Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকছে কোথায়?

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ১০ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

গত ২৭ ফেব্রয়ারি ২০১৮ জাতীয় দৈনিকে বর্ণিত সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে। ‘দেশের সাতটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এর মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও তিনটি বেসরকারি ব্যাংক। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সাতটি ব্যাংকে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৪১৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মূলধন ঘাটতিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংক সোনালী, রূপালী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি সাত হাজার ৬২৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং বেসরকারি তিনটি ব্যাংক কমার্স, ফারমার্স ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের এক হাজার ৭৯১ কোটি ২০ লাখ টাকা। গত ২৬ ফেব্রয়ারি সোমবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ তথ্য জানান। স্বতন্ত্র সদস্য আবদুল মতিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তিন হাজার ১৪০ কোটি ৪১ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ঘাটতি ৬৮৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, জনতা ব্যাংকের ঘাটতি এক হাজার ২৭২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দুই হাজার ৫২২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ২৩১ কোটি ৩১ লাখ টাকা, ফারমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৭৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি এক হাজার ৪৮৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে ২০০৫-২০০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকার পুনমূলধনীকরণ সুবিধা দিয়েছে। যা ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোতে মূলধন হিসাবায়নে যুক্ত হয়েছে। তিনি জানান, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি ছিল সাত হাজার ৫৬৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এই সময়ে বেসরকারি ব্যাংকে উদ্বৃত্ত প্রভিশন রয়েছে এক হাজার ৭৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সামগ্রিকভাবে মোট ঘাটতি প্রভিশনের পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৩৪৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দুই হাজার ৯০০ কোটি ৯১ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের এক হাজার ২৪৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের তিন হাজার ৪২১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ১৯৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ৮৬১ কোটি ৬১ লাখ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৮৯ কোটি ৯ লাখ টাকা।’
পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে ব্যাংক মূলধন ঘাটতির সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলেও ডিজিটাল চুরির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের কত টাকা পাচার হয়েছে এবং কত টাকা ফেরৎ এসেছে তার সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। বর্ণিত ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিয়ার রহমান পদত্যাগ করলেও সরকারের তরফে তার সাফাই গেয়ে বলা হয়েছে, তিনি কোন কারণেই অপরাধী নন। দুর্নীতি বা দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদত্যাগ এটাই প্রথম। তবে প্রধান বিচারপতির (এস. কে সিনহা) পদত্যাগের কারণ ভিন্ন। যাহোক বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চলে যাওয়ার পিছনে কাদের ব্যর্থতা বা অসাবধানতা বা যোগসাজস রয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কি না তাও ধোঁয়াশাই রয়ে গেল।
হলমার্ক, ডেস্টেনি হরিলুট ছাড়াও শেয়ার কেলেঙ্কারিতে কারা জড়িত এ তথ্যও জাতির সামনে প্রকাশ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এর পিছনে কারণ কী? নিশ্চয় সরকারি ঘরানার লোকেরা এ কেলেঙ্কারিতে জড়িত, নতুবা শেয়ার বাজারে ধ্বস্ নামিয়ে জনগণের যে আর্থিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করা হলো এবং অর্থনীতিতে ধ্বস্ নামলো এর পরও কি শুধুমাত্র দোষী ব্যক্তিদের জনগণ থেকে রক্ষা করার জন্য তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি? সরকার অনেক রিপোর্টই প্রকাশ করেনি, যেমন প্রকাশিত হয়নি পিলখানার বিডিআর ট্রাজেডির রিপোর্ট, প্রকাশ হয়নি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার রিপোর্ট। প্রকাশিত হয়নি ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির বিবরণ প্রভৃতি যা সম্পর্কে জনগণ অন্ধকারে রয়ে গেল। তাছাড়াও সকল পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। ইতোপূর্বে কোন দিন গণহারে এমনিভাবে প্রশ্নফাঁস হওয়ার তথ্য সরকার বা প্রধানমন্ত্রী কি দিতে পারবেন?
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে’ সরকার সর্ব বিষয়ে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করছে। শত ব্যর্থতার মধ্যেও সরকারের ভাবখানা এরকম যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বহির্ভূত কোন কাজে সমর্থন বা পৃষ্ঠপোষকতা তো দূরের কথা, সরকার নামগন্ধও শুনতে চায় না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দিকে যদি আমরা ফিরে তাকাই তবে সংবিধানে এ সম্পর্কে যা বলা আছে তার উপরই নির্ভর করা যুক্তিযুক্ত। সংবিধানের ‘প্রস্তাবনার’ তৃতীয় প্যারায় বলা হয়েছে যে, ‘আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সরকার সত্যিকার অর্থেই লালন করে তবে আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার করার অবস্থান সরকার কোথায় নিশ্চিত করছে? স্বাধীনতাবিরোধী আখ্যা দিয়ে বিরোধী পন্থীদের মাঠেই নামতে দিচ্ছে না সরকার। সংবিধানের তৃতীয় পরিচ্ছেদে মৌলিক অধিকার তথা রাজনীতি করার অর্থাৎ মিছিল-মিটিং, শোভাযাত্রা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সর্ব বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কার্যকর হচ্ছে কোথায়?
ভাষার অধিকার, ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার তথা সম্পদের সুষম বণ্টনের অধিকার বাস্তবায়নের দাবীতেই বীর বাঙ্গালী মুক্তিযুদ্ধের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলো। কিন্তু সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং ধনীকে আরো ধনী করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংক লুট, বন লুট, পাহাড় লুট, এমনকি গ্রাম এলাকায়ও আবাসন প্রকল্পের নামে ধানী জমি ভ‚মিদস্যুরা লুট করে নিচ্ছে। ভ‚মিদস্যুরা খাল, বিল, নদী-নালা ভরাট করে জাল দলিলের মাধ্যমে অগ্রীম জনগণের নিকট বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বা মাকর্সবাদ, লেলিনবাদ বা পুঁজিবাদী অর্থনীতির রাজনীতিÑ সবগুলিরই নিজস্ব একটি নিয়মনীতি রয়েছে, কিন্তু লুটেরাদের কোন নিয়মনীতি বা আদর্শ নেই। তাদের আদর্শ, যেখানে যে অবস্থায়ই যা পাবে তা লুট করে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করো।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য মতে, চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ নয় হাজার ৪১৭ কোটি ৪৩ লক্ষ টাকা। তবে এ ঘাটতি কি জনগণের অর্থের ঘাটতি নয়? ব্যাংকিং সেক্টর এখন সরকারি ঘরানায় ধনীক শ্রেণির হাতে বন্দি। এক ব্যাংকের ডিফলটার অন্য ব্যাংকের ডাইরেক্টর এমন তথ্য বিরল নয়। অধিক ইন্টারেস্ট প্রদানের লোভ দেখিয়ে অনেক আমানত সংগ্রহ ও ঋণ প্রদানকারী ভ‚ইফোঁড় কোম্পানি গ্রামে গঞ্জে গড়ে উঠেছে। তাদের অধিকাংশই মূলধন অন্যত্র সরিয়ে রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কোম্পানি দ্বারাও আমানতদাররা পুঁজিপাট্টা সব হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংক বা যে কোন ব্যাংক ক্ষয়ীষ্ণু হয়ে পড়ে আর্থিক লেনদেনের প্রশ্নে আস্থা হারিয়েছে। অতঃপর জনগণ যাবে কোথায়?
লেখক: কলামিস্ট ও বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ