Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ১ কার্তিক ১৪২৫, ০৫ সফর ১৪৪০ হিজরী

প্রকল্প বাস্তবায়নে শঙ্কা

নির্বাচন সামনে রেখে এলজিইডির উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা

| প্রকাশের সময় : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

পঞ্চায়েত হাবিব : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র আট মাস। নির্বাচনকে সামনে রেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকার কাজ শেষ করতে চায় সরকার। বরাদ্দকৃত এ টাকার মধ্যে ৩০ জুন শেষ হতে পারে ২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ। বাকি প্রকল্পগুলো শেষ হতে সময় লাগবে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়নে পার্বত্য তিন জেলা ও সিটি কর্পোরেশনের বাইরে ২৮৪ জন এমপির প্রত্যেককে এবার ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে এমপিদের বদলে উপজেলা প্রতিনিধিদের দিলে বেশি কার্যকর হতো। এতে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হতো। জনগণের প্রয়োজন মেটানো আরো বেশি সম্ভব হতো। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।
সূত্র জানায়, গুরত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এমপিরা চাহিদামতো এলজিইডির কাছে তাদের এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা দেবেন। চার বছরের জন্য বরাদ্দ দেয়া ২০ কোটি টাকার কাজ শেষ হতে না হতে আবারো ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ২৮৪ জন এমপির নামে। এ দশ কোটি টাকায় শুধু নির্বাচন এলাকায় মসজিদ, মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনা উন্নয়নে আলাদা করে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৭ কোটি টাকা। এ টাকা এমপিদের ইচ্ছা অনুযায়ী নিজেদের এলাকার উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন এলজিইডির সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক মো: আব্দুল ওয়াদুদ। তবে ২০ কোটি টাকার কাজের প্রকল্পের তালিকা দেননি অনেক এমপি ও মন্ত্রী। আবার কোনো কোনো এমপি-মন্ত্রী বরাদ্দের চেয়ে দ্বিগুণ প্রকল্পের তালিকা জমা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে। এমপিদের অতিরিক্ত প্রকল্পের তালিকা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
এদিকে দেশের প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হচ্ছে ১০টি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নির্বাচনের আগেই সাতটি ক্যাটাগরিতে এসব ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর’ (ইইডি) চলতি মাসেই এসব ভবন নির্মাণের দরপত্র আহŸান করতে যাচ্ছে।
জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গঠন করা হচ্ছে সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিট (রিফর্ম ম্যানেজমেন্ট ইউনিট)। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারকে সার্বক্ষণিক খাপ খাওয়াতে এ ইউনিট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনাপত্র জারি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ জন্য সকল মন্ত্রণালয়ের সচিব, অধিদপ্তরের প্রধান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং ইউএনওদের আগামী জুনে শেষ করতে চিঠি দেয়া হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে। এছাড়া দেশের মানুষের যেন ভোগান্তি কম হয় একথা মাথায় রেখেই সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রæত শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মসম্পাদন নীতি ও মূল্যায়ন অধিশাখা এবং মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখা থেকে চিঠি সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রতিটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের তাকাদা দেয়া হয়। চিঠিতে বলা হয়, আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল বিভাগ এবং অধিদপ্তরের সরকারি প্রকল্পের কাজ বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করতে হবে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন এ ধরনের প্রকল্পের নামে মূলত নির্বাচনের বছরে জনগণের করের টাকাই লোপাট করা হয়। কারণ এ ধরনের প্রকল্পে বড় বড় প্রকল্পের মতো উন্মুক্ত দরপত্র বা ওটিএম সাধারণত আহŸান করা হয় না। ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার কাজে কোটেশন আহŸান করে প্রত্যেক এমপি তার নিজ নিজ পছন্দের ব্যক্তিকে দিয়ে কাজগুলো করাবেন। নির্বাচনের আগে এ ধরনের কাজের সুযোগও দেয়া হয় অনভিজ্ঞ ঠিকাদারদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে একই ধরনের প্রকল্প এখন চলমান। তাই নতুন একটি প্রকল্প অনুমোদন স্ববিরোধিতারই শামিল।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৭ জুলাই একনেক সভায় ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন’ শিরোনামে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় একজন এমপি তার নিজ আসনের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতি বছর চার কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে মোট ২০ কোটি টাকা খরচ করতে পারবেন। এ প্রকল্পের আওতায় এমপিরা চাহিদামতো এলজিইডির কাছে তাদের এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা দেন। এদিকে গত চার বছরে এমপি ও মন্ত্রীদের প্রকল্পের তালিকা দিতে গড়িমসির কারণে কাজ করতে পারছে না স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। আবার অনেক এমপি ও মন্ত্রী তাদের ২০ কোটি টাকা চেয়ে ৩ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ দাখিল করেছে বলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। চার বছরে এমপি ও মন্ত্রীদের প্রকল্পের তালিকা অনুযায়ী কাজ হয়েছে। এর মধ্যে নতুন রাস্তা পাকাকরণ করা হবে ৮ হাজার ৬৯ কিলোমিটার। ব্রিজ কালভার্র্ট ১৫ হাজার ৩৬০ কিলোমিটার। সড়ক মেরামত হবে ৪ হাজার ৫৯৬ কিলোমিটার এবং বাজার উন্নয়ন ১১২টি, বোর্ড ল্যান্ড ঘাট ৬৪টি উন্নয়ন কাজ হবে। এলজিইডি সূত্র মতে এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৩৮ কিলোমিটার নতুন রাস্তার কাজ হয়েছে। ব্রিজ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে ৪ হাজার ১৪৫ কিলোমিটার। সড়ক মেরামত কাজ করা হযেছে ১৩ হাজার ৬৪৫ কিলোমিটার। এসব কাজে এখন পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে ২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বাকি টাকার কাজ চলমান রয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দিরসহ সাবর্জনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংস্কারে প্রতিটি উপজেলায় দুই কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সংসদীয় আসনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হবে না। দেয়া হবে প্রতিটি উপজেলায়। স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধর্মীয় অনুশাসন, মূল্যবোধ, নৈতিকতাসহ মানবিক ও শারীরিক বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তাই ধর্মীয় ও সামাজিক স¤প্রীতিসহ উন্নত সমাজ গঠনে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ জন্য আলাদা করে প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৭ কোটি টাকা সর্বমোট ২৮৪ সংসদ সদস্যের অনুকূলে ২০ কোটি টাকা করে দেয়া হয়। গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অনুমোদনের জন্য ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার প্রকল্পের একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেটি যাচাই-বাছাই করে অসঙ্গতি পাওয়ায় ৩০০ কোটি টাকা বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন ব্যয় ৬ হাজার ৭৪ কোটি টাকা ধরে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর আগে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পের অনুকূলে প্রত্যেক এমপি ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিলেন। মূল্যস্ফীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবার বরাদ্দ ৫ কোটি টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত অর্থাৎ বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রথম দফার প্রকল্প এখনও শেষ হয়নি, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে। মূলত যেসব এলাকা পিছিয়ে আছে সেখানে জনপ্রতিনিধিদের কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। চলমান প্রকল্পটি ভালোভাবে বাস্তবায়ন হওয়ায় প্রশংসিত হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ-১ আসনের এমপি বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম. সিরাজগঞ্জ-২ এমপি মো: হাবিবে মিল্লাত, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের এমপি তানভীর ইমাম, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি মো: হাসিবুল রহমান স্বপন, পাবনা-১ আসনের এমপি শামসুল হক টুকু, পাবনা-৪ আসনের এমপি শামসুর রহমান শরীফ, কুষ্টিয়া-২ আসনের এমপি বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মো: মাহবুব-উল আলম হানিফ, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দার (ছেলুন), ঝিনাইদহ-২ আসনের এমপি তাহজীব আলম সিদ্দিকী, ঝিনাইদহ-৩ আসনের এমপি মো: নবী নেওয়াজ, যশোর-৩ আসনের কাজী নাবিল আহমেদ, যশোর-৬ আসনের এমপি বর্তমান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, মাগুরা-২ আসনের এমপি ড. শ্রী বীরেন শিকদার, বাগেরহাট-১ আসনের এমপি শেখ হেলাল উদ্দিন, বাগেরহাট-২ আসনের এমপি মীর শওকাত আলী বাদশা, তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি, খুলনা-৫ আসনের এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, সাতক্ষীরা-২ আসনের এমপি মীর মোস্তাক আহমেদ রবি, সাতক্ষীরা-৩ আসনের এমপি আ ফ ম রুহুল হক এমপি, বরগুনা-১ আসনের এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, পটুয়াখালী-১ আসনের এমপি জাপার মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার. জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, ভোলা-১ আসনের এমপি বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধরী শাওন, ভোলা-৪ আসনের এমপি বর্তমানে উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, বরিশাল-১ আসনের এমপি আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, টাঙ্গাইল-১ আসনের এমপি মো: আব্দুল রাজ্জাক, জামালপুর-৫ আসনের এমপি রেজাউল করিম হীরাসহ প্রায় দুই শতাধিক এমপি-মন্ত্রী ২০ কোটি টাকার দ্বিগুণ চাহিদাপত্র দিয়েছেন।
এখনো ২০ কোটি টাকার প্রকল্পের তালিকা যারা দিতে পারেননি তারা হলেনÑ কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এমপি এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের এমপি রুহুল আমিন, লালমনিরহাট-১ আসনের এমপি মোতাহার হোসেন, নীলফামারী-৩ আসনের এমপি গোলাম মোস্তাফা, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের এমপি মো: ইয়াসিন আলী, দিনাজপুর-৬ আসনের এমপি শিবলী সাদিক, বগুড়ার-৪ আসনের এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনসহ প্রায় ৫০ জন এমপি এখনো প্রকল্পের তালিকা জমা দেননি।



 

Show all comments
  • রাসেল ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৪:০০ এএম says : 0
    পরিকল্পনা শুনতে চাই না, শুধু কাজ দেখতে চাই।
    Total Reply(0) Reply
  • নাসির ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৪:০১ এএম says : 0
    গল্প শুনে আর কাজ নাই
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর