Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮, ৮ বৈশাখ ১৪২৫, ০৪ শাবান ১৪৩৯ হিজরী

রাজধানীতে ডিবির পরিদর্শক জালাল সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২১ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগে সন্ত্রাসীদের সাথে গোলাগুলিতে ডিবি পুলিশের পরিদর্শক জালাল উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।
গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিদর্শক জালাল উদ্দিনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে জানাজা শেষে লাশ দাফনের জন্য ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানায় তার গ্রামের বাড়ি গতরাতেই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জালাল অপরাধ দমনে সাহসী ভূমিকার জন্য ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পদক পেয়েছিলেন।
পুলিশ জানা, তিনি গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল নিয়ে মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিলন। ওই বাড়িতে কয়েকজন সন্ত্রাসী অবৈধ অস্ত্র জড়ো করেছে এমন সংবাদে ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। গোলাগুলির সময় পরিদর্শক জালাল উদ্দিনের মাথায় গুলি লাগে। পরে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। সোমবার রাতে ১২টার সময় এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, রাজধানীর মিরপুরের মধ্য পীরেরবাগে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযান চালানো বাসাটিতে অবস্থানকারী সন্দেহভাজন পলাতক এক সন্ত্রাসীর নাম হাসান। ওই নামেই পরিবারসহ ভাড়া নিলেও এটি তার আসল পরিচয় নয় বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেছেন, জালালের খুনিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। খুনিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, পুলিশের দুটি অস্ত্র মিরপুর থেকে খোয়া গিয়েছিল। সেই অস্ত্রের সন্ধানে একটা টিম সেখানে গিয়েছিল। সেখানেই সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হন জালাল।
মিরপুরের পীরেরবাগে সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে নিহত গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক জালাল উদ্দিন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখায় পাঁচ বছর আগে রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছিলেন।
২০১৩ সালে গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকার জন্য জালালকে সে সময় রাষ্ট্রপতি পদক পিপিএম সেবা দেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই পদক পরিয়ে দেন। আর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়েই সন্ত্রাসীদের গুলিতে জীবন দিতে হলো জালাল উদ্দিনকে।
জানা যায়,১৯৮৯ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগ দেন জালাল। রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়ার সময় জালাল উদ্দিন উপপরিদর্শক পদ মর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন।
রাজধানীর ওয়ারী থানায় দীর্ঘদিন থাকার পর দুই মাস আগে পদোন্নতি পেয়ে জালাল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৃতীয় তলার ছাদে তিনটি কক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে একটি কক্ষে হাসান নামে একজন তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। বাড়িটির মালিক হেলাল উদ্দিন ও তার স্ত্রী লাভলী বেগম মারা গেছেন। তাদের একমাত্র মেয়ে শারমিন পাশেই অন্য একটি বাসায় থাকেন। বাসাটি বর্তমানে দেখাশোনা করেন শারমিনের মামা মিঠু মিয়া।
মিঠু মিয়া বলেন, গত ৬-৭ মাস আগে এক নারী বাসাটি ভাড়া নেন। সে সময় তিনি জানান তার ছেলে ও ছেলের স্ত্রী থাকবেন। এরপর থেকে হাসান তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছিলেন। মাঝে-মধ্যে তার মা-ও থাকতেন।
মিঠু মিয়া আরো জানান,বাড়িভাড়ার জন্য যে জন্ম নিবন্ধন কার্ড দিয়েছিলেন সেখানে তার নাম হাসান বলেই উল্লেখ ছিল। হাসানের সঙ্গে মাত্র একবার দেখা হয়। তখন তিনি জানান, গাজীপুরের কাশিমপুরে নষ্ট টেলিভিশনের ব্যবসা করেন।
তিনি আরো বলেন,আমরাতো ভাড়াটিয়াদের বাসায় গিয়ে দেখি না যে তার কাছে অস্ত্র আছে কিনা। তবে তাকে দেখে এমন কিছু ধারণা করা যায়নি। বাসা ভাড়ার সময় যে সব কাগজপত্র দিয়েছিলেন সেগুলো পুলিশ নিয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।এদিকে ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক ডিবি সদস্য জানান, যে নাম-পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে তার সব ভুয়া।
সোমবার দিনগত রাতে মধ্য পীরেরবাগের ১০৫/এ/১ নম্বর বাড়ির তৃতীয়তলায় অভিযান চালান ডিবি সদস্যরা। অভিযানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারা যান ডিবির পরিদর্শক জালাল উদ্দিন। তবে ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন তিন সন্ত্রাসী পালিয়ে যায়।
জানা যায়, গত সোমবার রাত ১২ টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পশ্চিম বিভাগের পল্লবীর জোনাল টিমের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে যান জালাল উদ্দিন। তারা সেখানে গেলে সন্ত্রাসীরা গুলি ছোড়ে। এ সময় জালালউদ্দিনের মাথায় গুলি লাগে।

ওই রাতেই জালালকে রাজধানীর বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত দুইটার দিকে তিনি মারা যান।
মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে জালাল উদ্দিনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জালাল উদ্দিনের মাথার বাঁ পাশে গুলি লাগে। গুলির আঘাতে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাঁর মৃত্যু হয়।
গতকাল দুপুরে জালালের লাশ জানাজার জন্য রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়। জানাজায় অংশ নেন পুলিশর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জালাল উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ থানার ভোলাপাড়া গ্রামে। সেখানে গত রাতে তার দাফন করার কথা আছে।
জালালের মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছার পর সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। তার বৃদ্ধা মা সন্তাানের ছবি হাতে নিয়ে বিলাপ করতে থাকেন।
জালাল ঢাকার সবুজবাগ থানার পূর্ব বাসাবোর একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন।
সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত ওসির গ্রামে শোকের মাতম
ঝিনাইদহ জেলা সংবাদদাতা ঃ রাজধানী ঢাকার পীরেরবাগে সন্ত্রাসীদের সাথে গোলাগুলিতে নিহত গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পরিদর্শক জালাল উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ভোলপাড়ায় এখন শোকের মাতম চলছে। তিনি ওই গ্রামের বিশারত মন্ডল ও আয়েশা খাতুনের ছেলে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কালীগঞ্জের নিয়ামতপুর ইউনিয়নের ভোলপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় মা আয়েশা খাতুন ছেলের ছবি হাতে নিয়ে প্রলাপ করছেন। ছেলের মৃত্যুতে তিনি শোকে মুহ্যমান। নিহত জালাল উদ্দীন ৫ ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো। স্ত্রী ছাড়াও নিহত জালালের দুই মেয়ে রয়েছে। তার বড় মেয়ে তৃপ্তি ঢাকা ভিকারুন্নেছা নুন স্কুল এন্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং ছোট মেয়ে তুর্জা একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণি শিক্ষার্থী। উল্লেখ্য, সোমবার রাতে ১২টার সময় রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগের তিনতলা একটি বাড়িতে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। দুপক্ষের গোলাগুলির সময় পরিদর্শক জালালউদ্দিনের মাথায় গুলি লাগে। এসময় তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর সংবাদ গ্রামের বাড়িতে আসার পর শোকের মাতম শুরু হয়। গ্রামের লোকজন তাদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকে। এদিকে নিহত জালাল উদ্দীনের বৃদ্ধ মা নিহত ছেলে ছবি নিয়ে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন আমার ছেলের সাথে আর দেখা হবে না। আমাকে না বলে আমার জালাল আমার আগে চলে গেল। নিহত জালাল উদ্দীনের বন্ধু গোলাম রসুল জানান, ছোট বেলায় আমার গোপালপুর হাই স্কুলে পড়তাম। জালাল দারুন মেধাবী ও সামাজিক মানুষ ছিল। চাকরীতে যোগ দেওয়ার পর কৃতিত্বের সাথে দ্বায়িত্ব পালন করায় স্বীকৃতি স্বরুপ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন। কালীগঞ্জ থানার ওসি মিজানুর রহমান খান জানান, পুলিশ হেডকোয়াটার থেকে আমাকে এখনো অফিসিয়ালি কিছু জানানো হয়নি। তবে নিহত কর্মকর্তার সব ধরনের প্রক্রিয়া শেষে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো সময় হয়তো ম্যাসেজ আসতে পারে।

 

 


Show all comments
  • কাসেম ২১ মার্চ, ২০১৮, ২:৩৫ এএম says : 0
    নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর