Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) ও শিক্ষকদের ভাগ্য উন্নয়নের প্রত্যাশা

আলহাজ অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজী | প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

আজ মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর ১২তম ওফাত বার্ষিকী। প্রতি বছরই এ দিনে মরহুম হুজুরের বিষয়ে কিছু লেখার চেষ্টা করি, আজও তারই ধারাবাহিকতায় লিখতে বসছি। আসলে মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর জীবন, কর্ম ও অবদান ছিল অসাধারণ ও সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার। বহু প্রতিভার অধিকারী ক্ষণজন্মা ব্যক্তি হিসেবেই তিনি আমাদের কাছে চির জীবন বেঁচে থাকবেন, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো অমøান থাকবে শতাব্দীর পর শতাব্দী। বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে তিনি ছিলেন সময়ের সেরা বুদ্ধিজীবী, তাঁর তীক্ষè মেধা আর অদম্য চিন্তার কারণেই তিনি আজ দেশের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে অমর হয়ে আছেন। শিক্ষকদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধিসহ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য কোনোদিনই তিনি করেননি অনশন, নামেননি রাজপথে। শিক্ষকদের সম্মান ক্ষুণœ হয়, এই ধরনের কোনো কর্মসূচি দেয়ার চিন্তাও তিনি করেননি। তাঁর জীবনে একটি বড় সাফল্য হচ্ছেÑ সরকারি-বেসরকারি সকল শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন, সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়ে করেছিলেন মহাঐক্য।
আজ তিনি নেই! নেই শিক্ষকদের মধ্যে সেই ঐক্য। তাঁর মতো শিক্ষকনেতা দুনিয়াতে থাকলে হয়তো শিক্ষকরা আজ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অনশন আর রাজপথে নামার কথা ভুলেই যেত, এসব ছাড়াই আদায় হতো সব দাবি, পূর্ণ হতো সকলের মনোবাঞ্ছনা। এখনো প্রয়োজনিয়তা অনুভব করছি মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর মতো একজন মহান শিক্ষকনেতার। আজ সাধারণ ধারার শিক্ষকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বহু বিভক্তি, সৃষ্টি হয়েছে নেতৃত্ব নিয়ে দ্ব›দ্ব। যার ফলে দিন যতই যাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন নামে শিক্ষক সংগঠন। সাধারণ অনেক শিক্ষকই জানেন না তাদের নেতার পরিচয়, জানেন না তাদের অফিসটি কোথায়। অন্য দিকে, মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর পরিশ্রমের ফসল বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন, মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের একক পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। যার প্রমাণ গত ২৭ জানুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসম্মেলন। সম্মেলনের উদ্বোধক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, আমি মনে করেছিলাম হাজার হাজার আলেম উপস্থিত হবেন, কিন্তু এসে দেখলাম লাখ লাখ আলেম উপস্থিত হয়েছেন। ওইদিন ঢাকার শহর আলেম-ওলামার নগরীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। বস্তুত সংগঠনের পেছনে রয়েছে মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর মতো একজন মহান শিক্ষাপ্রেমিকের রূহানি দোয়া, হয়তো এটা কেউ জানেন আবার কারোর জানার অগোচরেই রয়ে গেছে বিষয়টি।
মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) সকল সময়েই মাদরাসার শিক্ষকদের মানসম্মানের বিষয়টি গুরুত্ব দিতেন। তিনি সব সময়ই মাদরাসা শিক্ষকদের ঐক্যের প্রতি বিশেষভাবে যতœবান থাকতেন, তাই তিনি জমিয়াতের নেতৃবৃন্দের অনুরোধে তাঁরই সুযোগ্য সন্তান আলহাজ এ এম এম বাহাউদ্দীনকে মাদরাসা শিক্ষকদের সেবায় নিয়োজিত করে গেছেন। মরহুম হুজুর অসুস্থ শরীর নিয়েও ছুটে বেরিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। আমার মনে পড়ে, ২০০৩ সালে হুজুরের বরিশাল সফরের কথা, তখন তিনি গুরুতর অসুস্থ, দুটো কিডনিই অচল, ডায়ালাইসিস করতে হয় দৈনিক একবার, এরই মধ্যে বরিশাল বিভাগীয় সম্মেলনে যাবেন হুজুর। দিন তারিখ ঠিক হলো, বিকেলের স্টিমারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, আলহাজ মাওলানা কবী রুহুল আমীন খান, মাওলানা আব্দুর রহমান বেলানীসহ বেশ কয়েকজন আমরা সদরঘাটে স্টিমারে উঠলাম, যথা সময়ে স্টিমার ছাড়ছে না, কারণ হুজুর তখনো রেনাল হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করছেন । এদিকে বিলম্বে যাত্রার কারণে যাত্রি সাধারণ হইচই শুরু করেছেন।
কিছু সময়ের ব্যবধানে হুজুর আসলেন, আমাদের সাথে একত্রে বসে হুজুরের জাহাজে হজে যাওয়ার ইতিহাসসহ অনেক গল্প করলেন, আমারও ভাগ্য হয়েছে হুজুরের সাথে কয়েকবার পবিত্র হজ ও বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেয়ার। যখনই সুযোগ হতো তখনি দেশের সমাজব্যবস্থা, জমিয়তের উন্নয়ন বিশেষ করে অবহেলিত মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের কিভাবে ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়, তার কথা শুনাতেন। তেমনিভাবে বরিশাল যাত্রাপথে স্টিমারেও তার ব্যতিক্রম করলেন না। অনেক রাত্র পর্যন্ত আলোচনা সাথে সাথে নানান ধরনের খাবার পরিবেশন হলো। ঘন কুয়াশার মধ্যে স্টিমার চরে আটকে গেল, বলা হলো দুপুরে নদীতে জোয়ার হলে স্টিমার ছাড়বে। আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কারণ সকাল ১০টায় সম্মেলন, হুজুর খুশি মনে আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন গত সন্ধ্যায় যারা হইচই করেছিল ওরা কোথায়, কিভাবে ওরা যাবে? হুজুর ফোনে ঢাকায় যোগাযোগ করে আমাদের যাওয়ার জন্য স্পিডবোট আনালেন, তিনটি স্পিডবোট এলো, সমস্যা দেখা দিলো স্টিমার থেকে স্পিডবোটে কিভাবে উঠব। হুজুরে পরামর্শে নৌকা আনা হলো। নৌকার উপর টেবিল দিয়ে উঁচু করা হলো, অনেক ঝুঁকি নিয়ে হুজুরসহ আমরা স্পিডবোটে আরোহণ করলাম। আমি ভয়ে অস্থির, কারণ এর আগে কোনোদিন আমার স্পিডবোটে ওঠার সুযোগ হয়নি। হুজুর আমাকে কাছে বসালেন, স্নেহভরে শান্ত¦না দিয়ে বললেন, অভ্যাস করতে হবে। সকল পরিস্থিতিতে সব যানবাহনে চলাফেরার অভ্যাস রাখতে হয়। চাঁদপুর থেকে বরিশাল পর্যন্ত প্রখর রোদের মধ্যে লম্বা সফর করে হুজুর বরিশালে একে হাইস্কুল মাঠে মাদরাসা শিক্ষকদেরকে উৎসাহ যোগালেন, শুনালেন তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের কল্প-কাহিনী। জমিয়াতের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধভাবে সকলকে থাকতে পরামর্শ দিলেন। তিনি অনেকবার বলেছেন আমি মাত্র ২৫ ভাগ সুযোগ-সুবিধা আদায় করতে পেরেছি, বাকি ৭৫ ভাগ সমস্যার সমাধান যাতে হয় তার জন্য তোমাদের আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। জমিয়াতকে এগিয়ে নিতে হবে দুর্বার গতিতে, তাহলেই পর্যায়ক্রমে সব সমস্যার সমাধান হবে।
আজ অনেকেই বলেন, মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) অনেক ক্ষমতার অধিকারী থেকেও কেন তিনি কিছু মাদরাসা সরকারিকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেননি? আমাদের কিছু শিক্ষকও এই ধরনের প্রশ্ন করেন, আসলে হুজুর ইচ্ছা করলে তখন কিছু মাদরাসা সরকারিকরণ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমি হুজুরের কাছ থেকে, তাঁর বক্তব্য, বিবৃতি থেকে যা দেখেছিÑ তা হলো হুজুর বলতেন, কিছু মাদরাসা যদি সরকারি হয়, তাহলে সব মাদরাসায় এর প্রভাব পড়বে। কিছু মাদরাসা সরকারি হলে ইল্ম-আমল নষ্ট হবে, সাথে সাথে বাকি বেসরকারি মাদরাসাগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। সত্যিই আজ দেশে তিনটি সরকারি মাদরাসাই তার সাক্ষী। মরহুম হুজুরের চিন্তা ছিল সকল মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের একশত ভাগ বেতনভাতা পর্যায়ক্রমে এনে দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করা। সেই দর্শন থেকেই এক দাবি হচ্ছে বেসরকারি সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। মরহুম হুজুরের স্বপ্ন, সাধ ও দর্শন নিয়েই আজ তাঁরই সন্তানের নেতৃত্বে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ ও মাদরাসা শিক্ষকদের প্রাণের দাবি আদায়ে সকলেই ঐক্যবদ্ধ। এ দেশের আলেম-ওলামাদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আন্তরিক, আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় এ দেশের শিক্ষকসমাজ মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বেঁচে থাকবে। রূপকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে এসে দেশকে উন্নত মহাসড়কে শামিল করার তাগিদে যোগ্য, ন্যায়নীতিবান, আদর্শ সুনাগরিক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। যা দেখে শান্তি পাবেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)-এর আত্মা এবং তৃপ্ত থাকবে দেশের সকল শিক্ষক-কর্মচারীগণ।
লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন



 

Show all comments
  • সফিক আহমেদ ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৩২ এএম says : 0
    তার অবদান বাংলার মুসলমানরা কোন দিন ভুলতে পরবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • আজমল ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৩৩ এএম says : 0
    মরহুম হুজুরের চিন্তা ছিল সকল মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের একশত ভাগ বেতনভাতা পর্যায়ক্রমে এনে দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করা। সেই দর্শন থেকেই এক দাবি হচ্ছে বেসরকারি সকল শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর