Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নবী (স.)-এর বাণীতে জীবে দয়া

| প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০১৮, ১২:০০ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মানবতার ধর্ম ইসলামে নিষ্প্রয়োজনে বা নিছক চিত্তবিনোদনের জন্য পশু হত্যা করাকেও হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। করুনার মূর্ত প্রতীক নবী (স.) বলেন -“কোন ব্যক্তি যদি নিছক খেলার বশবর্তী হয়ে একটি প্রাণী হত্যা করে তাহলে কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর দরবারে উচ্চস্বরে ফরিয়াদ করে বলবে - হে আল্লাহ! সে আমাকে খেলার বশে হত্যা করেছে, কোন কাজে লাগানোর জন্য হত্যা করেনি”। (সুনানুন নাসায়ী, হাদীছ নম্বর-৪৫৩৫ ও সাহীহ ইবন হিব্বান, হাদীছ নম্বর-৫৮৯৪)।
জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাঁধাতেও নিষেধ করা হয়েছে। চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে পশুর চেহারা ঝলসানো বা গরম শলাকা ব্যবহার করে দাগ দেয়াও অন্যায়। এ ব্যাপারে একটি হাদীছ উল্লেখ করা যেতে পারে -“হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসূল (স.) এর পাশ দিয়ে একটি গাধা যাচ্ছিল, যেটির চেহারায় লাল দাগ দেওয়া ছিল। তা দেখে রাসূল (স.) বললেন - যে ব্যক্তি দাগ দিয়েছে তার উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক”। (সাহীহ মুসলিম, হাদীছ নম্বর-৫৬৭৪, সাহীহ ইবন হিব্বান, হাদীছ নম্বর-৫৬২৮)।
কিছু পশুকে মানুষের জন্য হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহর নাম নিয়ে জবেহ করে সেগুলো খেতে হয়। সে ক্ষেত্রেও মানবতার বাণী পরিলক্ষিত হয়। উত্তমভাবে জবেহ করতে বলা হয়েছে। জবেহ করার পূর্বে ছুরি ভাল করে ধার দিতে বলা হয়েছে যাতে জবেহ করার পূর্বেই তার অতিরিক্ত কষ্ট না হয়। নবী (স.) বলেন- “আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন প্রতিটি বস্তুর উপর অনুগ্রহ করা আবশ্যিক করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করবে তখন উত্তমভাবে হত্যা করবে। যখন তোমরা জবেহ করবে তখন উত্তমভাবে জবেহ করবে, ছুরিতে ধার দিবে এবং জবেহকৃত জন্তুকে ঠান্ডা হতে দিবে”। (সাহীহ মুসলিম, হাদীছ নম্বর-৫১৬৭)। অপর এক হাদীছে বর্ণিত হয়েছে- “রাসূল (স.) এক ব্যক্তির নিকট দাঁড়ালেন, সে ছাগলের কাঁধে পা রেখে ছুরিতে ধার দিচ্ছিল। ছাগলটি তীক্ষন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রাসূল (স.) বললেন -তুমি কি এটিকে এর (জবেহ এর) পূর্বেই মেরে ফেলতে চাও? হাম্মাদ আসিম থেকে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন, তাতে আছে- তুমি কি তাকে কয়েকবার মারতে চাও”? (সুনানুল বায়হাকী আল কুবরা, হাদীছ নম্বর-১৮৯২২)। কোন পশুর কোল থেকে তার শিশুকে কেড়ে নেওয়া অমানবিক। মানবতার মহান মুক্তিদূত নবী (স.) এ ধরনের কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। হযরত ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা.) বলেন- আমরা এক সফরে নবী (স.) এর সাথে ছিলাম। নবী (স.) বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে গেলেন। আমরা হুম্মারাহ (এক ধরনের চড়–ই পাখি বিশেষ) দেখতে পেলাম। তার সাথে দুটি বাচ্চা ছিল। আমরা তার বাচ্চাদুটি হাতে তুলে নিলাম। হুম্মারাহ এসে আমাদের মাথার উপর ঘুরাফেরা করতে লাগল। নবী (স.) ফিরে এসে বললেন- “বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে কে তাকে কষ্ট দিয়েছে? তার বাচ্চা তাকে ফিরিয়ে দাও”। (সুনানু আবী দাউদ, হাদীছ নম্বর-২৬৭৭, ৫২৭০)। সেই সফরে রাসূল (স.) দেখেন, একটি পিপীলিকার বাসা জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি (স.) জিজ্ঞাসা করলেন -কে এটা জ্বালিয়েছে? সাহাবীরা বললেন - আমরা জ্বালিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল! রাসূল (স.) বললেন -“কাউকে আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নেই”। (প্রাগুক্ত)।
উপরোল্লিখিত হাদীছ সমূহের আলোকে ফিকাহশাস্ত্রবিদগণ পশু-পাখির প্রতি দয়াদ্র আচরণ নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে এমন কিছু বিধি-বিধান রচনা করেছেন যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, জীব-জন্তুর প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটানো মালিকের জন্য অবশ্য কর্তব্য। সে স্বেচ্ছায় তা না করলে দেখাশুনা এবং প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে তাকে ইসলামী আইনে বাধ্য করা হবে। অন্যথায় সে তা বিক্রয় করতে অথবা বনে-জঙ্গলে ছেড়ে দিতে বাধ্য থাকবে। একদল ফিকাহবিদ এর মত হল - কোন অন্ধ বিড়াল যদি কারো গৃহে গিয়ে উঠে এবং এদিক সেদিক কোথাও যেতে না পারে তাহলে তাকে আহার দান করা গৃহস্বামীর অবশ্য কর্তব্য। হযরত ‘উমার ইবন ‘আবদুল ‘আযীয এক পত্রে গভর্নরদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, অশ্বকে অযথা মারা এবং উত্যক্ত করা থেকে লোকদের যেন বারণ করা হয়। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কেউ যেন অশ্বের মুখে ভারী লাগাম না লাগায়, চাবুকের অগ্রভাগে লোহা আছে এমন চাবুক কেউ যেন ব্যবহার না করে। তাঁর শাসনামলে পশুদের উপর সাধ্যাতীত ভার বহন করা থেকে বারণ করাও তত্তাবধায়কদের অন্যতম দায়িত্ব ছিল। (ড. মুস্তফা সুবায়ী, ইসলামী সংস্কৃতির উজ্জ্বল নিদর্শন, অনূঃ গোলাম সোবহান সিদ্দিকী (ঢাকাঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪২৫হি./২০০৪খ্রি.), পৃ. ১১৪-১১৫)।
ইসলামী খিলাফত আমলে প্রচুর পশুশালা ছিল যেগুলো অসুস্থ, পীড়িত এবং বৃদ্ধ পশুর লালন-পালনের জন্য ওয়াকফকৃত ছিল। ওয়াকফ এর প্রাচীন কাজপত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত দামেশকের মারজে-আহমার নামক জায়গাটি এক সময় উক্ত কাজে ব্যবহৃত হত। যে সকল বৃদ্ধ অশ্বকে তাদের মালিকরা অকেজো মনে করে দেখাশুনা করা বন্ধ করে দিয়েছিল এ ধরনের অশ্বের জন্য এ চারণভূমিটি নির্ধারিত ছিল। অশ্বগুলো আমৃত্যু সেখানে বিচরণ করত। দামেশকের আরেকটি ওয়াকফ বিড়ালের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। বিড়ালগুলো সেখানেই খাওয়া দাওয়া করত, বিচরণ করত এবং সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ত। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫)।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর