শনিরআখড়া পর্যন্ত আসতে চার ঘণ্টা সময় লাগলে হানিফ ফ্লাইওভারের কারনে সায়েদাবাদ টার্মিনাল পর্যন্ত পৌঁছতে আরও এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে। বিষয়টির দিকে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া দরকার।
এদিকে, হানিফ ফ্লাইওভার থেকে নামতে গিয়েও ভয়াবহ যানজট এখন নিত্যসঙ্গী। ফ্লাইওভারের গুলিস্তান প্রান্তে বাসগুলো এলোপাথারিভাবে ঘুরতে গিয়ে যানজটের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, যে সব বাস শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে আসা যাওয়া করে সেসব বাস খেয়াল খুশি মতো ঘুরানো হয় ফ্লাইওভারের মুখে। তারাবো বাসের এক হেলপার জানান, বাসগুলো এভাবে ঘুরানোর জন্য গুলিস্তানের ট্রাফিক পুলিশকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। তা না হলে তারা বাসগুলো চলতেই দিবে না। ওই হেলপার জানায়, এভাবে শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে আসা যাওয়া করার অনুমতি কোনো বাসের নেই।
ফ্লাইওভারের ঢাকা মেডিকেল প্রান্তের আরও করুণ দশা। এখানে রাতদিন দীর্ঘ যানজট লেগে থাকে। এই প্রান্ত গুলিস্তান থেকে এক লেনের হওয়ায় একটার পেছনে আরেকটা গাড়ি আটকে থাকে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা মেডিকেলের আগে আনন্দবাজারের দিকে নামার জন্য একটি রাস্তা আছে। সেখান দিয়ে গড়িগুলো ডানে যাওয়ার সময় পেছনের গাড়িগুলো আটকে থাকে। আবার ঢাকা মেডিকেলের সামনে ফ্লাইওভারের গাড়িগুলো আটকে রেখে পুলিশ পুরান ঢাকার গাড়িগুলোকে বেশি গুরুত্ দেয়। অধিক সময় আটকে রাখে ফ্লাইওভারের গাড়িগুলো। এতে করে ফ্লাইওভারের উপরে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়।
হানিফ ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করেন ব্যবসায়ী আতাউর রহমান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার পিপিপির ভিত্তিতে এই ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে গিয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান অরিয়ন গ্রæপকে এতোটাই স্বাধীনতা দিয়েছে যে, তারা তাদের ইচ্ছামতো জায়গা দখল করেছে। তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ী দিয়ে দেশের ১৮টি জেলার গাড়ি রাজধানীতে প্রবেশ করে। অথচ যাত্রাবাড়ীতে প্রবেশের জন্য মাত্র ১৫/২০ ফুটের রাস্তা অবশিষ্ট রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের জন্য এতো বেশি জায়গা দখল করার প্রয়োজন ছিল না। এতে করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে আসা গাড়িগুলো ঢাকায় প্রবেশ করতে গিয়ে যানজটের কবলে পড়ছে। রাস্তাগুলো আবার গত চার বছর ধরে সংস্কার করা হয়নি ফ্লাইওভারে গাড়িগুলোতে উঠতে বাধ্য করার জন্যই। এজন্য সিটি কর্পোরেশনেরও জবাবদিহিতা থাকা উচিত ছিল। নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী আ জ ম সাদেক বলেন, আমরা জনগণ এখন ফাটা বাঁশে পড়েছি। ফ্লাইওভারে উঠতে আমরা যাতে বাধ্য হই- সেই ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রাখা হয়েছে। আর ফ্লাইওভারে ওঠা মানেই হলো, টাকা দিয়ে যন্ত্রনা কিনে নেয়া।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে তা দুই হাজার ৩৭৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা করা হয়। যদিও এটি মেনে নেয়নি সিটি করপোরেশন। এ নিয়ে আরবিট্রেশনে মামলা চলমান রয়েছে। ###



 

Show all comments
  • ফাহিম ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৪:০০ এএম says : 0
    কবে যে এই যন্ত্রণার অবসান হবে ?
    Total Reply(0) Reply
  • Sanjida ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৮:৪৮ পিএম says : 0
    এই যন্ত্রণা কবে যে শেষ হবে। রাস্তায় বের হওয়ার আগেই কান্না আসে, যানজট এত পরিমাণ বেরে গেছে যে, অফিসে সময়মত পৌছানো দুঃসাধ্য হয়ে গেছে। ডিউটির সময় ৬ ঘন্টা আর রাস্তায় ব্যায় হয় ৭ ঘন্টা। যেন আমাদের সময়ের কোন মূল্যই নেই।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ফ্লাইওভার


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ