Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

বন্ধু কী খবর- চট্টগ্রাম কলেজ সহপাঠীদের বর্ণিল মিলনমেলা

| প্রকাশের সময় : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম


শফিউল আলম : ‘শিক্ষাই শক্তি’। এই প্রেরণা ও প্রতিপাদ্য ধারণ করে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাঙ্গন চট্টগ্রাম কলেজ। দীর্ঘ ১৪৯ বছরের পথচলায় মূল ভবনে সোনালী হরফে খচিত ‘জ্ঞানে কর্মে সৃজনে ঐতিহ্যে চট্টগ্রাম কলেজ’। দেড়শ বছরের গৌরবময় এই শিক্ষাঙ্গণ সৃজন করেছে অগণিত জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধক, গুণীজন, সমাজ হিতৈষীসহ হরেক ক্ষেত্রে সফল পেশাজীবী। যারা দেশে ও বিদেশে আজো সুপ্রতিষ্ঠিত। চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীরা মেধা আর মননে নিজেদের অনন্য হিসেবে অবদান রেখে চলেছেন। তারা এই কলেজের নামের সঙ্গে নিজের নামকে সগৌরবে যুক্ত করে পরিচয় বহন করছেন। চট্টগ্রাম কলেজের ‘রেড বিল্ডিং’, আর্টস গ্যালারি-সায়েন্স গ্যালারি, লিচুতলা, লাইব্রেরি ভবন, প্যারেড মাঠসহ বিশাল এই ক্যাম্পাসে তারুণ্যের সেই দূরন্তদিনের পদচারণার সুখস্মৃতি তাদেরকে প্রায়ই তাড়িয়ে বেড়ায়। সেসব স্মৃতির খÐচিত্র যেন ‘টাইম মেশিনে’ চোখের সামনে উজ্বল আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে ফিরে আসে এই সেদিন।
‘ছিঁড়বো না কখনও বন্ধুর বাঁধন- বিরাশি আমরা সবচেয়ে আপন’। এই আবাহনকে উপজিব্য করে তুলে ধরে বন্দর মহানগরী ছাড়িয়ে কিছুদূরে চট্টগ্রাম ভাটিয়ারী গলফ্ ক্লাবে গত ২ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত হলো চট্টগ্রাম কলেজের ব্যাচ ’৮২-এর পুরনো সহপাঠীদের বর্ণিল এক মিলনমেলা। বহু বছর পর অনেকের সাথে দেখা- “বন্ধু কী খবর কেমন আছো, কোথায় আছ, পরিবার-পরিজনের খবর কী”? আরও কত কী কুশল বিনিময়, হাসি-ঠাট্টা, সরস বচন, গালগল্প, আষাঢ়ে গল্প, আলাপে-আড্ডায়, নির্মল বিনোদনে, জুমার নামাজের বিরতিতে গলফ্ মাঠের পাশে মসজিদে যাওয়া, যারা মিলিত হতে আসতে পারেননি তাদের খবরাখবর জানা কিছুই বাদ পড়েনি দিনমান আয়োজনে।
অধ্যাপক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, মাস্টার মেরিনার, ব্যাংকার, সাংবাদিক, আইনজীবী, আমলা, ব্যবসায়ী-শিল্পোদ্যোক্তা, গৃহবধূ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশা বা কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন চট্টগ্রাম কলেজিয়ানরা একই ছাতার নিচে সমবেত হন। বিশিষ্ট নিউরোসার্জন নোমান খালেদ চৌধুরী (শিপার) তার ২৪ ঘণ্টার ব্যস্ততাকে ঝেড়ে ফেলে অবিশ্বাস্য স্বতঃস্ফূর্ততা দেখান। তেমনি বøু-ইকোনমির (সামুদ্রিক অর্থনীতি) বিশিষ্টজন ফসিহুর, অসুস্থতা তুচ্ছ করে ব্যাংকার তৌফিক বাবু, আমেরিকা প্রবাসী শিক্ষা-গবেষক আমেনা শাহীন, ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ মানু, চাটগাঁর নামিদামি ফ্যাশন ডিজাইনার আইভী হাসান, আইনজ্ঞ জিয়া হাবিব, দুই মোর্শেদ (জাপানী ও চবি অধ্যাপক), অধ্যাপক মাইনুল, প্রকৌশলী রফিক, শিক্ষিকা নিশো, সানজিদা, নাসরীন, মিলি, ব্যবসায়ী তারেক, ডা. মুনির খান, সুইডেন প্রবাসী আসিফ খান, শওকতসহ সবাই প্রাণের মেলায় ছিলেন প্রাণবন্ত। এবার যারা মিলিত হতে পারলেন না তাদের মধ্যে শাহেদুল হক ফোনে অভিনন্দন প্রকাশ করেন। অনুপস্থিতির অভাব বোধ হয়েছে হাবিব, মুনীর চৌধুরী, নওশাদ, তপন, নাসির, শরীফ ও অনেকেরই।
পুনর্মিলনীর দিনটিতে শীতের সকালেই বিরাশি ব্যাচের সহপাঠীরা বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে এসে মিলিত হন চট্টগ্রাম কলেজের লিচুতলায়। এরপর অনেকে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে নিজেদের ক্লাসরুমের দিকে পা বাড়ান। ক্যাম্পাসে হয় ফটোসেশন। এরপর একযোগে রওনা দেন ভাটিয়ারী গলফ্ ক্লাবের উদ্দেশে। সেখানে গল্প-আড্ডার সাথে ঘুরে ঘুরে অপরূপ প্রকৃতির মাঝে অবগাহন, ছবি তোলা ছাড়াও ছিল পরিচিতি-পর্ব, স্মৃতিচারণ, গান-কবিতা, ক্লাসরুমের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, কলেজে ভর্তির শর্ত হিসেবে একজন অভিভাবকের কঠোর ‘আচরণ বিধি’ মেনে চলার জন্য মুচলেকা গ্রহণ, ভর্তি পরীক্ষায় নার্ভাস হয়ে পড়া, মেয়েদের সাথে দেখাদেখি ও কথাবার্তায় কলেজ কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি, বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রীর আকাল, সিনিয়র-জুনিয়র সমাচার, গ্যালারিতে সামনে বনাম পেছনে বসার নেপথ্য কাহিনী, সালেহ জহুর ও আহমদ হোসেন স্যার-আতঙ্ক, ফেলে আসা হোস্টেল লাইফের বর্ণনা এবং ইনডোর প্রীতি খেলাধূলার পর্ব। মিলনমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের জন্য ছিল ক্রেস্ট, আইভীর বিশেষভাবে ডিজাইন করা উত্তরীয়, ক্যাপ ইত্যাদি উপহার। ছিল র‌্যাফেল ড্র ও ইনডোর গেমসের পুরস্কার।
বিদায়ের আগে তৌফিকুল ইসলাম বাবুর নেতৃত্বে একটি আহŸায়ক কমিটি গঠিত হয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য। আলোচনাকালে সহপাঠিদের বিস্তারিত পরিচিতি সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি, ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সম্মিলন, জনসেবামূলক কার্যক্রমের লক্ষ্যে একটি ট্রাস্ট বা ফান্ড গঠনের গুরুত্ব দেয়া হয়। সুখস্মৃতি, আবেগানুভূতি এবং প্রিয় দেশমাতৃকা ও সমাজের সর্বাঙ্গীন কল্যাণের প্রতিশ্রæতি বহন করে ভাঙলো অবশেষে ২০১৮ সালের বিরাশি ব্যাচের প্রাণের মিলনমেলা। শেষেও রয়ে গেছে রেশটুকু সবার হৃদয়ের কোণে।
প্রসঙ্গত, ১৮৩৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল হিসেবে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্ম। প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছর পরে ১৮৬৯ সালে এটি উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হয়। আর তখন থেকেই চট্টগ্রাম কলেজ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন জে সি বোস। ১৯০৯ সালে কলেজে কলা বিভাগের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ চালু হয়। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীর ডিগ্রী কলেজের স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজে প্রথম মুসলিম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন শামসুল ওলামা কামালুদ্দিন আহমদ। তার সময়েই কলেজ দ্রæত উন্নতি লাভ করে। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক তখন মুসলিম হোস্টেলের ভিত্তিফলক স্থাপন করেন। আর তখন থেকে এই কলেজে সহশিক্ষা প্রবর্তন করা হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন