Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

আস্থাহীনতার শঙ্কা

নিম্ন আদালত নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত

| প্রকাশের সময় : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:০০ এএম

স্টাফ রিপোর্টার : বিচার বিভাগের ঐতিহাসিক দিন হলো ২০০৭ সালের পহেলা নভেম্বর। ওই দিন দেশের বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘স্বাধীন’ হয়। আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী, সংবাদকর্মী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের দাবীর মুখেই ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের নের্তৃত্বাধীন সরকার এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার ১০ বছর পার হয়ে গেছে। সত্যিই কি বিচার বিভাগ স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারছে? ইতোমধ্যেই একজন প্রধান বিচারপতিকে ‘রায়ের পর্যবেক্ষন’ ইস্যুতে পদত্যাগ করতে হয়েছে। দেশের আইনজীবী-সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এখনো নি¤œ আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা রায় ঘোষণার ১০ দিন পরও রায়ের সাটিফাইড কপি মেলেনি। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে সরকারের ইচ্ছামত খালেদা জিয়ার রায় দেয়া হয়েছে এবং তাদের ইচ্ছামতোই রায়ের কপি দিতে বিলম্ব করা হচ্ছে। শুধু বিএনপিই নয়; নি¤œ আদালতে দেয়া বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের সার্টিফাইড’ কপি’ নিয়ে কালক্ষেপন ‘স্বাধীন বিচার বিভাগ ও গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়’ মন্তব্য করছেন দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই ‘বিলম্ব’ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তাদের মতে রুলস অনুযারী ৫ দিনের মধ্যে বিচারপ্রার্থীর নি¤œ আদালতের সার্টিফাইড কপি পাওয়ার কথা। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পাচ্ছেন না। যা স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য অশুভ সংকেত। এমন ঘটনা বিচার বিভাগের সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট সৃষ্টি করতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। এমন কি সাটিফাইড কপি দিতে বিলম্ব জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এমন আশঙ্কাও তারা উড়িয়ে দেননি।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, তিন দিনের মধ্যে তার (খালেদা জিয়া) জামিন দেয়ার কথা। অবাক লাগছে। রায় দেয়া হয়ে গেছে এখনো কপি দেয়া যাচ্ছে না! দেশে যেভাবে হত্যা গুম চলছে তা নিয়ে সবাইকে মুখ খুলতে হবে। জজ সাহেবদের এ ব্যাপারে অসহায়দের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলে কেন তারা দেশে গুম হত্যা অপহরণের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না? তারা যদি গুম হত্যার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারে তাহলে বেরিয়ে যাক ক্ষমতা থেকে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদÐের রায়ের অনুলিপি (কপি) যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যেই দেওয়া হবে। আদালত থেকে রায়ের কপি দেওয়া হচ্ছে না বলে বিএনপির আইনজীবীরা যে অভিযোগ করছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওনারা কোনো আইনকানুন মানেন না বলেই এমনটা করছেন। রায়ের কপি যখন বিজ্ঞ আদালত তৈরি করবেন তখন দেবেন। এর সঙ্গে সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সে ক্ষেত্রে ৬৩২ পাতার রায় যুক্তিসংগতভাবে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময়ের মধ্যে দেবে। সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কাছে তিনি ইনকিলাবকে বলেন, সত্য কথা বলতে কি দেশের আইনে শাসন নেই। আইনের শামন থাকলে আজকের যা হচ্ছে তা হতো না। জাজমেন্ট হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কি যুদ্ধ ঘোষণা করলো। মনে হচ্ছে মামলার বাদী আওয়ামী লীগ। কিন্তু কেন এইসব। আমরা একটা মূর্খতার মধ্যে রয়েছি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীন নয়। সরকারে সাম্প্রতিক কিছু কর্মকান্ড বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করছে। ওই মামলার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের এই আইন উপদেস্টা বলেন, টাকা চুরি প্রশ্নও আসে না। এটা ছিল একটি ব্যক্তিগত তহবিল। যাই হোক আমি তেমন কিছু বলতে চাই্ না। রায়ের সাটিফাইড কপি কত দিনের মধ্যে বিচারপ্রার্থীদের দিতে হবে এ নিয়ে সরাসরি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদে বলেন, রায়ের কপি পেতে কিছুটা সময় লাগছে। এখানে কিছু কারেকশন কথা শুনছি তাই হয়তো এমনটা হচ্ছে। তবে কত দিনের মধ্যে রায়ের কপি বিবাদীদেরকে দিতে হয় এ বিষয়ে আমার জানা নেই। বিচারিক আদালতের রায়ের কপি দিতে বিলম্ব হওয়ার বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট হচ্ছে বিএনপি এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা ঠিক না। আস্থার সংকট কেন হবে। বিচার বিভাগের উপর সরকার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। খালেদা জিয়ার মামলার উভয়পক্ষের দীর্ঘদিন শুনানি হয়েছে। আত্মপক্ষের সমর্থনের সুযোগ ছিল আইনের প্রক্রিয়ার সবই হয়েছে। সুতরাং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আইন সবার জন্য সমান। রাজনৈতিক কারণে রায় নিয়ে বির্তক করা কোন পক্ষেরই উচিত নয়। এটা চর্চা করলে গণতন্ত্র কখনো প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পাবে না। বিচার বিভাগের উপর সকলের আস্থা রাখতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদে বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের ‘সার্টিফাইড’ কপি নিয়ে সরকার ‘ছলচাতুরি’ করছে। বিএনপি চেয়ারপারসনকে বেশি দিন কারাগারে আটকে রাখতেই সরকার এই ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে। রায় হয়েছে ৮ ফেব্রæয়ারি। এক সাপ্তাহ চলে গেছে এখন পর্যন্ত রায়ের কপি পাওয়া যায়নি। এই যে ছলচাতুরি এটা করার অর্থই হলো যে যতদিন পারা যায়, একটা দিন যদি বেশি রাখা যায় বেগম জিয়াকে জলখানায় রাখা। তবে তা বুমেরাং হচ্ছে বলেও সরকারকে সতর্ক করে দেন তিনি। তার মতে এতে সরকারের জনপ্রিয়তা কমছে। আপিলের পর খালেদার জামিনের বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদী মওদুদ বলেন, যখনই রায়ের নকল পাব, আমরা আপিল ফাইল করব। আপিলের সাথে সাথে আমরা তার জামিন চাইব। আমরা বিশ্বাস করি ৫ বছরের (সাজার মেয়াদ) জন্য জামিন এমনিতেই কোর্ট দেখে। ৫ বছরের ব্যাপারে এমন কিছু না।
বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, খালেদা জিয়ার সাটিফাইড কপি এখনো পাওয়া যায়নি। এটা জাতি ও আদালতের জন্য খুবই দু:খজনক। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে বিদেশী যে অনুদান দিয়েছে তা বর্তমানে ছয়গুণ বেড়েছে। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য জালিয়াতির মামলার সাজা দিয়ে একটি নির্জন নোংরা সেলে রাখা হয়েছে। অথচ এতে করে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেছেন, অতীতে দেখেছি নি¤œ আদালতের রায়ে সবটুকু অংশ পড়েজেন বিচারক। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সাটিফাইড কপি দিয়েছেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের সেভেন হত্যা মামলা ও বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা। অথচ সাবেক একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের সাটিফাইড কপির জন্য দিন পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কি আশ্চর্য ঘটনা। আমার বুঝে আসে না কেন এমনটা হচ্ছে। এটা স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য অশুভ সংকেত। গুরুত্বপূর্ন মামলার সাধারনত সঙ্গে সঙ্গে রায়ের কপি পেতে পারে। কারণ বিবাদীরা হাইকোর্ট যাবে শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের বিপরীত ঘটনা ঘটলো। কোন অভিযোগে তার সাজা হয়েছে সেটা বিশদ ব্যাখ্যা নেই। অথচ রায়ের ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল। এটা বিচার বিভাগের জন্য ভাল হতো। সমাজের এনিয়ে আলোচন হত। যত দেরি হবে রায়ের কপি পেতে তত বিচার বিভাগের জন্য খারাপ নজির সৃষ্টি হবে।আস্থার সংকট গভীর থেকে গভীরতর হবে। রায়টিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম ইনকিলাবকে বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীন। আইন মন্ত্রনালয় ও সরকারের কোন বিভাগ থেকে বিশেষ জজ আদালতে প্রভাব বিস্তারে হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া সরকারর বিচার বিভাগের কোন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের বিষয়ে চিন্তা ভাবনাও করে না। রায়ের সাটিফাইড কপি বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ৬৩২ পৃষ্ঠার একটি রায় নন জুডিসিয়াল স্টাম্পে টাইপ করা পূর্বক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর করা কিছুটা সময় সাপেক্ষ। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ইনকিলাবকে বলেন, ৮ দিন অতিবাহিত হল। অথচ রুলসের আছে ৫ দিনের মধ্যে রায়ের সাটিফাইড কপি বিচার প্রাথীদেরকে দিতে হবে। কিন্তু তা তো মানা হচ্ছে না। কোন অজানা কারণে রায়ের কপি মিলছে না এটা আমাদের কাছে অস্পষ্ট। সাবেক একজন প্রধান বিচারপতিও বলেছিলেন নি¤œ আদালতের সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আমারও তাই মনে হয় সরকারের বিচারিক আদালতের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। এতে করে বিচার বিভাগে প্রতি জনগনের আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে বর্তমান সরকার। এটা বিচার বিভাগে জন্য সুখকর নয়। দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। আমরা বলেছিলাম রায়ের ফটোকপি দেয়া হোক। যাতে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারি। আদালত সেটা দেয়নি। এখন শুনছি রায়টি নাকি কারেকশন করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে জাজমেন্ট হওয়ার পর এই সবের কোন সুযোগ নেই।



 

Show all comments
  • গনতন্ত্র ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১:৫৯ এএম says : 0
    সমস্ত স্বাধীন কাগজের পাতায়। তুমি কি দেখেছে কভু জীবনের পরাজয় .....,,,,,,,,,,,,,.......,,....।
    Total Reply(1) Reply
    • ZAHER ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ১২:৩০ পিএম says : 0
      RIGHT
  • ওবায়েদ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪০ এএম says : 0
    এই শঙ্কা দূর হওয়া খুব জরুরী
    Total Reply(0) Reply
  • জহির উদ্দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪০ এএম says : 0
    এটা দেশের জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়
    Total Reply(0) Reply
  • তুষার ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪১ এএম says : 0
    দেশে যে কী হচ্ছে কিছুই বুঝতেছি না।
    Total Reply(0) Reply
  • সাজ্জাদ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪১ এএম says : 0
    এভাবে দেশ চলতে পারে না।
    Total Reply(0) Reply
  • ইমরান ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪২ এএম says : 0
    এতে করে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
    Total Reply(0) Reply
  • আরিফ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪৩ এএম says : 1
    সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন একদম ঠিক কথা বলেছেন।
    Total Reply(0) Reply
  • মশিউর রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, ৩:৪৪ এএম says : 0
    এই নিউজটি করায় দৈনিক ইনকিলাবকে ধন্যবাদ
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর