Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫, ৭ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মাতৃভাষা আল্লাহর দান

প্রকাশের সময় : ২ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:০৪ এএম, ২ মার্চ, ২০১৮

মো: আবু তালহা তারীফ
ভাষা হচ্ছে সেচ্ছায় উৎপাদিত প্রতীকের সাহায্যে ভাব আবেগ ও কামনা সজ্ঞাপনের সম্পূর্ন মানবিক ও অপ্রবৃত্তিগত পদ্ধতি। ড.শহিদুল­াহর মতে, বর্তমানে বিশ্বে ভাষার সংখ্যা ২৭৯৬ টি। ভাব প্রকাশের যতগুলো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আছে তার সবাটাই সকল মানুষের মাঝে একই রকম। বিভিন্ন কোকিলের সুরে যেমন সাদৃশ্য পাওয়া যায় তেমনি বিভন্ন মানুষের সুরে ভাষায় ও সাদৃশ্য পাওয়া যায়না। তাছারা পরিবেশ পরিস্থিতি তথা আবহাওয়াজনিত কারনে বাকবিন্যাস বিচিত্রতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও বিভন্নতার প্রেক্ষাপটে ভাষায় বিভন্নতা আহরহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বেও মানুষের মাঝে ভাষার বিভন্নতা ও বৈচিত্র্যকে রয়েছে। এ বৈচিত্র্য মানুষের হাতে গড়া নয় এটা আল­াহ পাকের সৃষ্টিকুলে এক রহস্যময় নিদর্শন সরূপ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর তার নিদর্শনাবলীর অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন”। (সূরা রুম-২১)
মানব শিশু দুনিয়াতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার মা বাবা আত্তীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীর কাছ থেকে যে ভাষা শোনে এবং তাদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে তাই তার মাতৃভাষা। মাতৃভাষা মানুষের মানবভাব প্রকাশের সর্বোত্তম মাধ্যম। মাতৃভাষার মাধ্যমে সহজে মানুষকে যা বুঝানো যায় তা অন্য ভাষায় সহজে বুঝানো যায়না। আল­াহ তায়ালা প্রত্যেক জাতির স্বীয় মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে স্ব স্ব জাতীর নিজস্ব ভাষায় আসমানী কিতাব সমূহ অবতীর্ন করেছেন। হজরত মুসা (আ:) এর স¤প্রদায়ের ভাষা ছিল ইবরানী তাই সে ভাষায় তাওরাত কিতাব নাযিল করা হয়েছে। হজরত দাউদ (আ:) এর স¤প্রদায়ের ভাষা ছিল ইউনানী তাই যাবুর সে ভাষায় নাযিল করা হয়েছে। হজরত ঈসা (আ:) এর উম্মতের ভাষা ছিল সুবিয়ানি তাই এ ভাষারয় ইন্জিল কিতাব নাযিল করা হয়েছে। বিশ্ব নবী (স:) এর উম্মতের মাতৃভাষা ছিল আরবি তাই কোরআন তার মাতৃভাষা আরবিতে নাজিল করা হয়েছে। মাতৃভাষার শিক্ষা ও বিকাশে অকুন্ঠ সমর্থনে মহান আল­াহর বানী সহজ,সুন্দর,ও সাবলীল ও পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য সংশ্লিষ্ট জাতির ভাষাভাষি করে রাসুলদের পাঠানো হয়েছে। আল­াহ তায়ালা বলেন,“আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তার স্বজাতীর ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছে তাদের কাছে পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য অতপর আল­াহ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করে এবং তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়”।(সূরা ইবরাহীম-৪)
আসমানী কিতাক যদি মাতৃভাষায় নাযিল না করতেন তাহলে এ গুলো অবতরনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতো। যদি আল­াহ তায়ালা এ ভাবে নবী রাসুলদের কাছে নিজ নিজ মাতৃভাষার মাধ্যমে আসমানি কিতাব প্রেরন না করতেন তবে দেশবাসী ঐশী ধর্মগ্রন্থের হেদায়েত ও সর্বাঙ্গীন কল্যান লাভে বঞ্চিত হতো। দেশবাসী না বুঝে তা প্রত্যাখন করত। বিশ্বনবী (স:) এর মাতৃভাষায় কোরআন নাজিল করা হয়েছে যেন মানুষ তা বুঝতে পারে। মহান আল­াহ তায়ালা বলেন, “আমি আরবি ভাষায় কুরআন অবতীর্ন করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পারো”।(সূরা ইউসুফ-২)
মানব জীবনে সৌন্দর্যের অন্যতম দিক হলো তার ভাষা। ভাষার মাধ্যমে বিকশিত হয় তার ব্যক্তিত্বের শোভা ও সৌরভ। ব্যক্তির শব্দ ও বাক্য তার রুচি ও রোধের পরিচায়ক। তার চিন্তা ও চেতনার স্ফূরক। তার কথামালা ধারন করে থাকে তার মন ও মননের রঙ। তাই ইসলাম মানুষকে নির্দেশ দেয় পরিশুদ্ধ জীবনে, শুদ্ধ কর তোমার শব্দবাক্য ও ভাষা মধুর কর তোমার বচন বঙ্গি। তুমি যদি জয় করতে চাও মানুষের মন,পেতে চাও মানুষের মনযোগ তোমাকেজানতে হবে শব্দ বাক্যের রসায়ন কথার যাদু। তাছারা কিছুকথা যাদুময়। রাসুল(স:) বলেন,“নিশ্চয়ই কিছু কথা যাদুময়”।(বুখারী-৫১৪৬)
১২০৩ সালে তুর্কিবীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যে দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। একসময় হিন্দু পুরিহিতরা প্রচার করত যে বাংলায় কথা বলবে সে নরকে যাবে। তাছারা বৃটিশরা তাদের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতি এতদাঞ্চলে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু বাঙালী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, নির্বিশেষে সকল ধর্মের বুদ্ধিজীবিরা সে নিষেধাজ্ঞা এবং ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলা ভাষায় বিবিধ সাহিত্য রচনা করে এ ভাষায় বিবিধ রতনে সমৃদ্ধ করে। সর্বোপরি ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে স্বাধীন পাকিস্তানের জন্ম হয়। এ সময় রাস্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানের বাঙ্গালিরা এর বিরোধিতা করে রাস্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন এ দেশের ছাত্র জনতা। তারা অধিকার বঞ্চিত হন বিধায় তারা অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেন। যারা অধিকার বঞ্চিত তাদের অধিকার আদায় করতে হবে। আল­াহ তায়ালাবলেন,“ যাদের লড়াই করতে বাধ্য করা হয়েছে তাদের নির্দেশ করা দেওয়া গেল এ জন্য যে তারা অধিকার বঞ্চিত নিপীড়িত হয়েছে”।(সূরা হজ্জ-৩৯)
১৯৫২ সালর ২১ শে ফেব্রæয়ারী ছাত্র জনতার অধিকার রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ করে। তখন বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর গুলি চালায় পাকিস্তানি পুলিশ। এতে সালাম,রফিক,জব্বার,শফিকসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র বুকের তাজা রক্ত দিয়ে শহিদ হন। অন্যের হাতে অন্যায় ভাবে মৃত্যুবরন করেছেন তারা। যাদের অন্যায় ভাবে হত্যা করা হয় তারা শহীদ। ইসলামের আলোচনা অনুযায়ী ভাষার জন্য যারা প্রান দিয়েছেন তারা শহীদ। শহীদদের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে ঋন ব্যতিত শহীদদের সকল গুনাহ আল­াহ তায়ালা মাপ করে দিবেন। যেহেতু তাদের আন্দোলন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধ। পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগন জোর করে এদেশের মানুষের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিচ্ছিলেন। তখন তারা ন্যায় অধিকারের জন্য স্পষ্ট দাবি করেছিল। আর এটাই জিহাদ। রাসুল (স:) বলেছেন,“অত্যাচারি শাসকের বিরুদ্ধ হক তথা সঠিক কথা বলা অথ্যাৎ ন্যায় অধিকার প্রদান করার ষ্পষ্ট দাবী করাই শ্রেষ্ঠ জিহাদ”।(তিরমিযীআবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা,আস-সুনান,খ,৪পৃ.৪৭১,হাদীস নং-২১৭৪)
বংলাভাষার জন্য যে আত্তত্যাগ করেছেন পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সম্পদের জন্য,ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে দেশে লড়াই করে, কিন্তু মাতৃভাষার জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস শুধু বাঙালিরা তৈরি করেছে। যারা শহীদ হয়েছে তাদের জন্য নির্দিষ্ট একদিন খালি পায়ে হেটে সন্মান প্রদর্শন করার জন্য শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরবর্তীতে তাদের স্বরন খুব কম পড়ে। তাদের জন্য করা হয়না কোন দোয়া। সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়না তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হওয়া ভাষা। ভাষা শুদ্ধভাবে বলা ও লিখতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ন। রাসুল(স:) বিশুদ্ধ মাতৃভাষায় কথা বলেছেন। তার আলোচনা এবং বচনভঙ্গি ছিল অতুলনীয়। তিনি ছিলেন ভাষা ও সাহিত্যে সর্বাধিক নৈপুন্যের অধিকারী এবং আরবের সবচেয়ে নুন্দর বিশুদ্ধ ভাষী। রাসুল(স:) বলেন,“তোমরা তিনটি কারনে আরব তথা আরবি ভাষীকে ভালবাসবে কেননা আমার ভাষা, কুরআনের ভাষা এবং জান্নাতের ভাষা”। (বায়হাকী)
সর্বপরি মানবতার সার্বিক কল্যানে মাতৃভাষার চর্চা অনুশীলন,সংরক্ষন ও উৎকর্স সাধনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ন হতে হবে। সকলের সাথে সুন্দর ভাষায় কথা ভরতে হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন,“আর তোমরা মানুষের সাথে সুন্দর ভাবে কথা বল”।(সূরা বাকারা-৮৩)



 

Show all comments
  • মোহাম্মদ মোয়াজেজম হোসেন ৫ মার্চ, ২০১৮, ৯:৫১ পিএম says : 0
    জন্মগতভাবে আর শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত আমাদের ভাষা বাংলা। সমগ্র বিশ্বে আমাদের ভাষার নাম. Bengali র পরিবর্তে Bangla করা কি সম্ভব ? এই প্রতিষ্ঠার জন্য রক্তের দেওয়ার কোন দরকার আছে বলে আমি মনে করিনা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ