Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

বিদেশী সংস্কৃতি স্বাধীনতার জন্য হুমকি

হাফেজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিন আলাউদ্দীন | প্রকাশের সময় : ৯ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

বাংলাদেশ। হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ ও লালনকারী একটি দেশ। যে দেশের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি-স্বকীয়তা। আছে গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য। সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয় বহন করে। সংস্কৃতি দিয়েই একটি জাতি অন্য জাতি থেকে আলাদা হয়। নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বকীয়তা একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতিক। গেøাবালাইজেশনের এই সময়ে যে জাতির সংস্কৃতি যতটুকু স্বতন্ত্র, সে জাতি ঠিক ততটুকুই স্বাধীন। কেউ যদি একটি দেশের বা জাতির স্বাধীনতা ধ্বংস করে দিতে চায়, তাহলে আধুনিক এই যুগে সশ¯্র হামলার খুব বেশী প্রয়োজন নেই। যদি সেই জাতির স্বকীয়তা ও সংস্কৃতিতে বিজাতীয় ধ্বংসাত্মক অপসংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তবে সেই জাতি এমনিতেই তাদের গোলামে পরিণত হবে। কেননা, সংস্কৃতি একটি জাতির সামগ্রিক পরিচয় বহন করে। একটি জাতির মানুষ যা করে, যেভাবে করে, যা দেখে, যেভাবে দেখে, যা চিন্তা করে, যেভাবে চিন্তা করে, যা পরে, যেভাবে পরে, সেটাই একটি জাতির সংস্কৃতি। যেমন ইংরেজ জাতি ও আমাদের সংস্কৃতিতে বিস্তর ফারাক। উদাহরণ সরূপ দুয়েকটি বলা যেতে পারে। যেমন ইংরেজদের সংস্কৃতিতে তাদের ড্রেস কোড হলো, কোর্ট-টাই, বেøজার ইত্যাদি। মদ্যপান হলো তাদের প্রধান পানীয়, তাদের আচার-অনুষ্ঠান কোনকিছুই শুরু করা হয় না যতক্ষণ না তারা শ্যাম্পেনের বোতলে গলা না ভেজায়। এদিকে এদেশের সংস্কৃতি হলো লুঙ্গি, শাড়ী ও টুপি পাঞ্জাবী। মদ্যপান এদেশের ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছেই পরিত্যাজ্য। 

হাজার বছর ধরেই বাংলা মুসলমানদের একটি দেশ। তাই এ দেশের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে মুসলমানিত্ব ও ধর্মীয় আবেশে। এই বাংলার বেশীর ভাগ মানুষ কৃষি নির্ভর হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বাংলার সংস্কৃতিতে গৃহস্থের উৎসবগুলো অনেকখানি জায়গা দখল করে আছে। সে উৎসবগুলো বাদ দিলে বাংলার ঐতিহ্য বলে কিছু থাকে না। মুসলমান হিসাবে এদেশের মানুষের প্রধান উৎসব হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এবং ধর্মীয় আচারগুলোই হলো এদেশের প্রধান সংস্কৃতি। ৬০-৭০ ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর ও গৃহস্থ হওয়ায় গ্রামীণ উৎসবগুলোও এদেশের সংস্কৃতিতে স্বমহিমায় উজ্জল হয়ে আছে। আজ থেকে ১০ বৎসর পূর্বেও যে উৎসবগুলো ছিল এদেশের সংস্কৃতির প্রধান অনুসঙ্গ ১০ বছরের ব্যবধানে এখনকার ছেলেমেয়েরা নামও হয়তো জানেনা। আন্তঃজালের এই সেবা আমাদের জন্য কতটুকু আশির্বাদ আর কতটুকু অভিশাপ তা হয়তো সময়ই বলে দিবে। যে জাতির বিনোদন ছিল নবান্ন, পিঠা আর গ্রামীণ মেলার মতো উৎসব। যে জাতির জীবনে বছরের দুইটি ঈদ ছিল সবচেয়ে আকাক্সক্ষার দিন। সে জাতি আজ নিজেদের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে পালন করে বিদেশ থেকে আমদানি করা অপসংস্কৃতি। আমরা দেখতে পাই কিছু নাস্তিক দেশ ও ইসলাম বিরোধীদের হাত ধরে এদেশে প্রবেশ করে ভ্যালেন্টাইনস ডে নামক চরিত্র ও ইমান বিধ্বংসী তথাকথিত পশ্চিমা কালচার। জাতি যখন ভালবাসা দিবস নামক ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কোমার পর্যায়ে চলে গেছে তখন ইন্টারনেটের হাত ধরে এদেশে আমদানি হচ্ছে কিস ডে, রোজ ডে, প্রপোজ ডে, চকলেট ডে, টেডি ডে নাম সমূহের মতো জঘন্য সব নামের দিবস, যা শুধুমাত্র যৌন সুরসরি নয় সরাসরি যিনার আমন্ত্রন। আজ ইউরোপ আমেরিকায় মায়ের পরিচয়ে সন্তানের পরিচয় দিতে হয়। কিন্তু ইসলাম সন্তানকে বাবার পরিচয়ে পরিচিত করে। বংশ ধারা বাবার বংশের সাথেই নির্ধারিত করে। পশ্চিমা বিশ্বে মায়ের পরিচয়ে সব কাজ করতে হয়। কারণ অধিকাংশ ছেলে মেয়েই জানে না তাদের জন্মদাতা আসলে কে। আর সেই জন্মপরিচয়হীন জারজ কালচার মুসলমানের অভয়ারন্যে চালু করতে ৯০ দশকের শুরুর দিকে এক নাস্তিক তার বিদেশী প্রভুদের ছত্রছায়ায় এদেশে আমদানি করে ভালবাসা দিবস। আমার পুতঃপবিত্র এই মাটিকে নষ্ট করার চক্রান্তে এই নাস্তিক গোষ্টি অনেক এগিয়ে গেছে। এই যে আমাদের চরিত্রের আজ অবক্ষয়, রাস্তা ঘাটে বেওয়ারিশ শিশু। কুকুর শিয়ালে টানাটানি করছে নাম পরিচয়হীন মানব সন্তান। তার সবকিছুই ভ্যালেন্টাইনস নামক ক্যান্সারের অবদান। বিলিভ ইট ওর নট। এটাই সত্যি যে, এদেশের টিনএজরা এই চরিত্র বিধ্বংসী তথাকথিত দিবসগুলো খুব ঘটা করেই পালন করছে আর গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে নিজের চরিত্র, ইমান ও সমাজ ধ্বংস করছে।
এগুলো ছাড়াও হাল আমলে এদেশে আরও কিছু দিবস পালন করা হচ্ছে। বন্ধু দিবস নামক একদিনে একজন আরেকজনের হাতে সুতা বেঁধে দেয় অন্য ধর্মের একটি অনুষ্ঠানের আদলে। ওই ধর্মে হাতে সুতা (রাখি) বেঁধে দেয় কারণ তারা বিশ্বাস করে এই কাজটি করলে তাদের বন্ধন চিরদিন থাকবে। আর এটাই তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস। তেমনিভাবে বন্ধুদিবসেও এই বিশ্বাস নিয়েই একে অন্যের হাতে সুতা বেঁধে দেয়। যা সরাসরি একটি শিরকী চিন্তা। কয়েকবছর যাবত ‘রং খেলা’ নামক একটি খেলায় মুসলমান ছেলে-মেয়েদের অংশগ্রহণ লক্ষ্য করার মতো। বিশেষ করে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যাপকভাবে সেই অনুষ্ঠান পালন করছে। আবার কোনো কোনো স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করা হচ্ছে অংশগ্রহণ করার জন্য। কিছু কিছু জায়গায় শোনা গেছে যে স্কুলের গেইট বন্ধ করে দিয়ে জোরপূর্বক উক্ত খেলায় অংশগ্রহন করানো হচ্ছে। আরও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা গেছে এই দিন আবার অন্য একটি ধর্মের ধর্মীয় উৎসব। সেই উৎসবেও রং দিয়ে রাঙ্গিয়ে দেয় একে অপরকে। সেটি তাদের ধর্মীয় উৎসব। ঠিক একই দিনে মুসলমান ছেলে মেয়েদের একই রকম অনুষ্ঠান পালন করা কি পরিকল্পিত না কাকতলীয় সেটি ভাবার বিষয়। আল্লাহর উপর বিশ্বাসস্থাপনকারী কোনো মানুষ এইসব অনুষ্ঠান, উৎসবে যোগ দিতে পারে না। তাই জাতিসত্বার দোহাই দিয়ে কৌশলে মুসলমান ছেলে-মেয়েদের শিরকে লিপ্ত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না সেটা কে বলবে? এই বিজাতীয় কালচার আমাদের সংস্কৃতি কবে থেকে হলো তা খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবী।
ষড় ঋতুর এই বাংলাদেশে ঋতুরাজ বসন্তের আগমন নিয়ে গ্রাম বাংলায় উৎসব পালন করা হতো। কিন্তু ইদানিং এই উৎসব আর গ্রামে গঞ্জে পালন করা হয় না। এই উৎসব এখন শহুরে উৎসব। বসন্তকে বরণ করার নামে এখন সমাজে বেহায়াপনা মহামারীর আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আমাদের ভাষার মাস, শোকের মাস ফেব্রæয়ারি একটি অবাধ মেলামেশা আর অবৈধ সম্পর্কের প্রধান মাস হিসাবে পরিচিত হয়ে গেছে। এখন ফেব্রæয়ারি আর শোকের মাস নেই। ফেব্রæয়ারি এখন যৌনতা আর রুচিহীন সংস্কৃতির মাস। আবহমান বাংলার ঐতিহ্য উৎসব নবান্ন, পিঠা উৎসব এখন আর আমাদের নিজেদের সংস্কৃতি বলে মনেই হয় না। বাঙ্গালী জাতি ¯েøাগানের ধোয়া তুলে বৈশাখি উৎসব নামে মুসলমানদের এখন সরাসরি মূর্তিপূজায় অংশগ্রহন করানো হচ্ছে। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম, অজপাঁড়া থেকে গাঁয়ের অলিগলি কোথাও এখন আর হিন্দি গানের ডিজে ছাড়া অনুষ্ঠান আশা করা যায় না। সুন্নতে খতনা অনুষ্ঠানেও এখন বিজাতীয় অশ্লিল গানের সাথে ছেলে-মেয়েদের নৃত্য যেন বাধ্যতামূলক। যুবসমাজ মেতে আছে বলিউড নিয়ে। যারা বুঁদ হয়ে থাকে আনুশকা, ক্যাটরিনা আর অরজিত সিংদের নিয়ে। ঘরের মা-মেয়েরা আছে স্টার জলসা, জি বাংলা আর স্টার প্লাসের ক‚টনামী, পরকীয়া আর চরিত্র বিধ্বংসী সব সিরিয়াল নিয়ে। যেখানে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে একত্রে বাবা ছেলে দুই বোন কে বিয়ে করার মতো জঘন্য কাহিনী। প্রমোট করা হচ্ছে লিভ টুগেদার নামে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে। পৃথিবী না চেনা শিশুরা মা বাবাকে চেনার আগেই ডোরিমন আর মুটো পাতলুকে চিনে ফেলে। মা-বাবা ডাকা শেখার আগে হিন্দি ভাষা বুঝতে এবং বলতে পারে। আমাদের ধর্মীয় উৎসবেও এখন ভিনদেশী সংস্কৃতির অপচ্ছায়া। ঈদে এখন অন্য দেশের লেহেঙ্গা, কিরণমালা বা পাখি ড্রেস না হলে চলে না। কোনো কোনো জায়গায় নাকি সেইসব ড্রেসের জন্য আত্মহত্যাও করে ফেলেছে কয়েকজন। জামা-কাপড় না পরে থাকা এ্যক্টরের নামে ড্রেসের নামকরণ করা হয়। আমাদের মেয়েরা আবার সেইসব ড্রেস ছাড়া ঈদ উদযাপনই করতে পারে না।
যেখানে আমাদের সংস্কৃতি বছরে দুইটি ঈদ ছাড়াও ছিল শবে বরাত-শবে কদরে রাত জেগে ইবাদত করা। রমজান মাসে সবাই মিলে সেহরি ইফতার করা। শুক্রবারদিন জুমার নামাযে সবার মনে ঈদের আনন্দ বিরাজ করা। গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় ওয়াজ-মাহফিল। সেই মাহফিল উপলক্ষে আগে পরে সাতদিন গ্রামীণ মেলা ছিল আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সেখানে মঙ্গল প্রদীপ, তীলক-ঢোলক, হোলি আর রাখি বন্ধন কোত্থেকে এলো? কেন এলো? কেন একটি স্বাধীন জাতিকে মননে-মস্তিষ্কে পঙ্গু করে দেওয়া হচ্ছে? মোহাম্মদী চেতনা-আদর্শে বেড়ে উঠা এদেশের সংস্কৃতিতে বিজাতীয় সংস্কৃতির এই নগ্ন আগ্রাসন কেন? কেন আমাদের সংস্কৃতিতে শিরকী অপসংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল? কারা আমাদের সহজ সরল মুসলমানদের মুশরেক বানানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে আর কারা নর্দমা সংস্কৃতির নীল বিষ এই সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছে? এসব কিসের আলামত, তা যদি এখনই চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তাহলে সেইদিন খুব বেশী দূরে নয় যেদিন আমরা আমাদের স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে ভিনদেশী হয়ে যাবো। পতাকা থাকবে কিন্তু স্বাধীনতা থাকবে না। অবয়ব মুসলমানের থাকলেও ঈমান আকীদায় মুসলমানের চিহ্নও থাকবে না।

মুসলিম ঐক্য আজ
বড়ই প্রয়োজন

মুফতী শামছুল হক সা‘দী আল্-হাবীবী

\ এক \
বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত মুসলিম জাতির ঐক্য আজ বড়ই প্রয়োজন। কথায় আছে একতাই শক্তি, একতাই বল। মিশকাতুল মাসাবীহ ৪২৩ পৃষ্ঠার একটি হাদীসে আছে মুসলমান মুসলমানের ভাই। তাই, ভাইদের মাঝে ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। মুসলিম উম্মাহর অস্তিত্ব উন্নয়ন ও অগ্রগতি সম্পর্কীয় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সর্বস্তরের মুসলমানের বিশেষ করে দেশের আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখ, দ্বীনের সকল শাখার খাদেমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের দাবী। অনেক বছর আগে একটি ইসলামীক সংগিত শুনেছিলাম; “এক হও মুসলিম এক হও আজ,এক হওয়া ঈমানের মূল কারুকাজ। আল্লাহর রজ্জুকে ধর এক হয়ে...........।” ইমদাদিয়া লাইব্রেরী, চক বাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত “উর্দূ কী তেছরী কিতাবের ১২৯-১৩০ পৃষ্ঠার মধ্যে লিখিত আছে ঐক্যের শক্তি: এক ব্যক্তির কয়েকজন ছেলে ছিল। এই বেআদব ছেলেরা পরস্পরে প্রতিদিন লড়াই করত। বাবা যথা সম্ভব বোঝাতেন, কিন্তু কোনো লাভ হতনা। একবার বাবা ঐ সকল ছেলেকে একত্রিত করে একটি কাঁচা তাগার চড়কি/লাটাই দিলেন এবং বললেন এর উপর নিজ নিজ শক্তি পরীক্ষা কর। প্রত্যেকে দাঁত কটমটরত অবস্থায় যথেষ্ট শক্তি প্রয়োগ করল, চড়কি /লাটাইকে একজনও ছিঁড়তে পারল না। অত:পর বাবা প্রত্যেককে একটি একটি করে কাঁচা তাগা দিয়ে বললেন একে ছিঁড়ে ফেলো। সবাই এক এক হেঁচকা টানেই নিজ নিজ তাগা ছিঁড়ে ফেললো। এখন বাবা বললেন, দেখো! কাঁচা তাগা কত দূর্বল হয়ে থাকে, কিন্তু অনেকগুলো দূর্বল মিলে এ পরিমাণ শক্তিশালী হয়ে গিয়েছে যে, তোমাদের মধ্য থেকে কেউও ওগুলোকে ছিঁড়তে পারলে না। কিন্তু যখন এই তাগা পৃথক পৃথক করে দেয়া হয়েছে তখন তোমাদের মধ্য থেকে প্রত্যকেই সবগুলোকে সহজেই ছিঁড়ে ফেললে।এমনিভাবে স্মরণ রেখো! যে, তোমরা ভাই ভাই যদি এক হয়ে মিলে মিশে থাকো তাহলে কোনো শক্র তোমাদের কোনো প্রকারের ক্ষতি পৌঁছাতে পারবে না। আর যদি একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাও তাহলে প্রত্যেক ব্যক্তি তোমাদের উপর বিজয়ী থাকবে। আমাদের এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সবধরনের ক্ষতিকর অনৈক্য পরিহার করা উচিত। এজন্য পরস্পরে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, গিবাত, শেকায়েত; হিংসা বাদ দিয়ে একে অপরের প্রকৃত বন্ধু, মঙ্গলকামী, সহযোগী, উৎসাহ প্রদানকারী, ভালাই কামনাকারী হওয়া উচিৎ। পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক কায়েম করা উচিত। কেননা, মানবতার বাসযোগ্য সুন্দর এক পৃথিবী গড়তে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই।
জলীলুল কদর সাহাবী হযরত আনাস রাযি. এর সূত্রে বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে প্রিয় নবী কারীম সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, পরস্পরে শক্রতা কোরো না। পরস্পরে হিংসা পোষণ কোরো না। একে অন্যের ছিদ্রান্বেষণ কোরো না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বান্দাহ সকলেই ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী শরীফ : ৮৯২ পৃষ্ঠা) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন, মুমিন নর-নারী এক অপরের বন্ধু। [মহাগ্রন্থ আল কুরআনুল কারীম (হাফেজী) ১৯৯ পৃষ্ঠা, ১০ নং পারা, সূরা আত-তাওবাহ ৭১নং আয়াত] অতএব, ঐক্য রক্ষার খাতিরে সত্যিকারে কোনো ভুল হলে প্রকাশ্যে না বলে গোপনে হিকমতের সাথে, ইজ্জতের সাথে, আদবের সাথে বলা। “ইখতিলাফ মা‘আল ইত্তিহাদ/ইখতিলাফ মা‘আল ই’তিলাফ তথা বৈধ মতপার্থক্য সহকারে ঐক্য/ বৈধ মতপার্থক্য সহকারে পারস্পরিক মুহাব্বাত” মূলনীতি অনুসরণ করা। পারস্পরিক হামদর্দী/সহানুভূতি, ভালো ও তাক্বওয়ার কাজে সাহায্য, সহযোগীতা অব্যহত রাখা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের কে এগুলোর উপর সহীহভাবে আমল করার এবং এক হওয়ার, সারা জীবন পরস্পরে মিলে মিশে এক থাকার তৌফিক দান করুন, আমীন।
উল্লেখ্য যে, আমার মুহতারাম শাইখ মুসলিহুল উম্মাহ আল্লামা মুফতী নূরুল আমীন সাহেব দা.বা., পীরসাহেব (সুলাইমান নগর ও জিরো পয়েন্ট) খুলনাকে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেন, আমাদের মাশায়েখ, রুমিয়ে যামানা, কুতবুল আলম, আল্লামা শাহ্ হাকীম মুহাম্মাদ আখতার সাহেব রহ., পীরসাহেব, করাচী, পাকিস্তান), বলেন যে, দ্বীনের এক শাখার খাদেম অন্য শাখার খাদেমকে রফীক তথা বন্ধু মনে করবে, ফরীক মনে করবে না, ফরীক মানে গ্রæপ, দল, দুশমন, প্রতিদ›িদ্ব। (উদাহরণ স্বরূপ) তাবলীগওয়ালারা সূলুকওয়ালাদেরকে/তাসাওউফ, তাযকিয়া, পীর-মুরীদী ওয়ালাদেরকে বন্ধু মনে করবে। আবার সূলূক (তরীকত)ওয়ালারা তাবলীগ ওয়ালাদেরকে বন্ধু মনে করবে। আবার এরা দুজনে মিলে মাদ্রাসা ওয়ালাদেরকে/তা‘লীম ওয়ালাদেরকে বন্ধু মনে করবে। আবার এরা সবাই মিলে জিহাদ/ক্বিতাল কি সাবিলিল্লাহ ওয়ালাদের কে বন্ধু মনে করবে। এভাবে সবাই একে অপরকে বন্ধু মনে করবে। (উদাহরণ স্বরূপ) তাবলীগ তো আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেছেন। আমারও করার দরকার ছিল, আমি করতে পারছিনা, এটা আমার দুর্বলতা, তাই যে করছে সে আমার বন্ধু (অনুরূপ ভাবে দ্বীনের সব শাখার কাজের ব্যাপারে নিজের দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য করে দ্বীনের অন্যান্য শাখার খাদেমদেরকে বন্ধু মনে করবে।)
দোস্ত আযিযো, দাওয়াত ও তাবলীগকে যেমন নবীওয়ালা কাজ মনে করবো অনুরূপ ভাবে তা‘লীম-তাযকিয়া, জিহাদ (ক্বিতাল) সহ দ্বীনের সকল কাজকে নবী ওয়ালা কাজ মনে করবো। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলমী নবী (বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। নবীর সব কাজ আলমী/বিশ্ব কাজ।

নৈতিক চরিত্র সংরক্ষণে বিয়ের গুরুত্ব
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

\ এক \
মানবতার ধর্ম ইসলাম নারী পুরুষের মধ্যে সুন্দর ও পুত: পবিত্র জীবন যাপনের জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ব্যবস্থা করেছে। নোংরামির অভিশাপ থেকে সুরক্ষা দানে ইসলাম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিয়েছে। কেননা নারী-পুরুষের পবিত্রতা ও সতিত্ব রক্ষার বাস্তব হাতিয়ার হল বিবাহ ব্যবস্থা। বিয়ে হল পুরুষ ও নারীর মাঝে সামাজিক পরিবেশে এবং ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক অনুষ্ঠিত এমন এক সম্পর্ক যার ফলে নারী পুরুষ দু’জনে একত্রে বসবাস এবং পরস্পরের যৌন সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ন বৈধ হয়ে যায়। বিবাহ একটি শুভ ও ধমীর্য় অনুষ্ঠান যা পালনের মধ্য দিয়ে নারী পুরুষের ভবিষ্যৎ জীবনের সূচনা হয়। এই বিবাহ অনুষ্ঠানে আনন্দ উল্লাসের নামে বেহায়পনা বা অশ্লীল অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিবর্তে ধর্মীয় রীতিনীতি বজায় রাখা অবশ্যই কর্তব্য। ইসলাম বৈরাগ্য নীতির কোন স্থান নেই। ইসলামে সামর্থবান ব্যক্তিকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আদেশ দেয়। সামর্থ থাকা সত্তে¡ও বিবাহ না করা ইসলামে নিষিদ্ধ এবং অপরাধ। বিবাহ কেবল ভোগ বিলাসের জন্য নয় বরং বিয়ে হল প্রত্যেক নর-নারীর জীবনকে পুত: পবিত্র, সুন্দর এবং সার্থক করার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মাধ্যম।
পবিত্র কোরআন শরীফে বিয়ে এবং স্ত্রী গ্রহণের ব্যবস্থাকে নবী রাসুলের প্রতি আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ দান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, “হে নবী আপনার পূর্বেও আমি অনেক নবী-রাসুল পাঠিয়েছি এবং তাদের জন্য স্ত্রী ও সন্তানের ব্যবস্থা করেছি”। আয়াতের মর্মবানী থেকে বুঝা যায় বিবাহ আল্লাহ পাকের প্রদত্ত একটি ঐশী বিধান। একই প্রসঙ্গে সুরা নূরে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “এবং বিয়ে দাও তোমাদের এমন সব ছেলে মেয়েদের স্বামী স্ত্রী বা স্ত্রী নেই; বিয়ে দাও তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা বিয়ের যোগ্য হয়েছে”। বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর উপর গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়। সূরা বাকারার ১৮৭ আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোষাক স্বরূপ আর তোমরা তাদের জন্য পোষাক স্বরূপ। অর্থাৎ পোষাক যেমন করে মানব দেহকে সকল প্রকার নগ্নতা, অশ্লীলতা থেকে বাঁচিয়ে রাখে ঠিক তেমনি বিবাহর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে সেভাবে বাঁচিয়ে রাখে। এ প্রসঙ্গে মিশকাত শরীফে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি বিয়ে করল তার অর্ধেক দিন ঈমান পূর্ণ হল, আর বাকী অর্ধেকের বিষয়ে যেন আল্লাহকে ভয় করে”। আরো বলা হয়েছে; “স্বামী-স্ত্রী যখন একান্তে বসে আলাপ করে, হাসি খুশী করে তার সওয়াব নফল এবাদতের মতো”। তাছাড়া স্ত্রীরা জগতের অস্থায়ী সম্পদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলেও হাদীসে রয়েছে।
বিয়ের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা প্রত্যেক নর নারীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরশাদ হচ্ছে, “তোমরা তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে তাদের বিয়ে কর: যথাযথভাবে তাদের মোহর প্রদান কর; যেন তারা বিয়ের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকতে পারে এবং অবাধে যৌনচর্চা ও গোপন বন্ধুত্বে লিপ্ত না হয়ে পড়ে”। (সুরা নিসা আয়াত ২৫) এই আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বিয়ে করার প্রতি উৎসাহ প্রদান এবং বিয়ে না করে অবৈধ যৌন সম্পর্ককে নিরুৎসাহিত করেছেন। পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি প্রিয় নবী (দঃ) ও সামর্থবানদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রতি বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন এবং সামর্থ থাকা সত্তে¡ও ইচ্ছাকৃতভাবে বিবাহ না করাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দয়াল নবী (দঃ) ইরশাদ করেন, হে যুব সমাজ তোমাদের মধ্যে যারা বিয়ের সামর্থ রাখে তারা তাদের বিবাহ করা কর্তব্য। কেননা বিয়ে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণকারী, যৌন অঙ্গের পবিত্রতাকারী আর যার সামর্থ নেই সে যেন রোজা রাখে।
এ প্রসঙ্গে হযরত আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত “কুমারিত্ব এবং অবিবাহিত নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের কোন নিয়ম ইসলামে নেই”। সামর্থ থাকা সত্তে¡ বিবাহ না করার পরিণতি সম্পর্কে প্রিয় নবী (দঃ) বলেছেন, “যে লোক বিবাহ করার সামর্থ থাকা সত্তে¡ও বিয়ে করে না সে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল নহে”। সামর্থ থাকা সত্তে¡ও বিবাহ না করার ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখ করে দয়াল নবী (দঃ) বলেন, যা হযরত মা আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত “বিয়ে করা আমার আদর্শ এবং স্থায়ী নীতি যে লোক আমার এ সুন্নাহ অনুসারে আমল করবে না সে আমার দল ভুক্ত নয়”। ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে একটি দেওয়ানী চুক্তি। অভিভাককের মাধ্যমে নারী নিজেকে বিয়ের জন্য উপস্থাপিত করে আর পুরুষ তা গ্রহণ করে অর্থাৎ ইজাব এবং কবুলের মাধ্যমে একটি বিয়ে সম্পূর্ণ হয়।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ