Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পাওয়া আমাদের সবচাইতে বড় পাওয়া

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ৮ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

এমন এক সময় ছিল যখন খ্যাতনামা কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখতে পেরেছিলেন বাঙালিদের সাথে মুসলমানদের ফুটবল খেলা হচ্ছে। বাঙালি বলতে তখন বুঝাতো শুধু হিন্দুদের। এখন এটা অতীত ইতিহাস। যারা জাতীয় জীবনের অগ্রগতির জন্য হিন্দু-মুসলমান মিলনের গুরুত্ব অনুভব করেন শরৎচন্দ্র তাদের সাথেও একমত ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন কোন একটা কথা বহু দিন ধরে বহু লোক উচ্চারণ করলেই তা সত্য হয়ে যায় না। তার মধ্যে প্রকৃত অর্থে সত্য থাকতে হয়। হিন্দু-মুসলমান মিলন এমনি একটা অবাস্তব ব্যাপার।
এর কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, মিলন হয় সমানে সমানে। মুসলমানরা এত পিছিয়ে পড়া একটা সম্প্রদায় যে অদূর ভবিষ্যতেও তাদের সাথে হিন্দুদের মিলনের কোন সম্ভাবনাই নেই। সুতরাং হিন্দু-মুসলমান মিলন একটা অবাস্তব বুলি মাত্র।
এসব ছিল গোটা ভারতবর্ষ যখন ছিল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনাধীন। আজ অবস্থার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। পরিবর্তনের প্রথম পর্যায় আসে ১৯৪৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের অবসানে যখন ভারত ও পাকিস্তান নামের দু’টি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যূদয় হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ নামের একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। আমরা এখন সেই স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক।
যেহেতু শরৎচন্দ্র ছিলেন মূলত একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক তাঁর সম্পর্কে লিখতে গেলে অনিবার্যভাবে চলে আসে ভাষা ও সাহিত্য প্রসঙ্গ। শরৎচন্দ্র যে মুসলমানদের একটি পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় হিসাবে অবজ্ঞা করতেন তার মধ্যে বাস্তবতা ছিল। সৌভাগ্যক্রমে সে বাস্তবতা স্থায়ী হয়নি। স্থায়ী যে হয়নি তার প্রমাণ মেলে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে সাতচল্লিশে উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ঘটলে।
ঊনিশ’ সাতচল্লিশে উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনের অবসানকালে সাবেক সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হলে এবং পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ নামের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে। বাংলাদেশের এই মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিশেষ করে ভারতের বাংলাভাষাভাষী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জনমনের ব্যাপক সহযোগিতা লাভ সম্ভব হয়েছিল।
একই বাংলা ভাষাভাষী দু’টি জনগোষ্ঠী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে যে জনপদকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল তারা সকলকেই এই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার আহŸান জানানো হলেও তারা সে আহŸানে সাড়া না দিয়ে নিজেদের ভারতীয় নাগরিক হিসাবে পরিচিতি দেয়ার উপর অধিক গুরুত্ব দেন।
অবশ্য তাদের এ মনোভাব প্রথম বুঝতে পারা গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে সাবেক ব্রিটিশ-শাসিত ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র পরিণত হওয়ার প্রাক্কালে, যখন ভারত ও পাকিস্তান এই দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রের পাশাপাশি উপমহাদেশের বাংলাভাষাভাষী জনপদসমূহ মিলে একটি বৃহত্তর স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্রের দাবি জানানো হয় মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখ নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে। এ প্রস্তাবের প্রতি মুসলিম লীগ হাই কমান্ড কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নাহর সমর্থন থাকলেও মহাত্ম্যা গান্ধী, পÐিত জওহরলাল নেহরু, সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল এবং বাংলার হিন্দু মহাসভা নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী প্রমুখ নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধিতার কারণে উপমহাদেশের বাংলাভাষাভাষী জনগণের এ স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যায়।
তখন শেষোক্ত নেতা (ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী) এমনও বলেছিলেন ভারতবর্ষ ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ হতেই হবে, নইলে বাঙালি হিন্দুরা চিরতরে বাঙালি মুসলমানদের গোলাম হয়ে পড়বে। অথচ এই বাঙালি হিন্দু নেতৃবৃন্দই মাত্র কয়েক বছর আগে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে বাঙালির ঐক্যের জন্য কী মায়াকান্নাটাই না কেঁদেছিলেন।
রাজনৈতিক সচেতন জনগোষ্ঠীর স্মরণ থাকার কথা, ব্রিটিশ শাসনের প্রথম থেকেই ভারতবর্ষের বঙ্গবিহার-উড়িষ্যা অঞ্চল একজন ছোটলাট বা গভর্নর দ্বারা শাসিত হত। এই বিশাল এলাকা এক গভর্নরের দ্বারা শাসিত হওয়া দুরূহ হওয়ায় প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ১৯০৫ সালে বড়লাট লর্ড কার্জনের উদ্যোগে এই বিশাল প্রদেশ বিভক্ত করে ঢাকা রাজধানীসহ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামের একটি নতুন প্রদেশ। অন্যদিকে বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় আরেকটি প্রদেশ। এতে কলকাতা-প্রবাসী হিন্দু জমিদাররা পূর্ববঙ্গে অবস্থিত তাদের জমিদারীতে তাদের প্রভাব হ্রাসের আশঙ্কায় এই বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলে।
যে হিন্দু নেতৃবৃন্দ পলাশীর পর এ পর্যন্ত সব সময় ইংরেজদের প্রতি সমর্থন দিয়ে এসেছে তাদের এ ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন ইংরেজ সরকারকে খুব ভাবিয়ে তোলে। মাত্র সাত বছরের মাথায় তারা হিন্দু জমিদারদের দাবি মেনে নিয়ে ১৯১১ সালের মধ্যেই বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে তাদের পুরাতন মিত্রদের খুশী করার চেষ্টা করে। ফলে উভয় প্রদেশ আবার একত্রিত হয়।
আমাদের আজকের এ লেখা শুরু করেছিলাম একজন সাহিত্যেকের (শরৎচন্দ্র) কিছু বক্তব্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তৎকালীন মুসলমানদের অবস্থানও প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বাংলা সাহিত্যের গবেষকরা অবগত আছেন বাংলাভাষা তার শৈশবেই রাজনৈতিক কারণে বিপদের সম্মুখীন হয়। এ সময় দাক্ষিনাত্য থেকে আগত কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেন রাজারা সংস্কৃতকে দেবতাদের ভাষা সেই ভাষার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা দানের অভিপ্রায়ে ঘোষণা করে যারা দেবতাদের ভাষার বদলে সাধারণ ভাষা বাংলা ব্যবহার করবে, তারা রৌঢ়ক নরকের অধিবাসী হবে বলে ব্রাহ্মণদের দিয়ে ঘোষণা দেন। এতে বাংলা ভাষা চর্চাকারীরা চরম বিপদের মুখে পতিত হয়।
বাংলা ভাষার চর্চাকারীদের সৌভাগ্য এই যে ঠিক এই সময়ে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয়ের ফলে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে কীভাবে বাংলা ভাষার সুদিন ফিরে আসে তা আমরা জানতে পারি বিখ্যাত গবেষক ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের রচনা থেকে।
তুর্কী বংশোদ্ভূত ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর শাসনামলে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির যে ব্যাপক অগ্রগতি শুরু হয়, তা আর কখনও বাধাগ্রস্ত হয়নি। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল ঐতিহ্যের পুস্তকের ব্যাপক অনুবাদ ছাড়াও সকল ধর্মানুসারীর সাহিত্যচর্চা উৎসাহিত হবার ফলে মুসলিম শাসনামলে বাংলাভাষা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হয়। যা পরবর্তীতে এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ফোর্ট ইউলিয়ামের পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ইংরেজ আমলে সুপরিকল্পিতভাবে সংস্কৃত সম্পর্কিত দুর্বোধ্য বাংলাভাষা প্রচলনের অপচেষ্টা চালানোর ফলে মুসলিম সাহিত্য সাধকরা আধুনিক বাংলা সাহিত্যচর্চা থেকে সাময়িকভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বটলার পুথি রচনার মাধ্যমে তাদের সাহিত্য-চর্চার ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করলেও অল্পদিন পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আধুনিক বাংলা ভাষা চর্চায় ফিরে আসার ফলে তাদের মধ্যে মীর মশারফ হোসেন, শেখ আবদুর রহিম, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, কায়কোবাদ প্রমুখ সাহিত্যকের জন্ম সম্ভব হয় এবং ক্রমে মুসলমান সাহিত্য-সাধকরা তাদের যথাযোগ্য স্থান অধিকার করতে থাকেন। ফলে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাবও একদিন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
শুধু ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা সংস্কৃতি রাষ্ট্রনীতি অর্থনীতি প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই বাঙালি মুসলমানদের উত্তরোত্তর যে উন্নতির পালা শুরু হয়, তার ফলেই এককালে বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যে রাজনীতি ক্ষেত্রে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান, সাংবাদিকতার মধ্যে মওলানা আকরম খাঁ, আবদুল কালাম শামসুদ্দিন, আবুল মনসুর আহমদ, শিল্পী সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, আব্বাসউদ্দিন আহমদ, গবেষক পÐিতদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, সাংস্কৃতি সংগঠকদের মধ্যে ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবুল কাসেম, সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে সৈয়দ আলী আহসান, কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে মাহবুব উল আলম, হুমায়ূন আহমদ, নাট্যকারদের মধ্যে আসকার ইবনে শাইখ প্রভৃতি নামের গুণী ব্যক্তিদের জন্ম সম্ভব হতে দেখতে পেরেছি।
তবে এসবের মধ্যে সব চাইতে উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি হচ্ছে বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং একুশে ফেব্রæয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পাওয়া, যা উপমহাদেশের ভারতসহ অন্য কোন রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয়নি।ৃ



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর